E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: দুঃসহ এই অস্বস্তি

মিলিয়ে অবস্থা এখন এমন স্তরে যে, পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সঙ্কটের ঘূর্ণিপাকে’ (২৬-১২) কথা দু’টিকে আক্ষরিক অর্থেই যেন যথার্থ করে তুলেছে।

শেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৬

এক সময়ে যে দেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের উদ্যোগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল, সেই দেশই কিনা আজ ভারতের কাছে ‘একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ’— ভাবলেই মন কালিমায় ডুবে যায়! ভাষাতেও প্রকাশ করা যায় না সেই দুঃসহ অস্বস্তি। এ যেন সেই সৃষ্টির হাতে স্রষ্টার লাঞ্ছিত হওয়ারই শামিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে হিংসার সূত্রপাত হয়েছিল সে দেশে, ছাত্রনেতা হাদির মৃত্যুতে সেই হিংসা-আগুনের লেলিহান শিখা রাজনীতি ও সমাজনীতির ক্ষেত্র ছাড়িয়ে শিল্প-সংস্কৃতির জগৎটাকেও গ্রাস করে ফেলেছে। এখানেই শেষ নয়— এর উপর আবার আছড়ে পড়েছে ‘ভারতবিরোধিতা’-র বিধ্বংসী ঝড়ও। সব মিলিয়ে অবস্থা এখন এমন স্তরে যে, পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সঙ্কটের ঘূর্ণিপাকে’ (২৬-১২) কথা দু’টিকে আক্ষরিক অর্থেই যেন যথার্থ করে তুলেছে।

সঙ্কট এখন এমনই যে, অদূরে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে-শিবিরের থেকে দূরত্ব বাড়াতে গিয়ে বিএনপিকে পড়তে হয়েছে তাদেরই রোষানলে, যার পরিণামে দলের এক নেতার শিশুকন্যা-সহ দুই মেয়েকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ বিসর্জন পর্যন্ত দিতে হয়েছে। এই ভাবে সেই দেশের অভ্যন্তরে এক দিকে যেমন গৃহযুদ্ধের মতো অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, অন্য দিকে সংখ্যালঘু— বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিও প্রবল হয়ে উঠেছে।

মুনতাসীর মামুন তাঁর বাংলাদেশ: বাঙালি মানস, রাষ্ট্রগঠন ও আধুনিকতা গ্রন্থে বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিকতা সম্পর্কে বিদ্যমান বহু ধারণার পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে লিখেছিলেন— বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাঙালির রাষ্ট্র হিসাবে। স্বাধীনতার তিন দশক পর তা পরিচিত হয় ‘মডারেট মুসলিম স্টেট’ হিসাবে। বাংলাদেশের সংবিধান দেখেও সবাই আশা করেছিলেন এটি গড়ে উঠবে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে; কিন্তু আজ তা পরিচিত হয়ে উঠছে এক মৌলবাদী আধুনিক রাষ্ট্র রূপে!হিন্দু যুবক দীপু দাসের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ধর্মীয় উন্মত্ততার যে রাখঢাকহীন প্রকাশ আমরা সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করলাম, তাতে মনে হয় মামুনের এই আশঙ্কাটাই যেন সত্যি হতে চলেছে। তবে আশা একটাই— আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই উপমহাদেশের সুস্থ, গণতন্ত্রকামী সমস্ত মানুষের এখন একটাই আকাঙ্ক্ষা— বাংলাদেশের নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। যে দলই নির্বাচিত হয়ে আসুক না কেন, শান্তির প্রত্যাবর্তনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

ন্যায়ে প্রশ্রয়

পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর লেখা ‘সঙ্কটের ঘূর্ণিপাকে’ শীর্ষক উত্তর-সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই পত্র। অখণ্ড ভারতের আত্মা থেকে এক সময় পৃথক হয়ে যাওয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ ২০২৪-এর জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পথ থেকে সরে এসে অচিরেই মৌলবাদীদের দখলে চলে যায়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন থেকে ধর্মান্ধ শক্তির পত্তন— আশ্চর্য দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন মুহাম্মদ ইউনূস অতি দ্রুত আইন-শৃঙ্খলার হাল ফেরাবেন। সেই আশা-ভরসা যে ধূলিসাৎ হবে, তা সাধারণ জনগণ বুঝতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙচুরকারীদের রুখতে গিয়ে প্রান্তিক শ্রমিক দীপু দাসের হত্যাকারীর প্রশ্রয়ের দায় কি তা হলে ব্যর্থ এই প্রশাসনেরও নয়? না কি, উদ্যমহীনতার শিকড়ে অন্য উদ্দেশ্য?

বিএনপি-র তারেক রহমান তো এত দিন মাটি থেকে বিচ্যুত ছিলেন। তিনি কি অশান্তির আগুন কমাতে পারবেন? এমনিতেই খালেদা জ়িয়ার দলকে ঐতিহাসিক ভাবেই হিন্দুদের উপর অত্যাচারের বিরোধিতায় বিশেষ দেখা যায়নি।

তবে, আমাদের দেশেও তো আখলাক খুন হলে প্রশাসন প্রায়শই মৌন থাকে। এখানে মুসলিম খুন হলে, ও-পারে হিন্দু খুন হলে— যে দিন শাসকরা সমান দহনজ্বালায় পুড়বেন, সে দিনই উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভারসাম্য আসবে। এক দিকে তোষণ, অন্য দিকে ঘৃণা— কে কাকে শোধরাবে? চোখ-রাঙানি আর অনলবর্ষী ভাষণ দিয়ে ভোট-বৈতরণি পার করা গেলেও, বিদেশনীতি কিন্তু তাতে পোক্ত হয় না।

জয়দীপ চক্রবর্তী, রথতলা, উত্তর ২৪ পরগনা

মহাদানব আসে

‘দ্বেষের আগুনে দগ্ধ বাংলাদেশ’ (২০-১২) শীর্ষক প্রতিবেদনটি আসলে ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর রক্তক্ষরণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে, অনেক রক্ত আর অশ্রুর বিনিময়ে বাংলাদেশ নামে যে মুক্তিকামী, স্বতন্ত্র স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্ম হয়েছিল, মাত্র ৫৪ বছরের আয়ুষ্কালেই আজ দেশটি কেন এমন উগ্র মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, জাতিবিদ্বেষ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির বীভৎসতার শিকারে পরিণত হল?

জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিশ নিৎসের দর্শনতত্ত্বের ব্যাখ্যায় পাই, দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময় এই বিষয়টি সর্বদা মাথায় রাখা জরুরি, সেই লড়াইয়ে যেন নিজেকেই শেষে দানবে পরিণত না হতে হয়। এ ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘দানব’ হল চরম মৌলবাদ, কট্টর ধর্মান্ধতা, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। শত্রুর সঙ্গে মরণপণ লড়াই করে বিজয় লাভ করে সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেলেও, হিংসাত্মক মৌলবাদীদের স্বার্থান্বেষী, দানবীয় করাল থাবা দেশটিকে তলে তলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে অপ্রতিহত ভাবে ক্ষতবিক্ষত করে গিয়েছে।

কার্যত বাংলাদেশ জুড়ে ভয়াবহ অন্ধ মৌলবাদী শক্তির ধারাবাহিক, বিপুল স্বৈরতান্ত্রিক উত্থান এমন এক ধ্বংসাত্মক মহাদানব গঠনের পরিণতির দিকে ধাবমান; এর নৃশংসতম হিংস্রতার জেরেই বাংলাদেশ আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে চরম বিদ্বেষের আগুনে জ্বলে-পুড়ে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন ওঠে, রক্তলোলুপ কুচক্রীর হিংস্রতার অভিশপ্ত গ্রাস থেকে কি তবে আজ কারও নিস্তার নেই? কেন জনপ্রিয় অকুতোভয় জননেতা শরিফ ওসমান হাদিকে রক্তপিপাসু ষড়যন্ত্রকারী ঘাতকের গুলিতে এ ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হল? কেনই বা ক্ষিপ্তোন্মত্ত জনতা সংখ্যালঘু শ্রেণিভুক্ত দীপু দাসকে নৃশংস হত্যা করে এমন ভাবে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠল?

বাংলাদেশের ইতিহাসের খাতায় এ ভাবে আর কত রক্তাক্ত পৃষ্ঠার সংযোজন হতে থাকবে— কে জানে!

পৃথ্বীশ মজুমদার, কোন্নগর, হুগলি

লজ্জার নিগড়ে

সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ‘লজ্জার দেশ’ (২৫-১২)-এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য— “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোনো বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে-বিভেদ সৃষ্টি করে, সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ।” এই অভ্রান্ত কথাটি বর্তমানের প্রবল পরাক্রমী ‘হিন্দু-হৃদয় সম্রাট’-এর মনে কোনও অভিঘাত তৈরি করে না।

হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান— মানুষের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এই দেশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারততীর্থ’-তে যে মানবতাবাদী পরিচয়ের কথা বলা হয়েছে, তার থেকে সরে এসেছে, আজ দেশবাসীর একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠছে ধর্ম।

পৃথিবীতে সেই দেশগুলিই যথার্থ স্বাধীনতা পেয়েছে, যেখানে ধর্মমোহ মানুষের চিত্তকে অভিভূত করে এক দেশের বাসিন্দাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ঔদাসীন্য বা বিরোধকে নানা আকারে ব্যাপ্ত করে রাখতে পারেনি। সূর্যের আলোর ন্যায় এই সত্যটিকে দেশের সংখ্যাগুরুরা যত শীঘ্র মূল্য দেবে, দেশ তত দ্রুত ‘লজ্জা’-র পাশ থেকে মুক্ত হবে।

অয়ন কুমার মল্লিক, বাগনান, হাওড়া

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangladesh dhaka

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy