আর্যভট্ট খানের প্রতিবেদন ‘বৃত্তিমূলক বিষয়ের বই ছাড়াই পরীক্ষা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের’ (২-৩) বিষয়ে কিছু কথা। যে শিক্ষা মানুষকে স্বাবলম্বী করে, দেশের উন্নয়নেও সহায়ক হয়, রাজ্যে সেই বৃত্তিমূলক শিক্ষা এখন নিজেই উপেক্ষিত ও পঙ্গু। ২০১২-১৩ সালে মহাসমারোহে যখন ‘দ্য ন্যাশনাল ভোকেশনাল এডুকেশন কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ (এনভিইকিউএফ) হল, তখন প্রচার করা হয়েছিল বাংলার ঘরে ঘরে কারিগরি বিপ্লবের জোয়ার আসবে। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের প্রায় ১৭০০টির মতো স্কুলে ভোকেশনাল এডুকেশন এখন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। আগে এ রাজ্যে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ছিল শিক্ষা দফতরের অধীনে। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে সেটি কারিগরি শিক্ষা দফতরের অধীনে চলে আসে। বৃত্তিমূলক শিক্ষকদের সংগঠনের তরফে বলা হয়েছে, কারিগরি শিক্ষা দফতর শুধু পাঠ্যক্রম তৈরি করে দিয়েছে, কোনও বই প্রকাশ করেনি। বৃত্তিমূলক শিক্ষার বই বাজারেও পাওয়া যায় না।
বাস্তবে ২০১৯ সাল থেকে এ রাজ্যের পড়ুয়ারা পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই পরীক্ষা দিচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সদ্য-প্রাক্তন সভাপতিও স্বীকার করেছেন, ওদের এ বার বই ছাড়াই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বই এবং নোটসের বই প্রকাশ নিয়ে কারিগরি শিক্ষা দফতরের সঙ্গে একাধিক বার কথা হলেও সদুত্তর মেলেনি। দায় এড়িয়ে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতির বক্তব্য, কারিগরি শিক্ষা দফতরের অধীনে মাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক বিষয়গুলি পড়ানো হয়। ওদের বই আছে কি না, সেটা ওই দফতরই বলতে পারবে। পাঠ্যপুস্তকহীন ক্লাস, ল্যাব ছাড়া প্রশিক্ষণ এখন বৃত্তিমূলক শিক্ষার অঙ্গ। এই শিক্ষাক্রমের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল ‘এজেন্সি’ নামক বিষবৃক্ষ। বৃত্তিমূলক শিক্ষা চলছে সরকারি টাকায়, সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার হচ্ছে, অথচ ‘পরিচালিত’ হচ্ছে কয়েক ডজন অখ্যাত বেসরকারি সংস্থা দ্বারা। এ সব এজেন্সির হাতে রাজ্যের সমস্ত বৃত্তিমূলক শিক্ষক এবং কয়েক লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ সঁপে দেওয়া হয়েছে। এজেন্সির অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্য নাম ‘ছাঁটাই’। শুধুমাত্র বই ছাড়া পরীক্ষা নয়, বাস্তবে বাংলায় বৃত্তিমূলক শিক্ষার নামে প্রহসন চলছে।
নিকুঞ্জবিহারী ঘোড়াই, পাঁশকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর
মুক্তির পথ
‘কলেজ ছুট’ (৪-৩) শীর্ষক প্রবন্ধ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক বাস্তবকে সামনে এনেছে। বহু ভাল কলেজে আসন খালি পড়ে থাকা, শিক্ষক ঘাটতি, এবং অন্য দিকে একের পর এক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ— সব মিলিয়ে প্রশ্ন জাগে শিক্ষানীতির প্রকৃত লক্ষ্য কী। সমস্যার পুনরাবৃত্তি না করে এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজা। শিক্ষার এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই নজর দিতে হবে প্রাথমিক স্তরের দিকে। কারণ, শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী স্তরগুলিও স্বাভাবিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুটের প্রবণতা কেন বাড়ছে, সেই কারণগুলি চিহ্নিত করা জরুরি। শুধুমাত্র দ্বিপ্রাহরিক আহারের কর্মসূচি চালু করলেই শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখা সম্ভব— এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। স্কুলকে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। পাঠ্যপদ্ধতির পাশাপাশি খেলাধুলা, সৃষ্টিশীল কাজ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং শিশুদের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে স্কুল কেবল পাঠ্যবইয়ের সীমায় আবদ্ধ না থেকে শিশুদের কাছে একটি আনন্দদায়ক পরিসর হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চায়েত, বিডিও এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্কুলছুট রোধ করা কঠিন। যে সব পরিবারে শিশুদের স্কুলে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনীহা বা আর্থ-সামাজিক সমস্যা রয়েছে, সেখানে প্রশাসন ও শিক্ষকদের যৌথ উদ্যোগে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা দরকার। প্রয়োজনে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে শিশুদের পুনরায় স্কুলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ করতে হবে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে বহু স্কুল কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়লে সেগুলিকে সমন্বিত করে কিছু উন্নত মানের ‘ম্যাগনেট স্কুল’ গড়ে তোলার কথাও ভাবা যেতে পারে। এতে পরিকাঠামো ও দৈনন্দিন পঠনপাঠনের মান উন্নত করা সম্ভব। তবে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গণপরিবহণের সুবিধা ও যাতায়াতের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা অপরিহার্য। নইলে দূরের স্কুলে পৌঁছনোর অসুবিধার কারণে অনেক ছাত্রছাত্রী শিক্ষার বাইরে চলে যেতে পারে। তাতে এর প্রকৃত উদ্দেশ্যটি ব্যর্থ হবে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকারের আত্মসমালোচনার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায় না। বরং ভাল কলেজগুলির ভিত্তি মজবুত করা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং স্নাতক স্তরে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য বৃত্তি ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক প্রকল্প হিসেবে নয়, সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সুসংহত নীতি, তার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার প্রতি প্রশাসনিক স্তরে আন্তরিক অগ্রাধিকার ছাড়া এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
ঝুঁকিপূর্ণ
পেট্রাপোল থেকে যশোর রোড ধরে কলকাতার দিকে এগোলে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মৃত ও ঝুঁকিপূর্ণ গাছ যেন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা ডেকে আনছে। দীর্ঘ দিন ধরে এই গাছগুলির কোনও রকম পরিচর্যা বা মৃত গাছগুলিকে অপসারণের উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে ঝড়-বৃষ্টি বা সামান্য দমকা হাওয়াতেই বড়সড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ ও প্রতি দিন এই পথে যাতায়াতকারী শ্রমজীবী নাগরিকদের অভিযোগ, প্রশাসনের তরফে কার্যত কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের দায়িত্ববোধ ও সক্রিয়তা নিয়ে। বিভিন্ন মহলের মতে, যশোর রোড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ, যেখানে প্রতি দিন অসংখ্য যাত্রিবাহী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তার ধারে এমন ঝুঁকিপূর্ণ গাছের উপস্থিতি এক প্রকার ‘মৃত্যুফাঁদ’-এর শামিল। দুর্ঘটনা ঘটার পর তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করার বদলে আগে থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। অবিলম্বে মৃত ও বিপজ্জনক গাছগুলি অপসারণ করার পাশাপাশি নতুন করে সবুজায়নের পরিকল্পনা করা উচিত।
কুন্তল চক্রবর্তী, বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা
ক্ষতির চাষ
রাজ্যের কৃষি অর্থনীতির একটা বড় পরিসর হল আলু চাষ। এ বছর পশ্চিমবঙ্গের আলুর দাম এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট কম। দাম এতটাই কম যে, অনেক ক্ষেত্রে চাষিদের খরচের টাকাও উঠে আসছে না বলে শোনা যাচ্ছে। বিগত চার-পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত চিত্র কিন্তু এতটা মারাত্মক ছিল না। গত বছর বৃষ্টির কারণে চাষের শুরুতে ধাক্কা খাওয়ার পরও কিন্তু এতটা লোকসানের কথা শোনা যায়নি। এ বছরে এমন পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে উপরমহলের আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণ। রাজ্যের বাজারে আলুর দাম কমাতে এবং আরও কিছু আনুষঙ্গিক কারণে গত ক’বছর ধরে বাইরের রাজ্যে আলুর রফতানি হ্রাস করা হয়েছে বলে ধারণা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এ বছরের প্রচুর ফলন। কোথাও দ্বিগুণ বা কোথাও তার বেশি ফলন হয়েছে। ফলে বাজারে আলুর দাম একেবারেই কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র কৃষকেরা আলুর জন্য যে খরচ করেছিলেন, সেটুকু অন্তত উঠে আসবে কি?
শঙ্খ অধিকারী, সাবড়াকোন, বাঁকুড়া
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)