সদ্য প্রকাশিত ভারতের নীতি আয়োগের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে ২১টি ভারতীয় শহরে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবে। যার মধ্যে রয়েছে দিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ। এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অন্তত ১০ কোটি মানুষ। ২০৩০-এ দেশের ৪০% মানুষ পানীয় জলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। ভারতের ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্কট যে ঘনিয়ে আসছে, কয়েক বছর আগে বিভিন্ন সমীক্ষা ও গবেষণায় জানা গিয়েছিল। ভারতের পঞ্চম ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের শুমারি রিপোর্টে (২০১৭) বলা হয়েছিল, ভূপৃষ্ঠের উপরের জলে ঘাটতি, তাই মানুষ মাটির নীচের জল যথেচ্ছ ভাবে তুলে ফেলছে। নাসার উপগ্রহ-চিত্র থেকে ভারতের জলাধারগুলোর জল হুহু করে কমবে, ইঙ্গিত মেলে। তাতে আমরা সচেতন হইনি। ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিকাজে ও দৈনন্দিন জীবনে আমরা মাটির নীচের জলকেই ব্যবহার করছি। বেশ কিছু রাজ্যে নদীর জলে সেচের ব্যবস্থা থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। তা ছাড়া ভারতের প্রধান নদীগুলোর জল কমে আসছে। এ অবস্থায় মাটির জল ছাড়া উপায় কোথায়?

ভারতের জলসম্পদ কমিশনের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের লোকসংখ্যা ১৭৫ কোটি হবে। তার জন্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে এবং ৬ কোটি হেক্টরের পরিবর্তে ১১ কোটি ৪০ লক্ষ হেক্টর জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এই বিপুল পরিমাণ জলের চাহিদা মেটাতে চাষের ক্ষেত্রে বিকল্প ভাবনা আনতে হবে। সবার আগে সেচ ব্যবস্থার ‘মুক্ত বন্যা পদ্ধতি’ (সারা জমিতে টইটম্বুর জল ভরে চাষ) বন্ধ করে ‘প্রতি বিন্দু জল পিছু ফসল ও আয়নীতি’ ধারণা বাধ্যতামূলক ভাবে চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা ইজ়রায়েলের দু’টি সমবায় পদ্ধতি ‘কিবুৎজা’ ও ‘মসহ্যাভ’ (জলসেচ ব্যবস্থা) এ দেশে কৃষিক্ষেত্রে চালু করতে পারি। ‘মসহ্যাভ’ উপায় হল কৃষিজমিতে জলের স্বল্প ব্যবহার ও গ্রিনহাউস কৃৎকৌশলের সমন্বিত রূপ। যেখানে কম জলে স্থানীয় ভাবে প্রচুর ফসল উৎপাদন করা যায়। একে মূল্যযুক্ত ফসল বলা হচ্ছে। চেন্নাইয়ের এম এস স্বামীনাথন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মতে: এই পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার বজায় রেখেও জলসম্পদ দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। সেই সঙ্গে পরিবেশ ও জৈব বৈচিত্র ধরে রাখা সম্ভব হবে। ভারতে ‘রেনওয়াটার হারভেস্টিং’ এবং কম জলের ফসলের ভ্যারাইটির চাষের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ভারতে বেহিসেবি ভাবে জল তুলছেন শহর, মফস্সল, গ্রামের মানুষ। সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে বেসরকারি জল সরবরাহকারী সংস্থা। বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা ভারতের মাটি থেকে জল তুলে মুনাফা লুটছে। ইন্ডিয়া রিসোর্স সেন্টারের মতে, একটি নরম পানীয় সংস্থা ভারত থেকে যে পরিমাণ জল তুলেছে, তা দিয়ে ওড়িশা বা রাজস্থানের সব জেলার এক বছরের জলের প্রয়োজন মিটে যায়। অন্য দিকে ভারতের ৩১১৯টি ছোটবড় শহরের উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি নিংড়ে নিচ্ছে মাটির তলার জল।

মাটির তলার জল বাঁচাতে চাই নির্দিষ্ট আইন। উরুগুয়ে ২০০৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে জলের ওপর বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করেছে এবং জলকে মানুষের মৌলিক অধিকার ঘোষণা করেছে। অথচ আমাদের দেশে মান্ধাতা আমলের ভূগর্ভস্থ জল সংক্রান্ত আইন, ইন্ডিয়ান ইজ়মেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮২ এখনও চালু, যেখানে জল ব্যবহারের ভিত্তি হল ওপরের জমির মালিকানা। এখনই আইন সংশোধন জরুরি।

সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকাও জরুরি। ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জলের উৎস হিসেবে পুকুর বা জলাশয়গুলোর রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। এ ছাড়া বাড়ির ছাদ ও অন্যান্য খোলা সমতল জায়গা থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জল জমা করার দিকে জোর দিতে হবে। মিজ়োরামে বাড়িতে বাড়িতে এখনও জল নামছে টিনের চাল থেকে রিজ়ার্ভারে। ওখানে যার নাম তুইজেম। তবে উপায় যা-ই হোক, জল বাঁচানোর লড়াই যে আসলে জীবন বাঁচানোর লড়াই, এটা বুঝতে না পারলে, এ দেশ মরবে।

অনুভব বেরা

মুস্তফাপুর জে এস বিদ্যাপীঠ

উৎস ও সমস্যা

‘এই জল সঙ্কটের দায়িত্ব কার’ (৬-৭) নিবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতার জল সরবরাহের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এ চিঠি। পলতা, গার্ডেনরিচ কিংবা শহরতলির অন্য যে কোনও জলসরবরাহ প্রকল্পের জলের উৎস হুগলি নদী। এই নদীর উপরিভাগের নাম ভাগীরথী। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভাগীরথী একটি শাখা নদী রূপে গঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কী ভাবে ভাগীরথী ক্রমে গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ও জলের উৎস হারাল তা গবেষণাসাপেক্ষ। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে ফরাক্কা ব্যারেজ প্রকল্প করে দীর্ঘ খাল কেটে মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুরে ভাগীরথীতে গঙ্গা থেকে জল সরবরাহের যে ব্যবস্থা হয়েছিল, তা বর্তমানে ফলপ্রসূ নেই, বোঝা যায়, যখন দেখা যায় ফরাক্কা খালের পাড়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি মাঝে মাঝে জলের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ভাগীরথী থেকে প্রবহমান গঙ্গার দূরত্ব এখন কয়েক কিলোমিটার।

প্রাকৃতিক দাক্ষিণ্যে হুগলি নদীর জলের উৎস সমুদ্রের জোয়ার, যা দিনে-রাতে দু’বার আসে দুটো প্রধান নদীখাত ধরে। একটি আসে উত্তর ২৪ পরগনার পাড় ধরে, অন্যটি আসে পূর্ব মেদিনীপুরের পাড় ধরে হলদিয়া হয়ে। এই দুটো নদীখাতের জোয়ার ডায়মন্ড হারবারে মিলিত হয়ে কলকাতা অতিক্রম করে নবদ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার পর আবার ভাটা হয়ে জোয়ারে আনা পলি নিয়ে সমুদ্রে ফিরে যায় এবং হুগলি নদীর গভীরতা বিনা ড্রেজিংয়ে মোটামুটি বজায় থাকে। দুর্ভাগ্যক্রমে গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ ভাগে, হলদিয়ার জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্পে, প্রশাসনিক অদূরদর্শিতায় ও জেদে অনেক বিরোধিতা সত্ত্বেও বিদেশি এক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে, হলদিয়া ডায়মন্ড হারবারের মধ্যে অবস্থিত ব্যালারি নামক নদীখাতটি প্রযুক্তিটির উপাদানেই আবদ্ধ হয়ে পলিতে ভরে গিয়ে জোয়ার আসার পথটি ক্রমে রুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে হুগলি নদীতে ভাটার টানের ক্ষমতা কমে যাওয়ায়, জোয়ার নিয়ে আসা পলি বর্তমানে সমুদ্রে ফিরে না গিয়ে ক্রমে নদীকেই অগভীর করে তুলছে, জায়গায় জায়গায় চরও জাগছে, যেমন দক্ষিণেশ্বরে, পূজালিতে।

সে দিনের বোধ হয় দেরি নেই, যখন জোয়ারের জল ডায়মন্ড হারবারের উপরে আসবে না এবং হুগলি নদীও, ভাগীরথীর মতোই তার জলের উৎস হারিয়ে কলকাতাকে জলশূন্য করে দেবে। সমস্যা আয়ত্তের বাইরে যাওয়ার আগেই সমাধানের জন্য জরুরি পদক্ষেপে ব্যালারি নদীখাত পলিমুক্ত করে মোহনার পূর্বাবস্থা ফিরেয়ে আনা আবশ্যক।

তরুণ কুমার চৌধুরী

কলকাতা-৬৪

জলযুদ্ধ

‘এই জলসঙ্কটের দায়িত্ব কার’ (৬-৭) নিবন্ধের প্রেক্ষিতে এই চিঠি। দক্ষিণ কলকাতা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত বড় বড় জলাশয় ও নয়ানজুলি বন্ধ করে গড়ে উঠছে উপনগরী, শপিং মল, বিনোদন পার্ক, কোথাও কোথাও অর্থ ও উপঢৌকনের সাহায্যে পুরসভা ও পঞ্চায়েতের অনুমোদন নিয়ে ফুটপাত না রেখে, গাছ না লাগিয়ে উন্নয়ন চলছে। 

গত ষাট-সত্তরের দশক থেকে বোরো চাষের জন্য চাষিরা ছোট নদীনালা, পুকুর বা দিঘির জল পাম্প বা পাইপের সাহাষ্যে যথেচ্ছ ভাবে টানছে। তা ছাড়া উচ্চ ফলনশীল ধানবীজের সঙ্গে যে সার ও কীটনাশক স্প্রে করা হয়, সে জন্যও দরকার অনেক জল। এর জন্য ব্যবহার হয় ডিপ পাম্প বা শ্যালো মেশিন, এ ভাবে যথেচ্ছ পাম্প ব্যবহারের অর্থ, মাটির তলায় যে জল কোটি কোটি বছর ধরে জমা রয়েছে, সেখানেই সরাসরি হাত পড়ে যাওয়া, পৃথিবীর জলভাণ্ডার ক্রমশ রিক্ত হয়ে যাওয়া।

সোশ্যাল মিডিয়ার বিপ্লবে জলসঙ্কট দূর হবে না। সরকার, পুরসভা, পঞ্চায়েতের কর্তাব্যক্তিগণ এখনই যদি সজাগ না হন, জলাভাবে বলিভিয়ার মতো এ দেশেও জলযুদ্ধ অসম্ভব নয়।

রবীন রায়

শ্যামনগর, উত্তর ২৪ পরগনা