কয়েক বছর পরই বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদ্যাপন করবে। ১৯৭১-এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ রাষ্ট্রের অর্ধশতক পথচলার বাঁকে, অনেক কিছুর পাশাপাশি এখনকার বাংলাদেশের তরুণ সাহিত্যপ্রাণের খোঁজ জানাটাও জরুরি বোধ হয়, বিশেখ করে সদ্য আর একটি একুশে-র উদ্যাপন পেরিয়ে এসে। আজকের সাহিত্যসক্রিয় তারুণ্য এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সন্ততি। তাদের কয়েক প্রজন্ম পূর্বের তরুণপ্রাণই ধর্মজ জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছে। দেশভাগের পরই পূর্ববাংলার তরুণ প্রজন্ম তাদের চিন্তা ও সক্রিয়তায় প্রগতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভাবকল্প প্রস্তুত করেছে। সাতচল্লিশোত্তর ঢাকা শহরে জায়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভাষাভাবনা, বিভিন্ন শিক্ষা ও সাহিত্য সম্মেলনের প্রস্তাবনা, ঘোষণাপত্র ইত্যাদি পর্যালোচনায় দেখি, রক্ষণশীল চিন্তাকাঠামোর প্রভাব ক্রমশ লঘু হয়েছে, শেষ বিচারে জনপ্রত্যাখ্যাতও।
সার্ধশত রবীন্দ্রজয়ন্তীর সময় বাংলাদেশে সাহিত্যপ্রেমী তরুণরা ভুলে যাননি, ১৯৬১-তে পাকিস্তানি সরকারি প্রতাপের বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে তাঁদের বিগত তরুণ প্রজন্ম স্মরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথকে। গর্বটা তখন আর একটু বেশি করে অনুভূত হয় এ জন্য যে, রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসা বাংলাদেশের তারুণ্য অনেকটা বিদ্রোহের সড়ক বেয়েও অর্জন করেছে। ‘এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে’, তখন কেবল আক্ষরিক থাকে না। বাংলাদেশের তারুণ্যের প্রিয় কবি-লেখক শঙ্খ, সুনীল, শীর্ষেন্দু— যাঁদের বিকাশ আজকের পশ্চিমবঙ্গে, তাঁদের অনেকেরই জন্ম বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রশীদ করীম, হাসান আজিজুল হক বা আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর মতো লেখকদের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে হলেও চূড়ান্ত বিকাশ বাংলাদেশে। সপ্রেম ও অখণ্ড পাঠের মধ্য দিয়ে এই লেখকদের মাঝে সমস্ত বিভাজনের রেখা মুছে দিয়েছে তরুণরা। এঁরা খোঁজ রাখেন গৌতম ভদ্র ইতিহাস বিষয়ে নতুন কী লিখছেন, অনন্য রায়ের সংগ্রহটি কারা প্রকাশ করেছে, ভাস্কর চক্রবর্তী আর শামসের আনোয়ারের কবিতা কোথায় পাওয়া যায়। বর্তমান লেখক মনে করতে পারেন তাঁর কলেজজীবনে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের খবর শোনার পরই মফস্সল শহর কুমিল্লায় তরুণ সাহিত্যপ্রেমীদের তাৎক্ষণিক আয়োজনে শোকসভা বা সম্প্রতি জীবনানন্দ গবেষক, সংগ্রাহক, কবি ভূমেন্দ্র গুহের প্রয়াণে বাংলাদেশে তারুণ্যের শোকার্ত প্রতিক্রিয়া।
মুদ্রিত বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন শঙ্কিত অনেকেই। তরুণদের অন্তর্জাল-আসক্তি সাহিত্যের গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে কি না, এ নিয়েও ভাবিত কেউ কেউ। বাস্তব কিন্তু ভিন্ন। বাংলাদেশে তরুণরা অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা করছেন, কেন্দ্র ও প্রান্তের দূরত্ব কমছে। কক্সবাজারের তরুণ সহজেই যুক্ত হতে পারছেন ঢাকার তরুণের সঙ্গে, ঢাকা রংপুরের সঙ্গে। এই যুক্ততার পরিসর কেবল দেশের ভিতরে নয়, বাংলাভাষী অন্যান্য অঞ্চল— পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার কবি-লেখকদের সঙ্গে তো বটেই, বিশ্বের নানা প্রান্তে বাস করা বাঙালি কবি-লেখক পর্যন্তও বিস্তৃত। সবচেয়ে তাৎপর্যের দিক হচ্ছে, মুদ্রিত মাধ্যমে কোনও গুরুভার বিষয়ে মতামত, ভিন্নমত প্রকাশের জন্য এক জন তরুণকে আগে যেমন অনেক পথ অতিক্রম করতে হত, এখন আর সে সমস্যা থাকছে না। স্বাধীন মতামতের উন্মুক্ত ক্ষেত্র যে বাংলাদেশের তারুণ্য ইতিবাচক ভাবে কাজে লাগিয়েছে, তা শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানেই স্পষ্ট। এ মঞ্চ তরুণপ্রাণের আকস্মিক আবেগের ফল নয়, বরং নীতিদৃঢ়, নির্ভীক ও ন্যায়পর সমাজ-রাষ্ট্র নির্মাণের অভীপ্সাই তারুণ্যের বুদ্ধিবৃত্তিকে চালিত করেছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী শক্তির বিরুদ্ধে এই নিরাপস অবস্থানে।
অনলাইন তৎপরতাকে এখানে পূর্বপ্রজন্মের অনেকে ‘প্রাদুর্ভাব’ বলে উপেক্ষা করেন। তাঁরা হয়তো জানেন না যে, বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রাণ তরুণরা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ডমরুচরিত’ থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’-র ই-বুক সন্ধান করেন। মুদ্রিত মাধ্যমে দুর্লভ অনেক বই বা লেখাও তরুণরা নিজ দায়িত্বে আপলোড করছেন আর দশ জনের পড়ার জন্য।
লক্ষণীয়, এখনকার সাহিত্যপ্রেমী তরুণের আগ্রহ বহু দিকে বিস্তারলাভ করেছে। চারপাশের নানা শিল্পমাধ্যম নিয়ে আগ্রহও সঞ্চারিত হয়েছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গ সংগীত উৎসবে যানজট ও শীত উপেক্ষা করে হাজার হাজার তরুণ উপমহাদেশের গুণী সংগীতসাধকদের রাগবিস্তারে যুক্ত হয়, আবার লোকগানের উৎসবেও দেখি তারুণ্যের বাঁধভাঙা জোয়ার। কেউ হয়তো বলবে ‘হুজুগ’, কিন্তু কোনও প্রত্যক্ষ বস্তুগত অর্জনের আশা যেখানে নেই, সেখানে তারুণ্যের এই সম্পৃক্তিতে শিল্পতৃষ্ণার ভাগই বেশি। এবং, এখনকার তরুণদের অনেকেই একই সঙ্গে লিখছে, গানের দল করছে, ছবি আঁকছে, নাটক ও ফিল্মে ঝুঁকছে। জীবনের কঠিন ঘূর্ণাবর্তে এমন অনেক স্বপ্নশীল শিল্পমনা তরুণের স্বপ্ন হারিয়ে যেতে দেখেছি আমরা, কিন্তু আবারহ সীমিত সামর্থ্যে এক একটা সমীহ জাগানো গানের দল তৈরি করে ফেলছে তরুণরা— নিজেরাই গান লিখছে, সুর দিচ্ছে, বিধিবদ্ধ কারিকুলামের বাইরে গিয়ে ছবি আঁকার ক্ষেত্র তৈরি করছে। নাটক-ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লিখছে, বড় তারকা বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনার অপেক্ষায় বসে না থেকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এমন সৃষ্টি করছে, যা ব্যাপক মানুষের মনোযোগ পাচ্ছে। এর বড় কারণ বোধ করি তরুণ-চিন্তার মৌলিকতা ও তার প্রয়োগে দ্বিধাহীনতা।
বাংলাদেশের মানুষ যে ইতিহাস ও বাস্তবতায় বাস করছে, তার মর্মমূল অনুধাবনে রেখে তরুণরা ইতিহাসের নানা তল-অবতল, পরিবেশ বিপর্যয়, নারীমুক্তি, ধানচাষি থেকে পোশাকশ্রমিক পর্যন্ত নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্নকে নিজস্ব বিষয় জ্ঞান করে শিল্পমাধ্যমে প্রকাশ করছে। এই তারুণ্য আন্তর্জাতিকতাকেও ধারণ করে প্রবল ভাবে। ঢাকার বইবাজারে দেখা যাবে, গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস থেকে প্যালেস্টাইনের কবি ঘাসান জাকতান-এর কবিতা ব্যাপক ভাবে অনুবাদ করছে তরুণরা, ভাষার দূরত্ব কাটিয়ে মানবিক ঐক্যের আবাহনে।
তরুণের সৃষ্টিশীল পথচলায় বাধাও আছে বিস্তর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্লগার হত্যাকাণ্ডে আমরা চিন্তার স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির উত্থান দেখে শিউরে উঠেছি। তবে, মুক্তবিশ্বে মুক্তচিন্তার অবাধ প্রবাহ যে রোধ করা যায় না, তা বিশ্বাস করে বাংলাদেশের তারুণ্য। তাই দেখব, সাথিদের রক্তঝরা জনপদে তরুণরা ফোটাচ্ছে অভীক কুসুম।
বিয়াল্লিশের বাংলায় তরুণ লেখক সোমেন চন্দ ঢাকা শহরে ফ্যাসিবাদী গুন্ডাদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। এর দশ বছর পর বাহান্নয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা শহিদ হয়েছেন মাতৃভাষা বাংলার অধিকারের কথা বলতে গিয়ে, নতুন শতাব্দীতে চিন্তার স্বাধীনতার জয়পতাকা তুলে প্রাণ দিয়েছে বাংলাদেশের এই তরুণরাই। তাদের অগ্রবর্তী চিন্তাস্রোত যেন বলতে থাকে: ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’।