ভোটের জন্য স্কুল বন্ধ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয় তো!
ধরুন ভোটের সময় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বিশেষত স্কুলগুলি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় কাজের জন্য অনেক আগে থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
election

পড়াশোনা শিকেয়। ভোট মরসুমে স্কুলের চেনা ছবি। নিজস্ব চিত্র

ভারতীয় গণতন্ত্রের সর্বাধিক বৃহত্তম উৎসবগুলির মধ্যে একটি ভোট। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রায় অন্তিম লগ্নে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন মনকে নাড়া দিয়ে যায়। যদিও কোন সন্দেহ নেই যে, এই বৃহত্তম গণতন্ত্র এখনও নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই চলছে। সমাজের নিয়মই তাই। নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যথার্থ বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চললে, যে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করতে করতেই চলতে হয়। ভাল সময়েও প্রশ্ন করতে হয়। আবার খারাপ সময়েও প্রশ্ন করতে হয়। না হলে পথভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবসময়েই থেকে যায়। এখন প্রশ্ন এই গণতন্ত্র রক্ষা করতে গিয়ে কোনও ক্ষেত্রে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেল না তো?

ধরুন ভোটের সময় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বিশেষত স্কুলগুলি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় কাজের জন্য অনেক আগে থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এটা আমরা সকলে প্রায় ধরেই নিই, সরকার নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় সরকারি স্কুল বা কলেজগুলি কয়েকটি কয়েকদিনের জন্য বন্ধ রাখবে এ আর এমন কী বড় কথা! তা ছাড়া স্কুল, কলেজ ছাড়া ভোটের কাজে আসা নিরাপত্তা বাহিনী থাকবেই বা কোথায়! কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত না তো! এমনিতেই নির্ধারিত শিক্ষাদিবসে সিলেবাস শেষ করা অনেক সময়ে সম্ভব হয় না। বিশেষ করে একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রে এই সমস্যায় পড়তে হয় স্কুলগুলিতে। তার মধ্যে এই অতিরিক্ত ছুটি যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। গণতন্ত্রের স্বার্থে কি পড়ুয়াদের স্বার্থে আপস করা যায়?

গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করতে নির্বাচন ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং হচ্ছে। টি এন সেশনের হাত ধরে সচিত্র পরিচয়পত্র থকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন প্রক্রিয়া চালানো নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। কিন্তু  পরিচ্ছন্ন নির্বাচন ব্যবস্থাই কি প্রত্যাশিত ফল দানে সক্ষম? অর্থাৎ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারলেই কি মানুষ ভবিষ্যৎ ভারতের জন্য ঠিক নেতা নির্বাচন করতে পারবে। ভারতীয় রাজনীতিতে আজকাল নাটুকে চরিত্রেরই কদর বেশি বলে মনে হয়। প্রকৃত নেতা যাঁরা সত্যিকারে দেশের কল্যাণ, জনগণের কল্যাণ করতে সক্ষম ভোটের বাজারে তাঁদের দাম নেই। গলাবাজি করতে পারবেন, হাত পা নেড়ে কথা বলতে পারবেন,  গরম বক্তৃতা দিতে পারবেন তেমন নেতাদেরই সাধারণের পছন্দ। তাই রুপোলি পর্দার নায়ক-নায়িকারা, দেশ ও সমাজ সম্বন্ধে যাঁদের মধ্যে অনেকেরই প্রায় কোনও ধারণাই নেই, যাঁরা সারা বছরেও বিধানসভা বা লোকসভাতে একটি প্রশ্ন করতে পারেন না বা এলাকার সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারেন না, তাঁরাই বছরের পর বছর বিধায়ক বা সাংসদ নির্বাচিত হন। মানুষ শুধুমাত্র তাঁদের জনপ্রিয়তা দেখে ভোট দেয়। আর উচ্চশিক্ষিত, স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থীদের মাঝে মধ্যেই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। আকণ্ঠ দুর্নীতিপরায়ন,  লোকেরা বিপুল ভোটে বছর বছর জয়ী হন। 

স্বামী বিবেকানন্দ সম্ভবত প্রথম ভারতীয় যিনি বলেছিলেন, ‘‘আমরা এখন ভারতবর্ষে যে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারলাভের জন্য সচেষ্ট, সেগুলি ইউরোপে যুগ যুগ ধরে ধরে রয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে তা পরীক্ষিত হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে যে, সামাজিক প্রয়োজন সাধনে এই ব্যবস্থা অসমর্থ। ইউরোপ অশান্তি সাগরে ভাসছে। জড় সভ্যতার অত্যাচার প্রচণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের সব ধন, সব ক্ষমতা অল্পসংখ্যক লোকের করায়ত্ত। পাশ্চাত্য জগৎ এখন মুষ্টিমেয় শাইলকের শাসনে পরিচালিত। শাইলকের অত্যাচারে পাশ্চাত্য দেশ আর্তনাদ করছে। প্রণালীবদ্ধ শাসন, স্বাধীনতা প্রভৃতি ফাঁকা ব্যাপার। পার্লামেণ্ট, ভোট, মেজরিটি— সবই তাই। যাদের হাতে টাকা তারা রাজ্যশাসন নিজের মুঠোর মধ্যে রেখেছে, প্রজাদের লুঠছে, শুষছে। তারপর সেপাইদের দেশ দেশান্তরে মরতে পাঠাচ্ছে। জিত হলে শাসকদের  ঘর ভরে  ধনধান্য আসবে।’’ আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর পূর্বে ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে লেখা ইউরোপ প্রসঙ্গে স্বামীজীর কথাগুলি বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে কতটা প্রসঙ্গিক তা সহজেই অনুমান করা যায় । 

কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের মতো মানুষ তো আর সমস্যা বলে ছেড়ে দেবেন না। তিনি এর থেকে উদ্ধারের পথও নির্দেশ করেছেন। তিনি  বলছেন, “ শিক্ষা সর্বরোগহর।” অর্থাৎ এমন কোনও সমস্যা নেই  শিক্ষার দ্বারা যার সমাধান সম্ভব নয় । তিনি লিখছেন, ‘আগে সমগ্র জাতিকে শিক্ষা দাও। ব্যবস্থা প্রণয়নে সমর্থ একটি দল গঠন কর। তা হলেই ‘বিধান’ আপনি আসবে। এখন রাজারা নেই। সুতরাং যে নতুন সম্প্রদায়ের সম্মতিতে নতুন ব্যবস্থা প্রণীত হবে সে লোকশক্তি কোথায়? লোকশিক্ষার দ্বারা প্রথমে সেই লোকশক্তি গঠন কর’। 

ভারতবর্ষের বর্তমান রাজনৈতিক দুরবস্থা দেখে এটা কি মনে হচ্ছে না যে আমরা যথার্থ শিক্ষিত মানুষ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছি? এ দায় কে নেবে? জনগণ যদি শিক্ষিত না হয় গণতন্ত্র টিকবে কী ভাবে! যদি টিকেও যায় তা কি জনগণের সার্বিক বিকাশের কাজে লাগবে?

 তা হলে উপায় কি? চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়  শিক্ষাই সমাধান। কিন্তু আমরা যদি নির্বাচনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটাই বন্ধ করে দিই তাহলে কি গাছটার গোড়াতেই কুঠারাঘাত করলাম না? এটা কি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হল না? আচ্ছা নির্বাচনের জন্য কি কোন মন্দির বা মসজিদ কয়েকদিন বা নিদেনপক্ষে একদিনের জন্য বন্ধ রাখা যায় ? যদি তা সম্ভব না হয় তবে গণতন্ত্রের প্রকৃত মন্দির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কোন অজুহাতেই বন্ধ রাখা যাবে না। সব দল কেন দেশ পরিচালকদের মনে রাখতে হবে, যদি শক্ত সমর্থ গণতন্ত্র সহ শক্তিশালী ভারতবর্ষ গড়ে তুলতে হয় তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে করতে হবে প্রকৃত দেবালয় এবং নবীন শিক্ষার্থীরা হবেন প্রকৃত দেবতা। স্বামী বিবেকানন্দের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হবে, ‘গরীয়সী ভারতবর্ষই তোমাদের একমাত্র দেবতা হউন আর সব অকেজো দেবতা কিছুকাল ঘুমাইলেও চলিবে’।

শিক্ষাব্যবস্থাকে কোনওভাবে ব্যাহত না করে বিকল্প পরিকাঠামোর সন্ধানই হবে প্রকৃত সমাধান।

(লেখক দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদনের প্রধান শিক্ষক)

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত