কিন্তু, যদি মিলে যায়, তা হলে?
অভিজ্ঞতার নিরিখে সবাই জানেন, এই সব সমীক্ষার ফল বহু ক্ষেত্রেই বাস্তবের ধারকাছ দিয়েও যায় না। অতীতে বার বার এগুলি হাস্যকর ভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
mass people

আজই চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন। কে থাকল, কে গেল, কারা গড়বে, কাদের মাঠ থেকে সরে যেতে হবে— সব প্রশ্নের আজ অবসান হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগে কয়েক দিন ধরে বুথফেরত সমীক্ষার ফল নিয়ে গোটা দেশ যে ভাবে আলোড়িত হয়েছে, তাতে মনে হয়, বিভিন্ন সমীক্ষার আভাসগুলি বহু মানুষকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। মুখে মানতে না চাইলে কী হয়, ভিতরে ভিতরে রাজনৈতিক দলগুলিও ওই সব সমীক্ষার ভিত্তিতেই ভাবনাচিন্তা, হিসেবনিকেশ শুরু করে দিয়েছে। 

যদিও অভিজ্ঞতার নিরিখে সবাই জানেন, এই সব সমীক্ষার ফল বহু ক্ষেত্রেই বাস্তবের ধারকাছ দিয়েও যায় না। অতীতে বার বার এগুলি হাস্যকর ভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যেমন, ২০০৪-এর বুথফেরত একাধিক সমীক্ষা অটলবিহারী বাজপেয়ীকে বিপুল আসনে এগিয়ে রেখেছিল। বাস্তবে বিজেপিকে হারিয়ে সরকার গড়েছিল কংগ্রেস। বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় এবং লালু-নীতীশ-কংগ্রেসের মহাগঠবন্ধনের ভরাডুবির আভাসও আদৌ মেলেনি। ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস জোটকে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের থেকে এগিয়ে রেখেছিল যে সব সমীক্ষা, ফল বেরোনোর পরে তাদের মুখ লুকোনোর জায়গা ছিল না। উত্তরপ্রদেশে ২০১৭ বিধানসভা নির্বাচনে বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষা বিজেপিকে বড়জোর ১৭০ আসন দিয়েছিল। ৩১২ আসনে জিতে ক্ষমতায় আসে তারা। গত লোকসভা ভোটেও এ রাজ্যে কোনও কোনও সমীক্ষা দেখিয়েছিল, তৃণমূল ২৪টি আসন পাবে। বামেরা পাবে ১২টি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল জেতে ৩৪টিতে, সিপিএমের ঝুলিতে সাকুল্যে দু’টি। এমন উদাহরণ আরও মিলতে পারে। তাই নেতানেত্রীরা যখন প্রকাশ্যে বুথফেরত সমীক্ষায় আস্থা না-রাখার কথা বলেন, সে কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

আবার এ-ও ঘটনা যে, তিন-চার-পাঁচটি সমীক্ষক সংস্থা একই প্রবণতার ইঙ্গিত দিলে, প্রকাশ্যে সেগুলি নস্যাৎ করে দেওয়া যত সহজ, মনে মনে সেটা করা ততটাই কঠিন। সকলেই ভুল বা সকলেই ‘চাপের শিকার’ বললেও বিষয়টি হয়তো খুব বাস্তবোচিত হয় না। এই কারণেই বুথফেরত সমীক্ষাগুলি দেখে রবিবার রাত থেকেই কুশীলবেরা তৎপর। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সব মিলিয়ে সারা দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এমন পরিস্থিতি যথেষ্ট বিভ্রান্তিজনক। কারণ প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষাগুলিতে নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে জনমতের যে প্রতিফলন ছিল, বুথফেরত সমীক্ষা তাকে ছাপিয়ে মোদীকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে। যদি এই পূর্বাভাস প্রকৃত ফলের সঙ্গে মেলে, তা হলে কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলির যৌথ উদ্যোগে সরকার গঠনের স্বপ্নও বিফলে যাবে। অর্থাৎ, ‘ফির এক বার মোদী সরকার’।

এহ বাহ্য। এই মুহূর্তে যেটা সবচেয়ে বিস্ময়কর, তা হল এই রাজ্যের ভোট-ভবিষ্যৎ। বুথফেরত সমীক্ষাগুলি এখানে যে ভাবে বিজেপির আসনবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে, ভোটের আগে কোনও সমীক্ষাতেই তা ধরা পড়েনি। জনমতের এই আভাস যদি আসল ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা হলে বলতেই হবে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন মমতার পক্ষেও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বুথফেরত সমীক্ষায় রাজ্যে বিজেপির ভোটবৃদ্ধির যে চেহারা দেখা যাচ্ছে, সেটা চমকপ্রদ। বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে ২০১১ সালে মমতা যখন রাজ্যপাট দখল করেন, বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৯ শতাংশ। ২০১৪ লোকসভা ভোটে দেশ জুড়ে মোদী হাওয়া। এখানে বিজেপি দু’টি আসন পেলেও ভোট শতাংশ বেড়ে হল প্রায় দ্বিগুণ: ১৭। কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে আবার তা নেমে যায় ১০ শতাংশে। 

এ বার নিয়েলসেনের বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, বিজেপির ভোট বেড়ে ৩৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে। মানে, ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি। তারই ভিত্তিতে তাদের ১৬টি লোকসভা আসন পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছে এই সংস্থা। অন্য যে-সব সমীক্ষায় বিজেপিকে সম্ভাব্য ১১ থেকে ২৩টি পর্যন্ত আসন দেওয়া হয়েছে, প্রাপ্ত ভোটের হার সে সব ক্ষেত্রেও তুলনীয় ভাবে বেড়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, অনেক কমেছে কংগ্রেস এবং বামেদের ভোটের হার। বামেদের ভোটের ক্ষয়ই সর্বাধিক। বামেদের ভোট হ্রাসের সঙ্গে বিজেপির ভোটবৃদ্ধির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়াও কঠিন নয়। 

সত্যিই কী হল, বোঝা যাবে আজ। গোটা প্রচারপর্বে ‘বামের ভোট রামে যাওয়ার’ যে অভিযোগ মমতা করে এসেছেন, তার আদৌ কোনও সারবত্তা আছে কি না, সেটাও হয়তো তখনই পরিষ্কার হবে। তবে, প্রসঙ্গত, বিজেপির এখনকার এক ডাকসাইটে নেতা ভোটপর্বের মধ্যেই জনান্তিকে বলেছিলেন, ডায়মন্ড হারবার, যাদবপুরের মতো যে সব কেন্দ্রে বিজেপি তুলনায় ‘দুর্বল’, সেখানে সিপিএমের জয় বাঞ্ছনীয়! 

তা না-হয় হল। তবু মূল কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। সমীক্ষা কি মিলবে? বিজেপি ১৬ বা ততোধিক আসন পাবে? তার মানে কি তৃণমূলের ভোট-ব্যাঙ্কে ভাটার সূচনা? যদি হয়, তা হলে কেন?

আবার বলছি, এই ধরনের সমীক্ষা না মেলার উদাহরণ বিস্তর। আবার একেবারে মেলেনি, এমনও নয়। অতএব সেটা মনে রেখেই বিষয়টি দেখতে হবে।

ভোটের আদি পর্ব থেকেই মোদী-শাহেরা রাজ্যে ২২/২৩টি আসন দখল করার ডাক দিয়েছিলেন। পাল্টা মমতা বলেছিলেন ৪২টির সবই পাবে তৃণমূল। মমতার এই দাবি যে নেহাত রাজনৈতিক, আসলে ৪২-এ ৪২ যে হয় না, সেটা শিশুও জানে। কিন্তু মোদী-শাহদের ২৩টির দাবিকেও খুব একটা বাস্তবসম্মত মনে করা হয়নি। বিজেপির উত্থান মেনে নিয়েও তারা ৫/৬টির বেশি আসন পেতে পারে, তা অধিকাংশের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

কিন্তু যদি তারা সত্যিই ১৪-১৫-১৬-২০টি আসন পেয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে মমতার দলে তৃণমূল স্তরে মাটি ভালমতো আলগা হচ্ছে। রাজ্যে সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপের দিনে কংগ্রেস ১৯৮৪’তে লোকসভায় ১৬টি আসন পেয়েছিল। মমতা সেই নির্বাচনে জিতেই সংসদীয় রাজনীতিতে পা রাখেন। সেই ভোটের প্রেক্ষাপট ছিল ইন্দিরা গাঁধীর হত্যাকাণ্ড। মমতা যেমন যাদবপুরে সিপিএমের হেভিওয়েট সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারান, দমদমে নীরেন ঘোষের মতো শ্রমিক নেতাকে হারিয়ে দেন রাজনীতিতে কার্যত আগন্তুক আইনজীবী আশুতোষ লাহা। আরও নানা তাবড় সিপিএম নেতাকে হারতে হয়েছিল কংগ্রেসের কাছে। সে ভোটকে বলা হয়েছিল ‘ইন্দিরা ঝড়’।

গত লোকসভা নির্বাচনকে অনেকে ‘মোদী ঝড়’ বলেছিলেন। এ বার মোদী জিতুন বা হারুন, তাঁর পক্ষে ‘ঝড়’ উঠেছিল, বলা যায় না। এই রাজ্যে তো নয়ই। তবু যদি বিজেপি সত্যিই এখানে অনেকগুলি আসন পেয়ে যায়, বুঝতে হবে কোথাও একটা তীব্র চোরাস্রোত তৃণমূলের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এটা সতর্কবার্তা। সেই ‘চোরাস্রোত’ কী এবং কেন, মমতার মতো দক্ষ, অভিজ্ঞ নেত্রী তা বিলক্ষণ বুঝবেন। হয়তো এখনই বোঝেন। সে আলোচনার দিন আজ নয়। শুধু বলব, যদি তেমন হয়, তা হলে নিছক সাম্প্রদায়িক ভোটাভুটির তকমা দিয়ে সত্য স্বীকার না করা বোধ হয় ঠিক হবে না।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত