বিড়ম্বনাই যেন ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের। বেসরকারি হাসপাতালে লাগামছাড়া আর্থিক জুলুমের অভিযোগ এবং তার প্রতিকার খুঁজতে বেসরকারি ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত— কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্তও বিষয়টি ছিল গোটা রাজ্যে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সে বিতর্কের রেশ এখনও ঠিক মতো মিলিয়ে যেতে পারেনি। তার মধ্যেই আসরে আবির্ভাব ভুয়ো চিকিৎসকদের। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের রঙ্গমঞ্চ আরও জমজমাট। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দায় ঝাড়তে ব্যতিব্যস্ত। কার গাফিলতিতে হাজারে হাজারে ভুয়ো চিকিৎসক অবাধে কারবার চালিয়ে গেলেন এত দিন, তা নিয়ে শুরু জোর চাপানউতোর। কিন্তু সময়টা কি চাপানউতোরের? সমাধান খোঁজাটাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নয় কি? কেন এত রমরমা ভুয়ো চিকিৎসকদের, সবাই মিলে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা বেশি জরুরি নয় কি?

চাহিদা আর জোগানে ভারসাম্য যখন থাকে না, জালিয়াতির পথ তখনই প্রশস্ত হয়। এ অতি সাধারণ সত্য এবং সর্বজনবিদিত। এ রাজ্যের বা এ দেশের বিপুল জনসংখ্যার সুস্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করার জন্য যত চিকিৎসকের প্রয়োজন, তত চিকিৎসক কি রাজ্যে বা দেশে রয়েছেন? নগরে চিকিৎসকের অভাব নেই, পর্যাপ্ত। কিন্তু মফস্‌সলের দিকে চোখ ফেরালেই স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দৈন্য প্রকট। সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো যেটুকু যা রয়েছে, ভরসা শুধু সেটুকুই। তার অতিরিক্ত বা তার চেয়ে উন্নততর স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রয়োজন পড়লে দিশাহারা দশা হয় মফস্‌সলের অধিকাংশ মানুষের। জেলা সদর বা মহকুমা শহরগুলোয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ছবি কিছুটা হয়তো ভাল। কিন্তু মহানগর আর সদর শহর নিয়ে তো রাজ্য নয়। বরং জনসংখ্যার সিংহভাগের বাসই তার বাইরের বিস্তীর্ণ পরিসরটায়। সেখানে উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নেই। পর্যাপ্ত সংখ্যায় চিকিৎসক সেখানে মেলে না। স্বাভাবিক নিয়মেই বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ভুঁইফোঁড়ের মতো মাথা তোলেন ভুয়ো চিকিৎসকরা। জনসাধারণ আপাতদৃষ্টিতে হয়রানির নিরসন খুঁজে পান। বৈধতা-অবৈধতা পরখ করার কথা কারও মাথাতেও আসে না। ফুলে-ফেঁপে উঠতে থাকে স্বাস্থ্য পরিষেবার নামে ভুয়ো কারবার।

বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এতই অপ্রতুল যে আপৎকালীন চিকিৎসাও অমিল হয়ে পড়ে কখনও কখনও। সুনিশ্চিত স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা সেখানে নাগালের অনেকটা বাইরে থাকা এক স্বপ্নের মতো। আপদে-বিপদে তাই কাজে আসেন এই ভুয়ো চিকিত্সকরা, হাতুড়েরা। অনেক জীবন হয়তো বাঁচিয়েও দেন তাঁরা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রকৃত শিক্ষা ছাড়াই যদি চিকিত্সক হয়ে ওঠেন কেউ, তা হলে সময়ে-অসময়ে জীবন বাঁচিয়ে যেমন দিচ্ছেন তিনি, তেমনই আচম্বিতে তিনি ডেকে আনতে পারেন মৃত্যুকেও। তেমন ঘটছেও আকছার। অতএব, আর চোখ বুঁজে থাকা চলে না। সতর্ক এ বার হতেই হবে। ভুয়োদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কেউ ধরা পড়ছেন, কেউ পাততাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্য পরিষেবার নামে জালিয়াতি কমবে বটে। কিন্তু রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এক শূন্যতাও তৈরি হবে। বৈধ পরিকাঠামোয় ফাঁক-ফোকর ছিল যা কিছু, অবৈধদের মাধ্যমে ভরাট হচ্ছিল এত দিন সে সব। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ফাঁকগুলো কিন্তু আবার প্রকট হবে। সমাধানের পথটাও তাই দ্রুত খোঁজা দরকার। চাপানউতোর সরিয়ে রাখাটা আপাতত কেন জরুরি, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ তা বুঝছে কি?