‘বিরোধী? ভয় দেখাও, হত্যা করো’ (১-৫) শীর্ষক নিবন্ধ পড়ে ভাল লাগল, কিছু প্রশ্নও মনে জাগল। জরুরি অবস্থার সময় ‘আন্তিগোনে’ মঞ্চস্থ হলেও (১৯৭৫-৭৬) ‘প্রফেসর মামলক’ তো ১৯৬৪ সালে মঞ্চস্থ নাটক। উৎপল দত্ত রচিত ও পরিচালিত এলটিজি প্রযোজিত নাটক। ‘কল্লোল’-এর পর যে বিপ্লবী নাটকের জন্য উৎপল দত্তকে শাসকের রোষে পড়তে হয়েছিল, সেটি হল নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষিতে রচিত ‘তীর’। উৎপল তখন নকশাল আন্দোলনকে সমর্থন করছেন। এমনকি নকশাল আন্দোলনের খসড়া দলিল লেখায় তাঁর সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। তাঁর চোখে তখন চারু মজুমদার শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী।

‘তীর’ নাটক লেখা এবং প্রযোজনার জন্য উৎপল মুম্বইতে ধরা পড়লেন। তখন তিনি মার্চেন্ট-আইভরি প্রযোজিত ছবিতে অভিনয় শুরু করেছিলেন। উৎপল গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁরা ছুটলেন দিল্লি সরকারের দরবারে। জেল থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থাও হল। উৎপলকে মুচলেকা দিতে হল, তিনি শুটিং চলাকালীন কলকাতায় আসবেন না এবং আর বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন না। কোনও সশস্ত্র বিপ্লবী নাটক লিখবেন না। এর পর উৎপল আর নকশালবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি।

এর মধ্যে নকশাল আন্দোলনও ভেঙে যায়। উৎপল সিপিএম দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কংগ্রেস সরকার আর তাঁকে ঘাঁটায়নি, অল্পবিস্তর কিছু প্রতিবাদী রাজনৈতিক নাটক লিখলেও। ১৯৭৩ সালে তাঁর ‘টোটা’ নাটক দিল্লিতে ইন্দিরা গাঁধী দেখেন এবং প্রশংসা করেন। সেই সময়ে কলকাতার মঞ্চে থিয়েটার ওয়ার্কশপের ‘রাজরক্ত’ নাটক শাসক দলের কুনজরে পড়ে। তবে সে নাটকে তেমন কোনও ব্যাঘাত ঘটানো হয়নি। 

শম্ভু মিত্র সেই সময়ে নাটক থেকে প্রায় অবসর নিয়েছেন। আমন্ত্রণে কিছু আবৃত্তি করছেন। অজিতেশ প্রতিবাদী ব্রেখটকে নিজের আদলে নিয়ে ঘরোয়া নাটক করেছেন। তাই জরুরি অবস্থার দুঃশাসন বড় মঞ্চকে সে ভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি।

সব চেয়ে বেশি প্রতিবাদী হয়েছিল অসংখ্য ছোট নাট্যদল এবং তুলনামূলক অখ্যাত নাট্যকার। তাঁদের নাটক নানা আক্রমণের শিকার হয়েছিল। সেগুলো সে ভাবে প্রচারের আলোয় বা আলোচনায় আসেনি।

গৌতম মুখোপাধ্যায় ‘লেনিন’, অমল রায় ‘লাশবিপণী’, ‘শব বাহকেরা’, ‘নিজবাসভূমে’, অরুণ চক্রবর্তী ‘হচ্ছেটা কী’, মনোরঞ্জন বিশ্বাস ‘রণক্ষেত্রে আছি’ ইত্যাদি নাটক মঞ্চস্থ করতে গিয়ে আক্রান্ত হন। ২০০৯-এ ‘উজানে’ নাট্যদল হলদিয়ায় নাটক করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ‘হন্তারক’ নিঃসন্দেহে সমসাময়িক রাজনৈতিক নাটক। ‘কোজাগরী’, ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক নাটক। তবে হ্যাঁ, তা সংখ্যায় খুবই কম। একমাত্র কারণ, সরকারি অনুদান প্রাপ্তির প্রত্যাশা।

কেন্দ্রীয় সরকার প্রতি বছর প্রোডাকশন গ্র্যান্টস, আর্টিস্ট গ্র্যান্টস ইত্যাদি মিলিয়ে লাখ লাখ টাকা অনুদান দিয়ে থাকে। অতএব থিয়েটার-কর্মীদের কী দরকার সরকারের শাসন বিরোধী কথা বলার? তাই নীরব থাকেন নাট্যজনেরা। ধর্মীয় বিভেদ নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের অপশাসন, বিরোধীশূন্য করে দেওয়ার হুঙ্কার, কৃষকের আত্মহত্যা ইত্যাদি কোনও ঘটনাই নাট্যকর্মীদের আর ভাবায় না। তার চেয়ে ক্লাসিকাল প্রযোজনায় মন দেওয়াই ভাল। তাতে শৈল্পিক মান রক্ষা হবে। আবার শাসকের মন পাওয়াও যাবে।

দীপক বিশ্বাস
ইন্দ্রপ্রস্থ, মুর্শিদাবাদ

অসৌজন্য

‘রাজনীতি না লজ্জা’ (৭-৫) পড়ে এই পত্রের অবতারণা। বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদ এবং শিল্পীর মতামত পড়ে, সবিনয় জানাই, বাংলায় এই অসৌজন্য বোধের সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল ষাটের দশকের মধ্য ভাগ থেকে। সেই সময় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অতুল্য ঘোষ চোখের অসুস্থতার কারণে সানগ্লাস পরতেন বলে বামপন্থীরা ওঁকে ‘কানা অতুল্য’ বলে সম্বোধন করতেন। এর পরে সত্তরের দশকে বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীকে ‘ওই মেয়েছেলেটা’ বলে সম্বোধন করতেন। ১৯৭৭ সালে শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির ওপর কারা নৃত্য করেছিল সবাই জানেন। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই, মহানায়ক উত্তমকুমার প্রয়াত হলে, তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষ থেকে ন্যূনতম শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয়নি। কতিপয় বামপন্থী নেতা ওঁকে চরিত্রহীন বলতেও দ্বিধা করেননি। ১৯৮৩ সালে, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা কংগ্রেসি বিধায়ক ড. শিশির বসুকে ‘চোরেদের নেতা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন।

শোভনলাল বকসী
কলকাতা-৪৫

সোমেন চন্দ

‘শতবর্ষে সোমেন চন্দ স্মরণ’ (কলকাতার কড়চা, ২০-৫) শীর্ষক লেখা পড়ে কিছু সংযোজন। প্রয়াত সোমেন ছিলেন আমার বাবা সাংবাদিক ও লেখক সরলানন্দ সেনের ছায়াসঙ্গী ও অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাবা সোমেনের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মর্মস্পর্শী বিবরণ তৎকালীন ফ্যাসিবিরোধী সাহিত্য পাক্ষিক পত্রিকা ‘প্রতিরোধ’-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় (১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৯)। ঢাকা প্রগতি লেখক সঙ্ঘের সক্রিয় সদস্য ছিলেন সোমেনবাবু। সকলের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। তাঁর আরও দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেন কবি কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও রণেশ দাশগুপ্ত। এই পত্রিকার এক বছরের মূল সঙ্কলনগুলি আমার কাছে বর্তমান এবং অক্ষত অবস্থায় জীবিত। প্রতিরোধে দুই বাংলার স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিকরাই নিয়মিত লিখতেন। এর আয়ু ছিল মাত্র তিন বছর। সোমেনের জনপ্রিয় গল্পগুলো এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছে। এটির যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও অচ্যুত গোস্বামী। কিরণশঙ্কর-অচ্যুত-সরলানন্দ সেন— এই তিন জনের উদ্যোগেই মূলত কাগজটি বেরোত। এর সম্পাদকীয় লিখতেন সাহিত্যিক-সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি উপদেষ্টাও ছিলেন।

‘ফ্যাসিবিরোধী লড়াইয়ে শহিদ এক বাঙালি’ (রবিবাসরীয়, ১০-৩) শীর্ষক লেখাতে সরলানন্দ সেনের নাম উল্লেখ আছে। উল্লেখ আছে, কী ভাবে সোমেনের দেহ লাশঘরে পড়েছিল। সেই সময়ে সরলানন্দবাবু ‘আজাদ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন।

আমার সম্পাদনায় ‘যুদ্ধকালীন সাহিত্য সংগ্রহ ১৯৪২’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে, ২০০৭ সালে। প্রতিরোধ পত্রিকার সঙ্কলনগুলি একত্রিত করে পুস্তকাকারে বার হয়েছে। এটির ভূমিকা লিখেছেন অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র। আমার কাছে মূল পত্রিকাগুলো দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান।

উৎপল সেনগুপ্ত
কলকাতা-১০৬

কথা শুনে

মমতার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ভোটে যে হার-জিত থাকে, তিনি সেই হারকে মান্যতা দিতে বা জনতার রায়কে মাথা পেতে স্বীকার করতে রাজি নন। নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর তিনি বললেন, তিনি রাজ্যের সব উন্নয়ন করে দিয়েছেন এবং এখন যে সময় সরকারকে দিতেন সেই অতিরিক্ত সময় দলকে দেবেন। মনে রাখা দরকার, সরকারের কাজ করার জন্যই তিনি (ও অন্য সকলে) নির্বাচিত হয়েছেন, দলের কাজ করার জন্য নয়। তিনি এও বলেছেন, অতিরিক্ত উন্নয়ন করেই তিনি এই রায় পেলেন! রাজ্যে গত আট বছরে ভারী শিল্প গড়ে ওঠেনি। ২০১১-র আগে থেকে বন্ধ হতে বসা কারখানাকে রক্ষাও করতে পারেনি এই সরকার। বন্ধ হয়ে যাওয়া বহু কারখানাতেও আধুনিকীকরণ করে চালু করার প্রয়াস দেখা যায়নি।

শুভজিৎ বসাক
কলকাতা-৫০