জানুয়ারি, ১৯৪৮। লাহৌর। মান্টো হাঁটতে হাঁটতে জুতোর দোকানটার সামনে এসে দাঁড়ান। বোঝার চেষ্টা করেন দেশভাগ-দাঙ্গায় আদৌ সেটা আস্ত আছে কি না। দোকানটার সামনে পুরি-সবজি বেচছিলেন যে বুড়ো মানুষটা, তিনি আশ্বস্ত করেন: চালু আছে। তাঁর থেকে পুরি কেনার সময় একটু অন্যমনস্ক দেখায় সাদাত হাসান মান্টোকে, মুখেচোখে যেন একটা আশঙ্কার ছাপ। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ এক ছোকরা হাজির হয় সেখানে, চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘গাঁধীজিকে মেরে ফেলা হয়েছে দিল্লিতে।’ বুড়ো ব্যাপারী ধমকে ওঠেন, এ ভাবে কেউ খারাপ খবর দেয়! চশমার আড়ালে সপ্রশ্ন অসহায় চোখে মান্টো: কারা? ‘‘—হিন্দুরা... বুকের ভেতর একেবারে তিনটে গুলি পুরে দিয়েছে...’’।

নন্দিতা দাশের ছবি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ বইটিকে মনে পড়িয়ে দেয়। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি গাঁধীজি নিহত হওয়ার পর জয়প্রকাশ নারায়ণ থেকে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ পর্যন্ত আঙুল তোলেন ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দিকে, কেন সে দফতর গাঁধীজিকে রক্ষা করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন সর্দার বল্লভভাই পটেল, একই সঙ্গে উপপ্রধানমন্ত্রীও। পটেল তখন একেবারেই পছন্দ করছিলেন না গাঁধীজির কার্যকলাপ, তাঁর মনে রীতিমতো উষ্মা। গাঁধীজির অপরাধ: তিনি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য সরব হয়ে উঠছিলেন ক্রমশই। দিল্লিতে দিবালোকে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নিরন্তর আক্রমণ, হত্যা, সম্পত্তি লুট চলছিল। দিল্লির এই মুসলিম-নিধন নিয়ে নিজের অসহায়তার কথা গাঁধীজিকে জানান প্রধানমন্ত্রী নেহরু। আর পটেল গাঁধীজিকে জানান, মুসলিমদের উপর আক্রমণ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনামাত্র, তাঁদের নিরাপত্তার ব্যাপারে তাঁর মন্ত্রক সতর্ক, সদা প্রহরারত। গাঁধীজি বলেন: আমি দিল্লিতেই থাকি, চিনে নয়। আমার চোখের সামনে এখানে মুসলমানদের মারা হচ্ছে। অনশন শুরু করেন তিনি, ভারতীয় মুসলিমদের রক্ষার্থে। দেশভাগ আর হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সে দিন এতটাই চিড় ধরাতে পারছিল অনেক কালের সখ্য-সাহচর্যেও। 

এই যে চিড়, এর উৎস আমাদের মন। আমরা নিজেদের বা চার পাশের মানুষজনকে কেবল একটিমাত্র আইডেনটিটি বা আত্মপরিচয়েই ভাবতে ভালবাসি— আমরা হিন্দু, ওরা মুসলমান। অথচ এই আত্মপরিচয় আমরা নিজেরা তৈরি করি না, এগুলি পুরোপুরি জন্মগত বা সমাজপ্রদত্ত। সংখ্যায় গরিষ্ঠ হওয়ার গর্বে আমাদের মন এমন এক হিংস্র চেহারা নিতে থাকে যে তাবৎ ভারতকে হাতের মুঠোয় ভাবতে থাকি আমরা। ঠিক এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় হিন্দুত্বের রাজনীতি, নিজের প্রভুত্বকামী চেহারাটা প্রকট করে তোলে। সর্বনাশা এই বোধ বা রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়েই খুন হয়ে যান গাঁধীজি। যে হিন্দুত্ববাদীরা খুন করেছিল তাঁকে, তাঁদের মনে হয়েছিল, ‘ভারতীয় হিন্দু’ হওয়া সত্ত্বেও বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন গাঁধীজি এ দেশের মুসলমানদের জন্যে, ওদের জন্যে তো নতুন ‘মুলুক’ তৈরি করেই দেওয়া হয়েছে— পাকিস্তান! 

১৯৪৮-এর ৭-৮ জানুয়ারি মুম্বই থেকে করাচি হয়ে লাহৌর এসে পৌঁছোন মান্টো, কিন্তু কিছুতেই ওই চাপিয়ে-দেওয়া আত্মপরিচয় (ভারতীয়/ পাকিস্তানি) তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কলমের জোরে আত্মপরিচয় নিজেই তৈরি করে নিয়েছিলেন, হয়ে উঠছিলেন এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উর্দু লেখক। তবু তাঁর স্বল্পায়ু জীবনের (১৯১২-১৯৫৫) মধ্যে ঘটে যাওয়া দেশভাগ-দাঙ্গা দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফিরত তাঁকে। বলতেন: এখন তো আমাদের দু’রকমের টুপি পরতে হচ্ছে, একটা হিন্দু টুপি, একটা মুসলিম টুপি... ‘‘পলিটিকস টু অপারেট্স থ্রু দিজ় ক্যাপ্‌স।’’ লাহৌরে থাকার সময় এও বলেছিলেন, দেশভাগ-দাঙ্গা নিয়ে কত রকমের উত্তর খোঁজা চলছে, কোনওটা হিন্দুস্থানি জবাব, কোনওটা পাকিস্তানি জবাব, কোনওটা হিন্দু জবাব, কোনওটা মুসলিম জবাব। সবাই কারণ খুঁজছেন অতীতে, কিন্তু আগে তো এই সময়ের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে হবে, যারা অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত ইতিহাস লিখছে!

দেশভাগের জন্যে তাঁকে মুম্বই ছাড়তে হল, এটা মানতেই পারেননি মান্টো। আগে বেশ মজা করেই বলতেন, মুম্বইয়ের কাছে তাঁর সারা জীবনের ঋণ, কিন্তু শোধ করতে চান না, কারণ এ শহর ছেড়ে তিনি কোনও দিন যাবেন না। যদি শহরটা কখনও নিজে থেকে নড়েচড়ে চলতে শুরু করে, তবে তিনিও তার সঙ্গে সঙ্গে চলবেন। লাহৌরে এসেও বলতেন, তিনি যেমন চলেফিরে বেড়াচ্ছেন, মুম্বই শহরটাও তাঁর সঙ্গে চলেফিরে বেড়াচ্ছে। সত্যি বলতে কী, তাঁকে কিন্তু কেউ বাধ্য করেনি, কিংবা জোরও খাটায়নি মুম্বই ছাড়তে। তা হলে কেন তিনি ছাড়লেন? একটা গল্পে লেখা রইল সে উত্তর। স্বাধীন ভারত আর স্বাধীন পাকিস্তান, দুই দেশের বাসিন্দারাই আদতে দাস, ধর্মীয় উন্মাদনার দাস।

মান্টোর অভিন্নহৃদয় বন্ধু শ্যাম চাড্ডা উত্তেজনার মুহূর্তে বলে ফেলেছিলেন, যদি দেখি দাঙ্গা বাধাচ্ছে মুসলমানরা, তবে তাদের তো বটেই, তোমাকেও মেরে ফেলতে পারি।— রাওয়ালপিন্ডি থেকে আসা তাঁর শরণার্থী স্বজনদের কাছে সেখানকার দাঙ্গাবাজ মুসলিমদের নৃশংসতার কথা শোনার পর সেই রাগ ও অসহায়তা থেকেই হয়তো শ্যাম কথাগুলো বলে ফেলেন। কিন্তু শোনামাত্রই মুম্বই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন মান্টো। শ্যাম তাঁকে আটকাতে গিয়ে বলেন, তুমি আবার কিসের মুসলমান! মান্টোর উত্তর: মুসলমান তো বটেই— অন্তত মেরে ফেলার মতো। 

মান্টো টের পেয়েছিলেন আঘাত এখন আসছে তাঁর সহনাগরিক বন্ধুর কাছ থেকেও। যুগপৎ হিংসা ও ক্রোধের দাপটে শ্যামের কাছেও তিনি অচেনা হয়ে যাচ্ছেন, শ্যাম এখন তাঁকেও আর বিশ্বাস করতে পারছেন না পুরোপুরি। লাহৌরে থাকাকালীন খুব মনখারাপ করত মান্টোর, মুম্বইতে তাঁর ফেলে-আসা পুরনো বন্ধুবান্ধবদের জন্যে। স্ত্রী সফিয়া তাঁকে এক দিন বলেছিলেন, শ্যামের কথাকে অত গুরুত্ব না দিলেও পারতে। মান্টো উত্তর দিয়েছিলেন: না চলে এলে আমিও হয়তো ও রকমই হয়ে যেতাম!

সত্তর পেরনো স্বাধীন দেশটায় প্রতি দিন আমাদের মনের মধ্যে জমে ওঠা বিকারকে এ ভাবেই ঝাঁকুনি দিয়ে চিনিয়ে দেন মান্টো। নন্দিতাও তেমনটাই চেয়েছিলেন।