আমাদের দেশে চিরকালই বিয়ে ব্যাপারটা পারিবারিক। বিয়ের মধ্যে নিজের যৌনসঙ্গী নির্বাচনের যে প্রশ্নটি আছে, সেটি আমাদের সমাজ মোটে আমল দিতে চায় না। এ দেশে বিয়ে মানে দু’টি মানুষের সম্পর্ক নয়, দু’টি পরিবারের গাঁটবন্ধন। আর তা হওয়া চাই সমানে সমানে। স্বজাতে ও স্বধর্মে। আজও ‘পাত্র-পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনে স্বজাতের পাত্রপাত্রী খোঁজা বহাল তবিয়তে চলছে। অনেকে আবার লেখেন, ‘অসবর্ণ চলিবে’। যেন পরিবারে অন্য বর্ণ বা জাতের মানুষকে প্রবেশের অধিকার দিয়ে তিনি তাকে কৃতার্থ করছেন!

প্রশ্ন হল, কোনও বিয়ে যদি পরিবার পরিজন মেনে না-ই নেয়, তা হলেই বা কী? কিছু দিন আগে পর্যন্ত সাধারণত সন্তানের বিয়ে মেনে না নেওয়ার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল সন্তানের সঙ্গে তার পিতামাতার সম্পর্কচ্ছেদ। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই চিত্রটি ব্যাপক হারে বদলেছে। সন্তান যদি অন্য জাতে অথবা ধর্মে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, আরও নির্দিষ্ট ভাবে বললে, তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণ’-এর সন্তান যদি দলিত অথবা ইসলামধর্মাবলম্বী জীবনসঙ্গী নির্বাচন করে, তা হলে সন্তানের প্রেমাস্পদকে বা সন্তানকেও খুন করতে পর্যন্ত বাবা-ভাইয়ের হাত কাঁপছে না। হ্যাঁ, ‘অনার কিলিং’ আগেও ছিল। আমাদের দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে এই কুপ্রথা বহু কাল ধরে প্রচলিত। কিন্তু গত কয়েক বছরে যে হারে ‘অনার কিলিং’ বাড়ছে, তাতে প্রমাণিত হয়, ‘পরিবারের সম্মানের জন্য’ এই খুন আমাদের সমাজে মান্যতা পাচ্ছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ৩৫০-এরও বেশি অনার ক্রাইম ঘটেছে এ দেশে। ২০১৮’য় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে ভারতের সব প্রদেশে এই অপরাধ কমানোর জন্য বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

এই ভয়াবহ অবস্থার জন্য কে দায়ী? অবশ্যই আমি-আপনি। আমি-আপনি সচেতন ভাবে না হলেও অবচেতনে মনে করি ‘ওরা ছোট জাত’ বা ‘ইতর’ শ্রেণির মানুষ। আমার-আপনার জাতধর্মই শ্রেষ্ঠ! হ্যাঁ, এগুলো আমরা আগেও ভাবতাম। আমরা যারা সুবিধাভোগী সম্প্রদায়ে জাত, বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে তাদের বেশির ভাগেরই মনের গোপন কুঠু্রিতে এ সব চিন্তার আনাগোনা ছিল। কিন্তু এ সব চিন্তা প্রকাশ্যে আনার কথা কল্পনাও করতাম না। আমরা জানতাম এ সব কথা মুখে আনা লজ্জার। সেই লজ্জাবোধ আজ অপস্রিয়মাণ। আমরা অনেকেই এখন অনার ক্রাইমের ঘটনা শুনে, ভিডিয়ো দেখে আর ছিছিক্কার করে উঠি না। এ সব এখন আমাদের গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে।

কেন? ‘পরিবারের সম্মান রক্ষা’র নামে এই নির্যাতন, খুন আমরা মেনে নিচ্ছি কেন? মানছি কারণ আমাদের রাষ্ট্র এ অপরাধের মান্যতা দিচ্ছে। শুধু মান্যতা নয়, আমাদের রাষ্ট্র বর্তমানে যে কোনও রকম বিভেদকামী প্রথাকে ছলে-বলে-কৌশলে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সারা ক্ষণ দেশ থেকে মুসলমান বিতাড়নের প্যাঁচ কষেন, অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওরা এক জন হিন্দু মারলে আমরা একশো মুসলমান মারব’, মালেগাঁও বিস্ফোরণের অন্যতম অভিযুক্তা অক্লেশে সাংসদ পদে জয়ী হন এবং বলেন ‘টয়লেট এবং ড্রেন সাফাইয়ের জন্য সাংসদ হইনি’ (অর্থাৎ ও সব কাজ একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ), তখন বোঝাই যায়, আমাদের রাষ্ট্র বর্তমানে কোন পথে চলছে। 

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আমলেই হিন্দু মেয়ের সঙ্গে মুসলমান ছেলের প্রেমের নামকরণ হয়েছে ‘লাভ জেহাদ’। প্রসঙ্গত, হাদিয়া মামলায় ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির রিপোর্টে হাদিয়ার মুসলমান জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ঘটনাকে মগজধোলাই (ইনডকট্রিনেশন) এবং মনস্তাত্ত্বিক অপহরণ (সাইকোলজিক্যাল কিডন্যাপিং) বলা হয়েছিল। অর্থাৎ হাদিয়ার স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে অস্বীকার করা হয়েছিল। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের এক বিজেপি বিধায়ক রাজেশ মিশ্রের কন্যা সাক্ষীর যে আবেদন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, সাক্ষী একটি দলিত ছেলেকে বিয়ে করেছেন বলে তাঁর বিধায়ক বাবা তাঁর এবং তাঁর স্বামীর পিছনে গুন্ডা লাগিয়েছে। এ রকম উদাহরণ অজস্র। স্পষ্টতই, আমাদের রাষ্ট্রের বর্তমান পরিচালকগণ মনে করেন, আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিয়ে বংশের বিশুদ্ধতা নষ্ট করে। 

এর মধ্যে আর একটি কথাও আছে। এখানে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের বোলবোলাওয়ের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে পিতৃতন্ত্র। অনার ক্রাইমের অধিকাংশ ঘটনাতেই দেখা যায়, মেয়ের পরিবার থেকেই বেশি বাধা। অর্থাৎ নিজেদের যৌনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার মেয়েদের থাকতে নেই, কারণ পিতৃতন্ত্রে মেয়েদের যৌন ইচ্ছে, পছন্দ, সবই পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলে। পিতৃতন্ত্রে নারীদেহ হল পরিবার, সমাজের সম্পত্তি। তাই পরিবার অথবা সম্প্রদায় ঠিক করে— মেয়ে বিয়ে করে কার শয্যাসঙ্গী হবে, কারণ এই একবিংশ শতকেও নারীর ঘাড়েই বংশরক্ষার ভার! বংশে ‘রক্তের শুদ্ধতা’ রক্ষার দায়ও নারীর। দুঃখের কথা হল, বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের নিয়ন্তারাও তা-ই বিশ্বাস করেন। ফলে, পরিবার বা সম্প্রদায়ের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নিজের দেহের ওপর স্বনিয়ন্ত্রণের দাবিতে মেয়েরা যে রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হবেন, মোদী-শাহের দরবারে সে দরজাও বন্ধ।

সত্তরের দশকের নারীবাদী আন্দোলনের ঝড়-তোলা স্লোগান ছিল: ‘পার্সোনাল ইজ় পলিটিক্যাল’। মেয়েদের দৈনন্দিন বৈষম্যের অভিজ্ঞতাগুলিকে সমাজ ও রাষ্ট্র নেহাতই ‘ব্যক্তিগত’ ঘটনা বলে লঘু করার চেষ্টা তখনও করত, এখনও করে। নিজের যৌনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার যে মেয়েদের (এবং যে কোনও লিঙ্গের মানুষের) নিছক ব্যক্তিগত, পারিবারিক বিষয় নয়, নাগরিক অধিকার, সেই অধিকার সুনিশ্চিত করা যে রাষ্ট্রের কর্তব্য, সে কথা উচ্চকণ্ঠে বলার সময় এসেছে। 

এ দেশের বর্তমান সরকার মেয়েদের যৌন অধিকার লঙ্ঘনের উপর দাঁড়িয়ে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে যে বিভেদের বীজ বপন করছে, সেটিকে এখনই বিনাশ করা প্রয়োজন। এখনই দাবি তোলা দরকার, বিয়ে শুধুমাত্র পারিবারিক, সামাজিক বিষয় নয়। বিয়ের মোদ্দা কথাটি হল, জাত-ধর্ম, লিঙ্গপরিচিতি নির্বিশেষে নিজের পছন্দমতো যৌনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার। আর তা হল সমস্ত মানুষের নাগরিক অধিকার।