কুৎসা ও কুপ্রচার ভয়ানক বস্তু। কিন্তু তদপেক্ষা অনেক বেশি ভয়ানক এবং বিপজ্জনক— মিথ্যা ও অপপ্রচার। মহাত্মা গাঁধীর সার্ধশতবর্ষ সমাপনকালে তেমনই একটি বিপজ্জনক জায়গায় তাঁহাকে লইয়া আসা হইল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পরিচালক মোহন ভাগবতরা এত দিন গাঁধীকে মোটের উপর ব্রাত্য করিয়া রাখিয়াছিলেন, গাঁধীঘাতক নাথুরাম গডসেকে লইয়া উৎসবও করিতেছিলেন তাঁহাদের কিছু কিছু অনুগামী। এই বার কুৎসা হইতে হাওয়া ঘুরিয়া গেল অপপ্রচারের দিকে— মহাত্মা গাঁধী যাহা বলেন নাই, যাহা বোঝাতে চাহেন নাই, নিজের ক্ষীণ শরীর ও সত্যসন্ধানী আত্মার সর্বশক্তি দিয়া যাহার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন, সে সবই তাঁহার নামের সহিত যুক্ত করা হইল। সম্ভবত একটি নূতন যুগের সূচনা হইল— অন্যায়, মিথ্যা, অপব্যাখ্যা, অসম্মান দিয়া মহাত্মা গাঁধীকে কতখানি কলুষিত করিলে দেশের সঙ্কীর্ণতম ও সর্বাধিক আক্রমণাত্মক রাজনীতিভাবনার ভিতরে তাঁহাকে চাপিয়াচুপিয়া ঢুকাইয়া লওয়া যায়, সেই প্রচেষ্টার যুগ। শঙ্কা হয়, বিজেপি-আরএসএস অতঃপর তাঁহার সত্য-আগ্রহকে মারিয়া মিথ্যার জয়কেতন উড়াইবে।

দিল্লিতে একটি পুস্তকপ্রকাশ অনুষ্ঠানে আসিয়া মোহন ভাগবত একটি আশ্চর্য যুগলবন্দি রচনা করিলেন। একই সঙ্গে ভারত কেন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ব্যাখ্যা করিলেন, এবং মহাত্মা গাঁধীর জীবনদৃষ্টি অনুসরণ করিয়া চলিবার গুরুত্বের কথা বলিলেন। অর্থাৎ, গাঁধী যে ‘ধর্ম’বোধ দ্বারা চালিত হইতেন, তাহার সহিত হেডগেওয়ার-সাভারকর-শ্যামাপ্রসাদের হিন্দুত্ববাদকে গুলাইয়া দেওয়া হইল। গাঁধী যে ‘স্বরাজ’ বা ‘রামরাজ্য’-এর কথা বলিতেন, তাহার সহিত সঙ্ঘীয় হিন্দু রাষ্ট্রকে মিশাইয়া দেওয়া হইল। এবং, গাঁধী যে সনাতন ভারতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তাহাকে মিথ্যা দিয়া সাজাইয়া কল্পিত প্রাক্-মুসলিম ও অ-মুসলিম ভারতীয়ত্বের যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হইল। অথচ মহাত্মার আজীবনের ত্যাগময় উদার সর্বথা-আনত ধর্মবোধ কিন্তু ঠিক এই অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধেই অসহিষ্ণু হইত। দেশভাগের প্রাক্কালে তিনি এই হিন্দুত্ববাদের নিকটই নিজের বার্তা পৌঁছাইয়া দিবার জন্য অনশন করিয়াছিলেন। ‘হিন্দ স্বরাজ’-এর মধ্যে যে পুরাতন গৌরবের ভাবাদর্শ— তাহা প্রকৃতপক্ষে উদ্‌ভ্রান্ত আধুনিকতাবাদের বিরুদ্ধে, জ্ঞানজাগতিক নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আত্ম ও সমাজকে শক্তি দিবার কথা বলে। তাহার মধ্যে সঙ্ঘীয় রাষ্ট্র বা বিজেপির হিন্দু-ভারতের ছায়ামাত্রও যে নাই, ভাগবতরা সে কথা খুব ভাল করিয়া জানেন। জানেন বলিয়াই গডসেকে তাঁহারা পছন্দ করিয়া আসিয়াছেন। জানেন বলিয়াই এখন জাতিমানস হইতে জাতির জনককে উৎখাত করিতে না পারিয়া গাঁধীবাদকে ঘুরপথে দলে টানিবার বন্দোবস্ত করিতেছেন।

দিল্লিতে ভাগবত এই সব বলিলেন। আর কলিকাতায় মন্ত্রী অমিত শাহ, নেতা দিলীপ ঘোষ বলিলেন, এনআরসি ও সিটিজ়েনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিলের মাধ্যমে এমন একটি রাষ্ট্র গড়িতে চলিয়াছেন তাঁহারা, যেখানে হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের স্থান আছে। অর্থাৎ ধরিয়া লওয়া যায়, মুসলিমদের স্থান নাই। বাস্তবিক, মুসলিমদের এই স্পষ্ট অনুচ্চারণ যে কোনও সচেতন শান্তিকামী নাগরিককে বিচলিত করিবে। মনে হইবে, ‘অনুপ্রবেশ’ শব্দটি নেহাত আলঙ্কারিক— এনআরসি-ই হউক, আর নাগরিকত্ব বিলই হউক, এ সবের প্রকৃত লক্ষ্য মুসলিমদের বার্তা প্রেরণ যে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ তাঁহাদের জন্য নহে। একটি বিদেশি সংবাদপত্রে গাঁধীজয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রবন্ধে মহাত্মার প্রাসঙ্গিকতা আলোচনাসূত্রে অহিংসা, অসহযোগ, স্বরাজ, অনেক কথাই আসিয়াছে। কিন্তু মহাত্মা যে তাঁহার জীবনের একটি বড় সময় কেবল সাম্প্রদায়িক অনুদারতার বিপক্ষে, ও সর্বধর্ম-সমন্বিত সমাজের পক্ষে কথা বলিয়া কাটাইয়াছেন, তাহার উল্লেখ নাই। অপব্যাখ্যা ও মিথ্যার পঙ্কিল আবর্তে ডুবিতেছে সার্ধশতবর্ষ।