সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কোনও প্রশ্ন নয়

Parliament
ছবি: সংগৃহীত।

কোভিড-১৯ ভারতের অর্থনীতিকে ধরাশায়ী করিয়াছে, অতঃপর গণতন্ত্রের হাড়ে কাঁপুনি ধরাইল। ভারতের সংসদের বাদল অধিবেশনে প্রশ্নোত্তরের জন্য নির্দিষ্ট সময় (কোয়েশ্চন আওয়ার) বাতিল হইল। পশ্চিমবঙ্গেও বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্ব খারিজ হইতে পারে। আইনসভা যদি গণতন্ত্রের হৃদয় হয়, তবে মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বটি তাহার প্রাণভ্রমর। এই সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সরকারের যে-কোনও সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রশ্ন তুলিতে পারেন। তাহার উত্তর দিতে হইবে সরকারকে। আইনসভার বিধিনিয়ম এই প্রশ্নোত্তর পর্বকে স্বতঃস্ফূর্ত হইবার অবকাশ দিয়াছে, তাই দৈনন্দিন কার্যসূচির মধ্যে এই অংশটি সর্বাপেক্ষা প্রাণবন্ত। সরকার জনগণের নিকট জবাবদিহি করিতে দায়বদ্ধ, এই সত্যটি বেলা বারোটায় (জ়িরো আওয়ার) প্রত্যক্ষ সত্য হইয়া জাতির সম্মুখে আসে। ইতিহাসের সাক্ষ্য ইহাই যে, এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বের সুযোগে বিরোধীরা এমন বহু বিষয় সরকারের সম্মুখে আনিয়াছেন, যাহার উত্তর খুঁজিতে গিয়া দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের ঘটনা বাহির হইয়াছে, পদস্থ ব্যক্তিরা খারিজ হইয়াছেন। সর্বোপরি, যে সঙ্কটগুলি অত্যন্ত তীব্র হইয়া দেখা দিয়াছে, যে সকল অন্যায়-অবিচার জনজীবনকে পর্যুদস্ত করিতেছে, সেগুলির দ্রুত নিরসনে সরকারকে বাধ্য করিবার এটি একটি পথ। বিরোধী তথা জনগণের হাতে গণতন্ত্র যে কয়েকটি অস্ত্র দিয়াছে, তাহার অন্যতম আইনসভার প্রশ্নোত্তর পর্ব।
ঘণ্টাখানেকের প্রশ্নোত্তর পর্বটি ব্রিটিশ সংসদীয় প্রথার উত্তরাধিকার। আজ ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ন্যায় ঔপনিবেশিক আইন বহাল রহিয়াছে, কিন্তু আইনসভায় প্রশ্নোত্তরের রীতিটি খারিজ হইতেছে, তাহা এই দেশে গণতন্ত্রের অবস্থার একটি সূচক। কোভিড অতিমারিকে বিরোধীর কণ্ঠরোধের সুযোগ করিয়া তুলিয়াছেন ক্ষমতাসীন নেতারা। লকডাউনে সকল আন্দোলন নিষিদ্ধ হইয়াছে, সকল আলোচনা ও বিতর্ক মুলতুবি হইয়াছে। অথচ নীতি-বিষয়ক সিদ্ধান্তগ্রহণ অব্যাহত। খনি ও খনিজ দ্রব্য সংক্রান্ত আইনের (১৯৫৭) গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাবে জনমত জানাইবার সময়সীমা মোদী সরকার দিয়াছিল মাত্র দশ দিন। পরিবেশের উপর শিল্পনির্মাণের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইন, যাহা বিপুলসংখ্যক প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করিবে (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২০), তাহাও মাসখানেকে সারিতে চাহিয়াছিল কেন্দ্র। আদালতের দ্বারস্থ হইয়া সময় বাড়াইতে হইয়াছে। এমন উদাহরণের অভাব নাই। বিরোধীর সহিত বিতর্ক, অথবা জনগণের উদ্বেগ-আশঙ্কা লইয়া আইনসভায় আলোচনার কোনও মূল্য রহিয়াছে, কেন্দ্র বা রাজ্যের ক্ষমতাসীন নেতারা কখনও এমন ইঙ্গিত দেন নাই। সন্দেহ হয়, তাঁহাদের নিকট গণতন্ত্রের মাপ ২৪-২৪-৩০ ইঞ্চি। অর্থাৎ, ইভিএম-এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার সমান। প্রশ্ন তাহাতে আঁটিতে চায় না। বিশেষত লকডাউন-জনিত বিবিধ বিপর্যয়ে জনমানসে যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়াছে, সেই বিষয়ে সংসদ বা বিধানসভায় বিরোধীদের প্রশ্নের অভিঘাত সামান্য হইবে না। তাহার পাট তুলিয়া দেওয়াই নিরাপদ মনে হইতেছে ক্ষমতাসীন নেতাদের।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অবশ্য নিজেকে ‘প্রশ্নাতীত’ বলিয়া প্রতিষ্ঠা করিবার প্রচেষ্টা বহু পূর্বেই শুরু করিয়াছেন। সাংবাদিকের প্রশ্ন তিনি গ্রহণ করেন না। তাঁহার বক্তব্য দেশবাসী জানিতে পারেন জনসভার বক্তৃতায়, নহিলে ‘মন কি বাত’ বেতার অনুষ্ঠানে। তাঁহার সাম্প্রতিক বেতার-ভাষণগুলি শুনিয়া একটিই কথা মনে আসে, তাহা ‘মুখর নীরবতা’। অনর্গল কথা বলিতেছেন মোদী, কিন্তু অর্থনীতির পতন, কর্মহীনতা, স্বাস্থ্য, বুনিয়াদি শিক্ষার বিপর্যয়ের মতো জরুরি বিষয়ে তিনি নীরব। অসার বক্তব্যের বর্ষণ, জরুরি উত্তরের খরা, ইহাই কি ভারতে গণতন্ত্রের নিয়তি?

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন