২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ভয়াবহ গোধরা কাণ্ড। তার পরে পরেই ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ বিতর্কের জন্য কলকাতায় এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কসভায় মোদীকে ডাকায় বামপন্থী কর্মীরা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। ঠিক হয়, বিমানবন্দরে কালো পতাকা দেখানো হবে। উদ্বেগ ছিল মোদীর আগমনকে কেন্দ্র করে কলকাতায় সে দিন কোনও অপ্রীতিকর হাঙ্গামা যেন না হয়ে যায়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমাদের ছেলেরা, এমনকী নকশালরাও মোদীবিরোধী বিক্ষোভ দেখালে আমি তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার উপেক্ষা করতে পারি না। কিন্তু উনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী, আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব ওঁর কলকাতা সফরে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা না ঘটতে দেওয়া।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে মোদীর সঙ্গে সে দিন সন্ধ্যায় ক্যালকাটা ক্লাবে আসা এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। বিক্ষোভকারীরা মোদী-বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে গাড়ির সামনে কাচের উপর এসে হুমড়ি খাচ্ছে, পুলিশ লাঠি দিয়ে তাদের সরাচ্ছে। ধস্তাধস্তি দেখে নিরুত্তাপ মোদী মৃদু হেসে বলেছিলেন, ওরা যতই বিক্ষোভ দেখাবে আমার গন্তব্যে পৌঁছনোর পথ তত প্রশস্ত হবে। আমি জানি, কোনও অন্যায় করিনি। এ-ও জানি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিজেপির সঙ্গে আছে ও থাকবে। এই বিক্ষোভ আমাদের মতাদর্শগত অবস্থানকে আরও প্রাসঙ্গিক করছে। সে দিনই মোদী কলকাতায় প্রথম ঘোষণা করেছিলেন, আমরা এক নতুন ভারত গড়তে চাই।
সে দিনই বুঝতে পেরেছিলাম নরেন্দ্র মোদী নামক মানুষটির মধ্যে একটা সিংহসুলভ বিক্রম রয়েছে। চাণক্য বলেছিলেন, রাজার প্রধান সম্পদ বিক্রম। বিক্রমের মাধ্যমে রাজার উদ্যম বৃদ্ধি পায়। রাজা অভীষ্ট লাভ করেন।
টেলিগ্রাফ বিতর্কে কেন গোধরা-কলঙ্কিত মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, সে দিন সে প্রশ্নও উঠেছিল কলকাতার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক সমাজে। পাল্টা যুক্তি নিশ্চয়ই ছিল। চিন্তার জগতে বহুত্ববাদে বিশ্বাস করলে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ভিন্ন মত থাকলে তাকেও পরিসর দিতে হবে। বরং গোটা দেশ জুড়ে যারা অন্ধ ভাবে মোদীর হিন্দুত্বের বিরোধিতা করে এসেছেন, আজ এই বিপুল জয়ের পর তাঁদেরই কি আত্মসমীক্ষা করতে বসা উচিত নয়? কী ভাবে নরেন্দ্র মোদী এই ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধিতাকেই কাজে লাগিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রের নামে এক নতুন মোদীত্ব নির্মাণে সক্রিয়। অতীতে কংগ্রেসের একদলীয় আধিপত্য থেকে বিজেপির একদলীয় আধিপত্যের যুগে তিনি সফল হচ্ছেন ইনকিলাব জিন্দাবাদ কেন জনসমাজে ইনকিলাব মুর্দাবাদ হয়ে যাচ্ছে, তার বিচার করার সময় কি আজও আসেনি?
মোদী ২০২২ সালের মধ্যে নতুন ভারত গড়ার আশ্বাস দিয়ে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের স্বপ্ন এবং স্লোগান বিক্রি করার কাজ শুরু করে দিলেন। আধুনিক ভারতের এক অসাধারণ ফেরিওয়ালা তিনি। কিন্তু সেই ভারত কোন পথে এগোবে? মোদী কি সত্যিই ধনতন্ত্রের জিহাদ ঘোষণাকারী দীনবন্ধু ‘ইনক্লুসিভ আইকন’? না কি তিনি সাম্প্রদায়িকতার জার? জাতপাত থেকে কোথায় বেরোলাম আমরা? বরং প্রধান সেনাপতি অমিত শাহ তো জাতপাতের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুদক্ষ। সাবেকি ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রকে সরিয়ে দলিত ও ওবিসি-কে বিজেপির গাড়িতে তুলেছেন তিনি।
২০১৪ সালে ৬ মে ভারতীয় গণতন্ত্রে ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। কিন্তু তিন বছর পর উত্তরপ্রদেশের ফলাফল সম্ভবত মোদীর রাজনীতিতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। এই সাফল্যের ঝড়ে তিন বছরের অসন্তোষের তত্ত্ব তিনি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে এক নতুন ভারত গড়ার ডাক দিতে পারছেন। বাজপেয়ী-আডবাণীর বিজেপিকে বদলে মোদী বিজেপির নয়া অবতার। প্রথমে দলের ভিতর, তার পর গোটা দেশে কীভাবে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হয়, তার সমস্ত কলা মোদীর কাছে যে কোনও নেতা শিখতে পারেন।
অনেক কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। গোধরার কিছুদিনের মধ্যেই গোয়াতে দলের কর্মসমিতির বৈঠক হয়। সে বার বৈঠকের আগের দিনই চন্দ্রবাবু নাইডু হুমকি দিলেন, মোদী ইস্তফা না দিলে তেলুগু দেশম এনডিএ পরিত্যাগ করবে। বেলা থেকেই দলের মধ্যে রটে গেছে বৈঠকে বাজপেয়ীর সমর্থন নিয়েই দলীয় শীর্ষ নেতাদেরই এক বাহিনী মোদীর ইস্তফা দাবি করবেন। সাংবাদিকরা সব মাণ্ডবী হোটেলে। ফোন করা হল আডবাণীকে। মোদীজিকে কি ইস্তফা দিতে হবে? আডবাণী বললেন, প্রশ্নই উঠছে না। বুঝিয়ে বললেন, দলের কর্মীরা মোদীর পক্ষে। এর পর ২০১৩ সালে মোদীকে দলের নির্বাচন পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান করা হল, যদি না করা হত, তবে দলে আগুন লেগে যেত।
কাজেই এ হল মোদীত্বের জয়। মোদীত্বের জয় মানে বাজপেয়ী-আডবাণীর সবেকি জনসঙ্ঘ মার্কা হিন্দুত্ব নয়। মোদীত্ব মানে জাতীয়তাবাদ, সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র। উন্নয়ন। মহানায়কত্ব। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, বাহুবলের ফ্যাসিবাদের পর এসেছে গণতন্ত্রের বাক্যবল। তিনি পটেলের মূর্তিস্থাপন করেন। আবার নেহরুর নাম উচ্চারণ না করে তাঁর ভাষাতেই শিল্পের কথা বলেন। দলিত সমাজকে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। ভর্তুকি বন্ধ করে গরিবের মসিহা হতে চান। আবার এই মোদীত্বের মধ্যেই রয়েছেন অমিত শাহ। তার মধ্যেই শ্মশান-কবরস্থান। মোদীর রান্নাঘরে এ এক অসাধারণ সুস্বাদু পাঁচমিশেলি তরকারি। তার উপর সুদৃশ্য পরিবেশনা। যাকে বলা হয় অপটিকস।
অতএব মোদীর রথ কেজরীবাল কী করে আটকে দিয়েছিলেন, বিহারের মহাজোট কী ভাবে মোদীর ২০১৪-র ঝড়তে স্তব্ধ করেছিল, এ সব অতীত। বিরোধীদের রণশিথিলতার সুযোগ নিয়ে অচ্ছে দিন-এর স্লোগান ভুলিয়ে দিয়ে আবার এক নতুন ভারতের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা তিনি। বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, নিশ্চয়ই আকাশগঙ্গা নামবে মোদীর নেতৃত্বে। ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত অনুবর্তন আজও সত্য। বীর সাভারকর, মাধব সদাশিব গোলওয়ালকরের শিকড় থেকেই একদা আডবাণীর রথযাত্রা। বাজপেয়ী উদার, আডবাণী কট্টর। এখন মোদী = বাজপেয়ী + আডবাণী। কিন্তু মতাদর্শগত শিকড়ে কী গ্রহণের থেকে বর্জন বেশি নেই?
মানুষকে মাদক সেবনে কিছুদিন বেহুঁশ রাখা যায়। অসত্যকে সত্য বলেও জাহির করা যায়। কিন্তু আপাতত অনাদরে যাঁরা কুণ্ঠিত, ভবিষ্যৎ সেই পথকে সাদরে বরণ করবে না, ইতিহাসের অনুশীলন কিন্তু তা বলে না।