Advertisement
E-Paper

অথচ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই সুয়োরানি

কিছু কাল হল, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটা ক্রমিক তালিকা তৈরির রেওয়াজ হয়েছে। তাতে সবচেয়ে বিশ্বস্ততা লাভ করেছে টাইমস হায়ার এজুকেশন-এর তালিকা। সহজবোধ্য কারণে এই তালিকার প্রায় পুরোটা জুড়ে থাকে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রতিষ্ঠান।

সুকান্ত চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:৪৮

কিছু কাল হল, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটা ক্রমিক তালিকা তৈরির রেওয়াজ হয়েছে। তাতে সবচেয়ে বিশ্বস্ততা লাভ করেছে টাইমস হায়ার এজুকেশন-এর তালিকা। সহজবোধ্য কারণে এই তালিকার প্রায় পুরোটা জুড়ে থাকে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রতিষ্ঠান। ইদানীং তাই একটা পৃথক তালিকা তৈরি হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলির, বিশেষত ‘ব্রিকস’ অর্থাৎ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। ২০১৬-র আগাম তারিখ দিয়ে সেই তালিকাটির নতুন সংস্করণ সদ্য প্রকাশিত হয়েছে।

এমন তালিকার ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে। ছাত্রদের পরীক্ষার ফল যেমন নানা বিষয় যোগ করে মোট নম্বর গুনে হিসাব করা হয়, এও একেবারে তাই। পরীক্ষার নম্বরের বিচারকে ধ্রুবজ্ঞান করা, বিশেষত তার ভিত্তিতে ‘প্রথম কুড়ি’ বা ‘প্রথম একশো’ ছাত্রকে বাছা নিয়ে যে সঙ্গত আপত্তি আছে, এ ক্ষেত্রেও তা উঠতে পারে। বেশি করে উঠতে পারে, কারণ এক-তৃতীয়াংশ নম্বর বরাদ্দ আছে নিছক ‘সুখ্যাতি’র জন্য। চক্রবৎ যুক্তিতে তার অর্থ, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়কে লোকে ভাল মনে করলেই তা ভাল। ভারতের ক্ষেত্রে আর একটা অসুবিধা, মূল্যায়নের এক মাপকাঠি হল বিদেশি অধ্যাপকদের সংখ্যা; অথচ আমাদের আইন অনুসারে কোনও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশিদের নিয়োগ করতে পারে না (বেসরকারিরা পারে কিন্তু)। তবু ছাত্রদের ক্ষেত্রে যেমন পরীক্ষার ফল মেধা বা অন্তত নিষ্ঠা মাপার একটা মোটা দাগের সূচক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তেমন ধরা যেতে পারে।

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কখনওই এই পরীক্ষায় তেমন এঁটে উঠতে পারে না। সর্বশেষ তালিকাতেও প্রথম ২০০-র মধ্যে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আছে ১৬টি, চিনের ৩৯টি, এমনকী তাইওয়ানের ২৪টি। ভারতে প্রথম (পুরো তালিকায় ষোড়শ স্থানে) বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স যা আদতে বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সমৃদ্ধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ২৯ থেকে ৪৮-এর মধ্যে আছে পাঁচটি আইআইটি, যা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু বিশেষ ধরনের ও অতি বিশেষ অর্থ ও সুবিধাপ্রাপ্ত।

নামেই বলে-কয়ে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’গুলির মধ্যে ভারতে প্রথম, এবং প্রথম ১০০-র মধ্যে একমাত্র হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (পুরো তালিকায় ৮০ নম্বরে)। প্রথম ১৫০-এ তার পর যথাক্রমে গুয়াহাটি ও কানপুরের আইআইটি (৮৩ ও ৯৫), এবং পঞ্জাব (১২১), পুণে (১২৭), কলকাতা (১৩৭) ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (১৫০)।

আবার বলছি, এই তালিকা শিরোধার্য করার কারণ নেই। তবু এর ভিত্তিতে কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু প্রস্তাবের অবকাশ আছে। তার প্রথমটা বড় দুঃখের সঙ্গে বলছি। সেরা ১৫০-এর মধ্যে নামে-ডাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ সারা ভারতে যে পাঁচটি, তার দুটি পশ্চিমবঙ্গে। এটা কোনও ব্যতিক্রম নয়, গত তিন দশকের প্রায় যে কোনও পরিসংখ্যানে বাংলার এই আনুপাতিক প্রাধান্য দেখা যাবে। অথচ বরাবরের মতো এ-বারও দেখলাম, এই লেখার সময় পর্যন্ত বাংলার কোনও ভূমিজ সংবাদমাধ্যমে খবরটা প্রচার হয়নি। খবরের কাগজে তবু রাজ্যের উচ্চশিক্ষা নিয়ে ক্বচিৎ ইতিবাচক রিপোর্ট বেরোয়।

টিভি চ্যানেলগুলি একযোগে অঘোষিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে তারা ভুলেও কোনও ভাল কথা বলবে না। সেটা তাদের ব্যাপার, কিন্তু এর ফলে রাজ্যবাসীর মনে ঘরের প্রতিষ্ঠানগুলি সম্বন্ধে সঙ্গত বিরূপতা একটা অসঙ্গত স্তরে পৌঁছায়, ছাত্র-শিক্ষক-কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়েন।

তালিকার আরও কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। এক হল, ১৫০ স্থানে আলিগড় বাদ দিলে আর চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ই রাজ্য সরকারের অধীন, কেন্দ্রের নয়। দিল্লি আছে ১৫৪ স্থানে। বিস্ময়কর ভাবে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা হায়দরাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ২০০-র মধ্যেও নেই। (দ্বিতীয়টি কোনও দিনই ছিল না।) গত দু-তিন দশকে অর্থ, অতএব শিক্ষকসংখ্যা, পরিকাঠামো ও অন্য সব দিক দিয়ে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বিপুল বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নতুন করে স্থাপিত হয়েছে ষোলোটি, তাদের পিছনে ঢালা হয়েছে কয়েক সহস্র কোটি টাকা। দেশবাসীদের বোঝানো হয়েছে যে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি উৎকর্ষের একটি বিশেষ স্তরে। পাশাপাশি রাজ্য-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দিল্লি কার্যত ত্যাজ্যসন্তান করেছে। তাদের হিতার্থে ‘রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা অভিযান’ নামে আপত্তিকর শর্তে যে সম্মোহিনী প্রকল্প চালু হয়েছে তারও এক-তৃতীয়াংশ টাকা জোগাতে হবে রাজ্য সরকারকে।

সব চেয়ে মারাত্মক কথা, অনুমোদিত অর্থও ইদানীং দিল্লি থেকে পাওয়া যাচ্ছে না: মাস ঘুরে বছর কেটে যায়, হয়তো বা আদৌ আসে না। নির্ধারিত প্রকল্প মঞ্জুরিও শিকেয় তোলা থাকে একই কারণে। শুধু আমাদের রাজ্যেই সব ক’টা বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে এই মুহূর্তে অন্তত একশো কোটি টাকা পাওনা আছে অনুমান করা যায়। কেন্দ্রীয় বাজেটে ফি-বছর যে কোপ পড়ছে, তারও মূল আঘাত রাজ্য-বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপর, যেমন আরও মর্মন্তুদ ও ক্ষমাহীন ভাবে সর্বশিক্ষা মিশন ও অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পে। যে প্রাতিষ্ঠানিক ‘মেধা-তালিকা’ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার উদ্গ্রীব, যে পারফরমেন্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন তাদের ঘোষিত মন্ত্র, তার সাক্ষ্যেই তাদের উচ্চশিক্ষা নীতির বড় রকম অদলবদল করা উচিত, যদিও তা হওয়ার আশা শূন্য। দেশের সরকারি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বাঁচাতে গেলে এই সিদ্ধান্ত নিতেই হবে যে মালিকানা কেন্দ্র-রাজ্য যার হাতেই থাকুক, উন্নয়নের অনুদান ও মোটের উপর সমমানের বেতনক্রম নিশ্চিত করবে কেন্দ্রীয় সরকার। ইউজিসির সবচেয়ে ফলপ্রসূ যুগে এই ব্যবস্থাই ছিল, তাতে বহু দোষত্রুটি সত্ত্বেও দেশের উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও উন্নতি ঘটেছিল। অনুরূপ কোনও ব্যবস্থায় ফিরে না গেলে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপর বর্ষিত অর্থ বহুলাংশে বৃথা যাবে; অন্য দিকে রাজ্য স্তরের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অসম প্রতিযোগিতায় একে একে হেরে যাবে, দু’চারটি (যেমন আলোচ্য তালিকায়) আশ্চর্য ভাবে উৎকর্ষ বজায় রেখে দেশের মান তবু খানিক রক্ষা করবে।

এটা বলার অর্থ এই নয় যে রাজ্যগুলির ভূমিকা সন্তোষজনক। যাঁরা মনে করেন যত গোলমাল পশ্চিমবঙ্গে, অন্যত্র সব দিব্যি ভাল, তাঁদের ধারণা নেই অধিকাংশ রাজ্যে উচ্চশিক্ষা ঘিরে কী চরম অবহেলা ও ভ্রষ্টাচার চলছে। এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলতে হয়, ব্রিকস তালিকাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় দুটি কত দিন সেই স্থান ধরে রাখতে পারবে, বাকিগুলিরই বা হবে কী। ভবিষ্যৎ কখনওই উজ্জ্বল হতে পারে না যদি একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান উৎকর্ষসাধনের জন্য চিহ্নিত হয়, উপরোক্ত দুটি সহ অন্যগুলির সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক হয় রাজনীতি-বিজড়িত ও প্রতিপক্ষীয়। পারে না, যদি একের পর এক নতুন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্তন হয় পরিকাঠামো, অর্থ, ও সর্বোপরি শিক্ষক নিয়োগের কোনও তোয়াক্কা না করে। আর অবশ্যই পারে না, যদি শিক্ষাপ্রাঙ্গণগুলি উত্তপ্ত থাকে শাসকপুষ্ট পেশিশক্তির আস্ফালনে।

শিক্ষার উন্নতি সমাজের একটা সার্বিক প্রক্রিয়া। এক মঞ্চে মার্গসঙ্গীত আর বাঁদরনাচ চলে না। তেমনই একই পরিমণ্ডলে হাতে-গোনা প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে নাম কিনব, পাশাপাশি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে হিংসা, লোভ আর দুরাচারের অবাধ রাজত্ব কায়েম করব, এই দ্বৈত কার্যক্রম যে কত দূর অবাস্তব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ প্রায় স্বাধীনতার কাল থেকে কী কেন্দ্রে কী অধিকাংশ রাজ্যে সেই অসম্ভব মিলন ঘটাবার প্রচেষ্টা চলছে, প্রথম উদ্দেশ্যটি যদি আদৌ লক্ষ্যে থাকে। আইআইটি গোছের অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান এই আবর্তের বাইরে থাকতে পেরেছে শ্রেণিস্বার্থে কর্তারা তাদের ছাড় দিয়েছেন বলে, ছাত্রেরাও কেরিয়ার গড়ার দিকে নিজেদের অস্বাভাবিক রকম আবদ্ধ রেখেছে বলে।

সাধারণ ভাবে কিন্তু রাজনীতি আর প্রশাসনের ফাঁক গলে লেখাপড়ার ভাবনাচিন্তা কর্তৃপক্ষের তরফে আগেও দেখা যায়নি, আজও যাচ্ছে না। যাঁরা লেখাপড়া করেন তাঁরা করেন একান্ত নিজেদের গরজে, উপরওয়ালাদের সঙ্গে গরম না হলেও অন্তত ঠান্ডা লড়াই চালিয়ে। বিধাতার খেয়ালে বঙ্গভূমে এমন লড়াইখ্যাপা পাগলা জগাই অনেক জন্মায়, তাই কিছুতেই এখান থেকে লেখাপড়া নির্মূল করা যাচ্ছে না।

তবে, এমন অবস্থায় লেখাপড়ার কারবারিদের আত্মস্থিত, বলতে গেলে সমাধিস্থ হতে হয়। তার একটা দুর্ভাগ্যজনক ফলের কথা বলে শেষ করব। বিষয়টা সর্বাংশে বাহ্যিক, তবু কেন যেন আমাদের চোখে পড়ে না। আমাদের অগ্রণী এমনকী বিশ্বস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলির বহিরঙ্গ ও বস্তুগত পরিবেশ সারস্বতচর্চা কেন, যে কোনও ভদ্র রুচি ও কর্মসংস্কৃতির প্রতিকূল। অন্য প্রতিষ্ঠানের নজির টানব না। আমার নিজের প্রাক্তন বিভাগটি নেহাত অখ্যাত নয়। আজও সেখানে গেলে ভাবি, আমার বিদগ্ধ, কর্মনিষ্ঠ, এবং যথেষ্ট সচেতন ও প্রতিবাদী সহকর্মীরা কী করে রোজ সেই কুশ্রী স্যাঁতাপড়া সিঁড়ি দিয়ে ওঠেন নামেন, মেরামতের জন্য কর্তৃপক্ষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন না। ভাবি, যে প্রিয় আড্ডার স্থানগুলি ছেলেমেয়েরা ভরে রাখে বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের উচ্ছিষ্টে সেগুলি আঁস্তাকুড়ে পরিণত করতে তাদের বিতৃষ্ণা জন্মায় না? সাহেবরা দেখলে নিন্দা করবে, এটা বলে নিজেদের অপমান করব না। বরং আগের একটা কথার আদলে বলি, লেখাপড়া একটা সার্বিক প্রক্রিয়া। যারা লেখাপড়া ভালবাসে, তারা প্রায়শ লেখাপড়ার বাতাবরণ পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় রাখতে চায়, সেটাও সুষ্ঠু কাজের একটা শর্ত বলে মনে করে। বঙ্গজ বিদ্যানুরাগীরা যে করেন না দেখাই যাচ্ছে। তবু ভাবলে হয়, এর ফলে আমাদের মানসিক জীবনে একটা দৈন্য থেকে যাচ্ছে কি না; পরিপার্শ্বের যত্ন নিতে যে বিশেষ ধরনের উদ্যম ও মমত্ববোধের প্রয়োজন, তা আমাদের লেখাপড়া ভাবনাচিন্তায় একটা নতুন মাত্রা যোগ করত কি না; এবং বিশ্বের দরবারে পৌঁছে আমরা যে শেষ চৌকাঠে আটকে যাই, এটাও তার একটা কারণ কি না।

বক্তব্যটা একটু সূক্ষ্ম হয়ে গেল, যদিও তার উপলক্ষ স্থূল ভাবে দৃশ্যমান। যে কর্তৃপক্ষীয় শক্তিগুলির আলোচনা গোড়ায় করেছি, সেগুলি সব দিক দিয়েই স্থূল, বিদ্যাবিরোধী, কিন্তু সে কারণেই মৌলিক। এ ক্ষেত্রেও সাহেবরা কী বলবে তা বড় কথা নয়। কিন্তু সাহেবদের আদৌ কিছু বলতে হবে কেন, সেই প্রশ্ন অসমীচীন নয়। যদি বা তাদের ঠেলায় আমাদের ঘুম ভাঙে, জেগে উঠে তো নিজেদের পথ নিজেদেরই দেখতে হবে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির এমেরিটাস অধ্যাপক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy