সাফল্য আসিল দুই দশকের প্রচেষ্টায়। জইশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহারকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করিল রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ। ১৯৯৯ সালে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী’ চিহ্নিতকরণ কমিটি গঠন করিয়া মাসুদকে তালিকাভুক্ত করিবার প্রস্তাব করিয়াছিল এই পরিষদ। কিন্তু বারংবার সন্ত্রাস বিষয়ক ‘১২৬৭ কমিটি’র বিশেষ বৈঠকে উক্ত প্রস্তাবে ভিটো দিয়াছিল সদস্য দেশ চিন। বুধবার মূলত তাহাদের আপত্তি প্রত্যাহারের ফলেই মাসুদকে সন্ত্রাসবাদী তকমা দেওয়া সম্ভব হইল। ফলস্বরূপ মাসুদের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হইবে এবং সম্পূর্ণ গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হইবে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য দেশগুলি যে হেতু নির্দেশিকা মান্য করিতে বাধ্য, অতএব মাসুদকে কার্যত গ্রেফতার না করিয়া পাকিস্তানের পথ নাই। সন্ত্রাসে মদতের প্রশ্নে পাকিস্তান আরও সঙ্কটে পড়িবে, তাহাতেও সন্দেহ নাই। তবে ইহাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বর্ণিত ‘ভারতের জয়’ বলা চলে কি না, তাহা তর্কসাপেক্ষ। লক্ষণীয়, কৃতিত্ব দাবি করিতে ময়দানে অবতীর্ণ হইয়াছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি পাকিস্তানও।

রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলি বৈঠক করিয়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে। অতএব তাহাকে কোনও নির্দিষ্ট দেশের কৃতিত্ব বলা চলে না। তবে ঘটনাক্রম দেখিলে বলিতে হয়, এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক ‘কৃতিত্ব’ চিনের। একটি সিদ্ধান্ত বেজিংয়ের আপত্তিতে দশ বৎসর স্থগিত ছিল, তাহারা ঘাড় নাড়িতেই তাহা পাশ হইল— সরল যুক্তিতে চিনই চাবিকাঠি। এই সিদ্ধান্তের ফলে চিন-পাকিস্তান সম্পর্কে প্রভাব পড়িবার আশঙ্কা নাই— এই বাস্তবও চিনের সুবিধাজনক অবস্থান বুঝাইয়া দেয়। মাসুদ বিষয়ক সিদ্ধান্তের অল্প পরেই বেজিং জানায়, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানের ভূমিকা বিপুল, আন্তর্জাতিক মহলে তাহার স্বীকৃতি বিধেয়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ইসলামাবাদের পাশে থাকিবার অঙ্গীকার করিয়াছে চিন। প্রশ্ন থাকিবেই, চিনের সদিচ্ছা ব্যতীত পাকিস্তান কত দূর আগাইবে, কারণ হাফিজ় সইদকে তালিকাভুক্ত করিবার পরও কার্যক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন সফল হয় নাই।

দুই দেশের প্রতিবেশী ভারতে অপর এক কুনাট্য জমিয়াছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মাসুদের তালিকাভুক্তির বিষয়টি লইয়া পৌঁছাইয়াছেন রাজস্থানের দলীয় জনসভায়। ঘোষণা করিয়াছেন, বালাকোট অভিযানের দিন যে ভাবে মরুরাজ্যে উপস্থিত হইয়াছিলেন, শক্তিশালী নেতার আপসহীনতার ফলে পুনর্বার তদ্রুপ সুখবর আসিয়াছে, অতএব অবশিষ্ট তিন দফায় তাঁহার নামে ভোট হউক। তাঁর বিচার— মোদী না থাকিলে ভারতের কণ্ঠ সমগ্র বিশ্ব শুনিবে না বা মানিবে না। নিজেই উত্থাপন করিয়াছেন পূর্বসূরি মনমোহন সিংহের প্রসঙ্গ। কংগ্রেস পাল্টা জানাইয়াছে, মুম্বই হামলার পনেরো দিনের ভিতর হাফিজ় সইদকে তালিকাভুক্ত করিয়াছিল পূর্বতন সরকার। তবু পুলওয়ামা-বালাকোটকে কেন্দ্র করিয়া দেশভক্তির যে চড়া সুর বাঁধিয়াছিলেন মোদী, মাসুদের তালিকাভুক্তি উহাকেই আরও শক্তিশালী করিয়া তুলিতে পারে। বস্তুত, কূটনীতি নিদ্রা যাইতেছে, মঞ্চে অবাঞ্ছিত ভাবে অবতীর্ণ হইয়াছে রাজনীতি। আমেরিকা বা পাকিস্তানও কৃতিত্বে ভাগ বসাইতে নামিয়াছে, ভোটের ভারতে তাহা সর্বাধিক উচ্চগ্রামে হইবে, ইহাতে আর আশ্চর্য কী!