Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

বিরোধীরা যে যার নিজের জায়গায় থেকেই হাত মেলাচ্ছে

পাউরুটি এবং মাখন

জয়ন্ত ঘোষাল
০৬ জুন ২০১৮ ০০:০৩
কর্মপথে: ‘সংবিধানকে রক্ষা করো’ নামক জাতীয় কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। দিল্লি, এপ্রিল ২০১৮

কর্মপথে: ‘সংবিধানকে রক্ষা করো’ নামক জাতীয় কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। দিল্লি, এপ্রিল ২০১৮

আমুল কোম্পানির বিজ্ঞাপন বলছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোয়ালিশন হল পাউরুটি আর মাখন। অমিত শাহ সে দিন বলছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে রাহুল গাঁধী কোথায়? আবার রাজস্থানে মমতা উপেক্ষণীয় শক্তি। এ ভাবে জোট হয়? আমার কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত মত। পাউরুটিতে মাখন নেই। মাখনে পাউরুটি নেই। পাউরুটি আর মাখনের মধ্যে কে নেতা, তা নিয়েও কেউ কোনও দিন কলহলিপ্ত হননি। তবু এ জোট শ্রেষ্ঠ-সফল জোট। একেই বলে, বৈপরীত্যের ঐক্য।

গোটা দেশ জুড়ে উপনির্বাচনগুলিতে বিজেপির পরাজয়, বিশেষত উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে সেই গোরক্ষপুর, ফুলপুর থেকে আজকের কৈরানা— এক ধারাবাহিক স্খলন। প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপনে নবকলেবরে পরিশোধিত পরিবর্তিত মোহজাল সৃষ্টির চেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শীর্ষ বিজেপি নেতারা প্রায় সকলেই ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কবুল করছেন, কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলগুলির এই জোট ২০১৯ সালের নির্বাচনী পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলল। বরং বড় মহাজোটের চেয়ে রাজ্যে রাজ্যে ছোট ছোট বিরোধী জোট আরও কার্যকর হতে পারে।

মনকে চোখ ঠেরে লাভ নেই। নরেন্দ্র মোদীর জনসমর্থন দ্রুত অপস্রিয়মাণ। ‘অচ্ছে দিন’-এর অভয়দান এখন বুমেরাং। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির শতকরা ভোট ছিল ৩১ ভাগ। অর্থাৎ, বিজেপি অনেক আসন পেলেও, ২০১৪ সালেও শতকরা সত্তর ভাগ ভোটদাতা মোদী-বিরোধী ছিলেন। সেই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগাভাগিই ছিল তাই মোদীত্ব নামক মায়াজালের প্রকৃত নেপথ্য কারণ। বিজেপির জয়ের চেয়েও বিরোধীদের অনৈক্যজনিত পরাজয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বের চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, এই বিজেপি মোদী নামক এক ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার চূড়ান্ত রূপ। এবং এই চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্কটের নিহিত রূপ প্রকট হয়ে পড়ল। দেখা গেল, মোদীর বিজেপি ভারতের গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক কাঠামোগুলির উপরই আঘাত হানছে। যে বিকল্প আজ প্রতিভাত হয়েছে, তা এ দেশের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের শিকড় ধরেই টান দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ নানা ভাবে আক্রান্ত। গণতন্ত্রের ভণিতা কিছু দিনের জন্য কিছু মানুষের মধ্যে অলীক কল্পনা গড়ে তোলে, কিন্তু তা অল্প সময়ের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।

এই স্বপ্নভঙ্গের প্রেক্ষাপটেই আজ প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে উত্থিত রাহুল গাঁধী। সম্প্রতি রাহুলের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। দেখছি, রাহুল গাঁধী ঠিক কতখানি সক্রিয়, সে বিষয়ে আমজনতার ধারণা নেই। কী ভাবে কর্নাটকের রণকৌশল সম্পূর্ণ নিজে নিজে রচনা করলেন তিনি, সেটাও তো দেখলাম আমরা। রাহুল গাঁধী ঘনিষ্ঠ মহলে এ কথাও বলেছেন যে, কংগ্রেস এক সুপ্রাচীন দল, তাই এই দল সম্পর্কেও এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কংগ্রেস সামন্ততান্ত্রিক। এই দল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে বিশ্বাস করে। এতটাই যে, দেশের আঞ্চলিক দলগুলিকে নিয়ে জোট করতে জানে না কংগ্রেস। কিন্তু ঘটনা হল, মোদীর বিজেপিই আজ এই সামন্ততান্ত্রিক অসুখগুলির শিকার। রাহুল বরং মনে করছেন, দলের নেতৃত্বের কৌশল: ‘স্টুপ টু কংকার’। হৃদয় জয় করতে গেলে মাথা নিচু করতে হবে।

একটা জিনিস খেয়াল করা দরকার। পশ্চিম এবং মধ্য ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হল কংগ্রেস। ডিসেম্বর মাসে এ বার যে তিন রাজ্যে ভোট, সেই রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তীসগঢ়ে মূল লড়াই হল কংগ্রেস বনাম বিজেপির। এ দেশের বহু রাজ্যই এখন কার্যত আঞ্চলিক দলগুলির দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় আচ্ছন্ন। যেমন, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে বনাম এডিএমকে, অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নায়ডু, ওড়িশায় নবীন পট্টনায়ক এবং বিহারে লালু এবং তাঁর পুত্র তেজস্বী। দিল্লিতে কেজরীবাল, উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ-মায়াবতী, পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক চরিত্র। কংগ্রেসের সঙ্গে ডিএমকে, শরদ পওয়ারের এনসিপি, কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স, জেএমএম, অসমের এআইইউডিএফ, কর্নাটকের জেডিএস, অখিলেশ-মায়াবতী তো আছেই। এ বার উপনির্বাচনে বিজেপির বিপর্যয়ের পর সেই ইউপিএ-রই নবজাগরণ হচ্ছে। ফেডারাল ফ্রন্ট নাম দিয়ে আর একটি জোট গঠনের চেষ্টায় উদ্যোগী হন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও। এই উদ্যোগ, এই দৌড়ঝাঁপ আসলে বিজেপিরই মহাপ্রভুদের অঙ্গুলিহেলনে শুরু হয়।

নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের এখন প্রধান রণকৌশল তা হলে কী হওয়া উচিত? আমি যদি অমিত শাহ হতাম, তা হলে আমার প্রধান কাজ হত বিরোধী শিবিরকে ছত্রভঙ্গ করা। ইউপিএ তো আছেই। এর পাশাপাশি যদি ফেডারাল ফ্রন্ট হয়, তৃতীয় ফ্রন্ট আলাদা থাকে, তবে লাভ হবে বিজেপির। এ তো একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝতে পারছে। তাতে মোদী-শাহের সোনায় সোহাগা। জোট-রাজনীতির মধ্যেও আছে স্পষ্ট মেরুকরণ— একটি ইউপিএ, অন্যটি এনডিএ জোট। একটি কংগ্রেস অন্যটি বিজেপি পরিচালিত।

আমাদের দেশে বিরোধী আঞ্চলিক নেতারা অনেকেই অনেক দিনের পরিশ্রম-আন্দোলনের মাধ্যমে স্ব-স্ব রাজ্যে নিজেদের দলকে আজ এই সাফল্যে আনতে সক্ষম হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীদের প্রধানমন্ত্রী হতে চাওয়ার মধ্যেও কোনও অন্যায় নেই। কিন্তু এখন উপনির্বাচনের সাফল্য দেখে বিরোধী নেতাদেরও বুঝতে হবে, আপাতত মোদী-বিরোধী বোঝাপড়াই হল ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের ‘পাসওয়ার্ড’। প্রয়োজন নেই এখনই একটা জাতীয় ফ্রন্ট গঠন করার। দরকার নেই নতুন কোনও কমিটি। যে দল যে রাজ্যে শক্তিশালী, সে দল সেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হোক, ভোটের পর তখন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই জোট গঠিত হবে। এখানে আমি স্বীকার করব, বেশ কয়েক মাস আগে রাহুল গাঁধীর সঙ্গে চা-চক্রে এই প্রস্তাব মমতাই দিয়েছিলেন রাহুলকে। রাহুল সে কথা সে দিনই মেনে নেন।

মোদী-বিরোধিতায় আঞ্চলিক দলগুলির একজোট হওয়ার মধ্যে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রশ্নটিও নিহিত। মোদী সিংহাসনে বসে ‘সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার’ কথা বলেছিলেন, কিন্তু দেখা গেল, এ এক প্রবল কেন্দ্রীভূত শক্তির সরকার। মোদী নামক ব্যক্তিনির্ভর কর্তৃত্ব রাজ্যের রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও পরিসরকে বিধ্বস্ত করেছে। তাই আজ এই মোদী-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলি একত্রিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতেরও এক নতুন কালিক অধ্যায় সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়েছে।

অনেকে অবশ্য জোট সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভারতে মোরারজি-চরণ সিংহ, বিশ্বনাথপ্রতাপ-চন্দ্রশেখর-দেবগৌড়া-গুজরাল, সব জোট সরকারই অস্থায়ী হয়েছে।

পাঁচ বছর মেয়াদে এই প্রধানমন্ত্রীরা কেউই দেশ শাসনের সুযোগ পাননি। এই সরকারগুলির বেশির ভাগেরই একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। সেটা হল, কংগ্রেস বা বিজেপির মতো বৃহৎ জাতীয় দল সরকারের ভিতরে থাকেনি, বাইরে থাকে সমর্থন জানিয়েছে। জাতীয় দল এবং আঞ্চলিক দল এক সঙ্গে মন্ত্রিসভায় থেকে যখন জোট করেছে, তা সে বাজপেয়ীরই হোক আর মনমোহনের, সে সরকার কিন্তু স্থায়ী হয়েছে।

২০১৯ সালের আসন্ন লোকসভা ভোটকে মোদী বনাম বিরোধী, এ ভাবে না দেখে বিজেপি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের স্টাইলে ‘মোদী বনাম রাহুল’ দ্বৈরথে পরিণত করতে চায়, যাতে জাতীয় নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলির জোট বিভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এ দেশের ভোট মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কায়দায় নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রের নির্বাচনের মডেলেই হওয়া উচিত।

আর, আপাতত, জোটে মাখন নেতা না পাউরুটি এই কূটতর্কের ধূম্রজাল থেকে দূরে থাকতে হবে বিরোধীদের।

আরও পড়ুন

Advertisement