সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

শকট সমস্যা

OSlo

নরওয়ের অসলো শহরে যাহাতে যথাসম্ভব কম মোটর গাড়ি চলে, সেই চেষ্টা হইতেছে। গাড়ি দূষণ বৃদ্ধি করে, তদুপরি গাড়ির দৌরাত্ম্যে পথচারীরা শান্তিতে হাঁটিতে পারেন না, বৃদ্ধবৃদ্ধাদের বসিবার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক বেঞ্চি স্থাপন করা যায় না, শিশুরা নিরুদ্বেগে খেলিতে পারে না। তাই গাড়ি কমানো হইবে। সেই উদ্দেশ্যে ৭০০ পার্কিং-স্থান বাতিল করা হইয়াছে, কিছু পথকে কেবলমাত্র হাঁটিবার পথ হিসাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে, গাড়ি চড়িলে যে বিশেষ মাসুল দিতে হয় তাহা বৃদ্ধি করা হইয়াছে। ১.৯ বর্গকিলোমিটার বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় অঞ্চলে, যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ থাকেন ও এক লক্ষ কুড়ি হাজার মানুষ কাজ করিতে আসেন, এখন ট্যাক্সি ব্যতীত খুবই সামান্য সংখ্যক গা়িড় দেখিতে পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ বলিতেছেন, ২০২০ সালের মধ্যে এই শহরে অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িই লুপ্ত হইবে। কিছু মানুষ যৎপরোনাস্তি খুশি: ইহার ফলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়িবে, শহরের চরিত্র বহুবর্ণ হইয়া উঠিবে। আবার কোনও কোনও ব্যবসায়ী বিষণ্ণ হইয়া নালিশ করিতেছেন, ‘গাড়ি নিষেধ’ অঞ্চলে দোকান হওয়ায়, তাঁহাদের ক্রেতার সংখ্যা হ্রাস পাইয়াছে। কেহ বলিতেছেন, গাড়ি যদি কমাইতেই হয়, তবে সরকারি যানবাহনের মান উন্নীত করিতে হইবে, তাহার ভাড়াও কমাইতে হইবে, নহিলে সাধারণ মানুষ চলিবেন কী রূপে? সেই সমস্যাগুলির প্রতি নিশ্চয়ই নজর দেওয়া হইবে, কিন্তু মূল কথা হইল, পরিচ্ছন্ন বায়ুসম্পন্ন ও হাত-পা ছড়াইয়া নিশ্চিন্তে হাঁটিয়া শহর দেখিবার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়িয়া তোলা হইতেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলি এমনিতেই প্রগতিশীল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাকি পৃথিবীর তুলনায় কিঞ্চিৎ অগ্রসর, পরিবেশ শোধনের নিমিত্ত অতি কঠোর নীতি প্রণয়নও তাহাদেরই মানায়। 

কিন্তু আরও একটি প্রশ্ন এই প্রসঙ্গে উঠিয়া আসে। বৃহত্তর লাভের জন্য এতগুলি মানুষের গাড়ি চড়িবার অধিকার হরণ করা কি নৈতিক কাজ? পাশ্চাত্যে গাড়ি প্রায় জন্মগত কবচকুণ্ডলের ন্যায় মনুষ্যের অচ্ছেদ্য অঙ্গ বলিয়া বিবেচিত হয়। সেই গাড়ি কা়ড়িয়া লওয়া হইলে তাহা বিবাহের অধিকার কাড়িয়া লইবার শামিল! পৃথিবীর ভাল করিবার নিমিত্ত জোর করিয়া ব্যক্তির অধিকার হরণকে যদি এক বার প্রশস্তি করা শুরু হয়, তাহা হইলে সহসা চমকিয়া আবিষ্কার করিতে হইবে, রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতম পীড়নকেও একটি স্তরের পর আর আপত্তিকর বলা যাইতেছে না। ভূমার উন্নতির কথা বলিয়াই কেহ ইহুদি-নিধন শুরু করিয়াছিলেন, কেহ পারমাণবিক বোমা ফেলিয়াছিলেন। তাই ভাবিয়া দেখিতে হইবে, একটি সমাজে অধিকাংশ মানুষ যে বস্তুটিকে আবশ্যিক ভাবিয়া জীবন যাপন করেন, সহসা কল্যাণকামনায় তাঁহাদের নিকট হইতে আইনবলে সেইটি কাড়িয়া লইলে তাহা গণতন্ত্রের পরিপন্থী কি না, মানবিকতাও টোল খাইতেছে কি না। প্রশ্ন করা যাইতে পারে, এই বিষয় লইয়া পূর্বে অসলোর জনগণকে অধিক মাত্রায় সচেতন করিবার প্রয়াস লওয়া হইয়াছিল কি? গাড়ি বাতিল না করিয়া, জ্বালানি বাতিল করিয়া, সৌরশক্তি-চালিত গাড়ি প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত গবেষণা চালাইলে, তাহা অধিক কার্যকর হইত কি? পথচারীর অপেক্ষা একটি নগরে গাড়িবাহিত মানুষের অধিকার ন্যূন, ইহাই বা কে স্থির করিয়া দিল? যে গাড়ি চড়ে, সে একটি যন্ত্রের সাহায্যে ত্বরায় গমন করিতেছে বলিয়া, মনে হয় সে হণ্টনরত বা দণ্ডায়মান বা মোহিত ও অবলোকনরত মানুষের তুলনায় কম সরল ও নিরীহ। কিন্তু গতিবেগ তো অপরাধ নহে। সে তো বলিতে পারে, একটি শহরের বৃহৎ অঞ্চলে রকমারি গানবাজনা ও জাদুপ্রদর্শনী হইবার তুলনায়, প্রচুর গাড়ি করিয়া দ্রুত অফিস যাইয়া কাজ শুরু করা অধিক জরুরি। বলিতে পারে, দূষণ রোধ অবশ্যই করিতে হইবে, কিন্তু তাহা নাগরিকের জীবন বিপর্যস্ত করিয়া নহে, তাহাকে সঙ্গে লইয়া, তাহার সানন্দ সম্মতি সঙ্গে লইয়া, তাহার সহায়তা সঙ্গে লইয়া। ঠিকই, দূষণ চক্ষে তেমন দেখা যায় না। তাহার কুফল সেই মুহূর্তে বুঝা কঠিন। ‘আমি গাড়ি চড়িলে আমার সন্ততি হাঁপানিতে আক্রান্ত হইতে পারে’ এই তত্ত্ব গড় মানুষের মানসিকতায় কিছু কষ্টকল্পিত মনে হইবার সম্ভাবনা। কিন্তু সেই কথাগুলি মাথায় রাখিয়াই কর্তৃপক্ষকে প্রচারে নামিতে হইবে। তাহা না হইলে, বলপ্রয়োগ দেখিয়া ও বঞ্চনা বুঝিয়া, স্বাধীন উদার নগরের সদস্যদের যে মানসিক দূষণ হইবে, যে ক্রোধ ক্ষোভ হতাশা বিরাগ সমাজে পুঞ্জীভূত হইবে, তাহার ফলে অসলোর হৃদয়বাতাস বিষাইয়া যাইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন