E-Paper

নতুন দিগন্ত

আর্টেমিস-২ কোনও বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এবং পরবর্তী কালে মঙ্গল গ্রহে অভিযানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সোপান।

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০৬

সাম্প্রতিক উত্তাল ভূ-রাজনীতির মাঝে খানিক তাজা বাতাসের ঝলক, একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাকাশ অভিযানকে ঘিরে, যা এই বিভক্ত বিশ্বে মানুষের বিজ্ঞানের কৌতূহলকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। এপ্রিল গোড়ায় উৎক্ষেপিত আর্টেমিস-২ অভিযানটি চার জন নভশ্চরকে চাঁদের চার পাশে ১০ দিনের এক যাত্রায় পাঠাল, যা ১৯৭২ সালের পর প্রথম মানববাহী চন্দ্রাভিযান। অভিযানটি ভারত-সহ ৫০টিরও বেশি দেশের স্বাক্ষরিত একই নামের চুক্তি (আর্টেমিস অ্যাকর্ডস) মেনে পরিচালিত হল, যা নিরাপদ মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য অভিন্ন নীতি, নির্দেশিকা এবং সর্বোত্তম কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। নাসা-র আগামী লক্ষ্য— ২০২৮-এর মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো এবং ২০৩০-এর মধ্যে সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করা।

তবে, আর্টেমিস-২ কোনও বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এবং পরবর্তী কালে মঙ্গল গ্রহে অভিযানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সোপান। এই অভিযানে দূরবর্তী মহাকাশ ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হয়— যে প্রযুক্তিগুলি পরবর্তী কালে মঙ্গল গ্রহে যাত্রার জন্য অপরিহার্য। পৃথিবী থেকে ২,৫০,০০০ মাইলেরও বেশি দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে— যা কোনও মানুষ এর আগে ভ্রমণ করেনি— আর্টেমিস-২ মানবজাতির পরিধিকে আরও প্রসারিত করল। তা ছাড়া, এর মাধ্যমে চন্দ্রপৃষ্ঠে, বিশেষত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে, নিশ্চিত হতে পারে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই অঞ্চলে জলীয় বরফ পাওয়া সম্ভব, যা থেকে পানীয় জল, অক্সিজেন এমনকি রকেট-জ্বালানিও তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চাঁদে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা যাবে এবং মহাকাশে আরও দূরবর্তী অভিযানের খরচও হ্রাস পাবে। তবে, আর্টেমিস-২’এর প্রতীকী তাৎপর্যটি গুরুতর। এই দলে রয়েছেন প্রথম মহিলা (ক্রিস্টিনা কচ), প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি (ভিক্টর গ্লোভার) এবং প্রথম অ-আমেরিকান নভশ্চর (কানাডা-র জেরেমি হ্যানসেন), যাঁরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ অতিক্রম করেছেন। পূর্বতন অ্যাপোলো অভিযানগুলির তুলনায় এটি একটি বড় পরিবর্তন। আর্টেমিস-২ বুঝিয়ে দিল যে মহাকাশের ভবিষ্যৎ হবে সহযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক।

তবে এ-হেন সহযোগিতার মাঝে এই অভিযান উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন বিশ্ব-প্রতিযোগিতার আবহে। প্রাথমিক চন্দ্রাভিযানগুলি আমেরিকা ও সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার জমানায় সংঘটিত হলেও বর্তমানে চাঁদ চিন-আমেরিকার মহাকাশ প্রতিযোগিতার একটি নতুন দিগন্ত। চিনও তাদের চন্দ্রাভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তারাও চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তা ছাড়া, এখনও আর্টেমিস চুক্তিতে তারা স্বাক্ষর করেনি। ফলে, মহাকাশে মানবজাতির ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার দ্বৈত অভিমুখ দ্বারা নির্ধারিত হতে চলেছে, যেখানে দ্রুত উদ্ভাবন ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশে সামরিকীকরণ, অস্থিতিশীল সম্পদ আহরণ এবং অপর্যাপ্ত আইনি কাঠামোর মতো ঝুঁকিও বৃদ্ধি করতে পারে। ভবিষ্যতের মহাকাশ একটি ‘সাধারণ সম্পদ’ হবে, না কি ‘বিবাদপূর্ণ স্থান’— মানবজাতিকে সম্ভবত সেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল আর্টেমিস-২।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

NASA Astronomy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy