E-Paper

জলের মতো কঠিন

অনাবৃষ্টি বা খরা যেমন জলসঙ্কটের একটি রূপ, স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং বন্যাও তার আর একটি রূপ। এবং, খরা ও বন্যা দুই-ই এক অভিন্ন সমস্যার দুই ধরনের বহিঃপ্রকাশ।

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৬

কয়েক দশক আগেও যাকে মনে হত অফুরান, সেই জলের ভান্ডারেও কি দুনিয়া দেউলিয়া হতে বসেছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টটির নামই গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাঙ্করাপ্সি— জল দেউলিয়া বিশ্ব। সমস্যাটির খণ্ডচিত্র সবার দেখা, সবার জানা। বিশ্বের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে এক-এক সময় তৈরি হয় তীব্র জলসঙ্কট, এক বালতি জলের জন্য হন্যে হতে হয় শহরবাসীকে। আবার, অনাবৃষ্টি বা খরার কারণে কৃষির বিপন্নতার কথাও একই রকম জানা। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের সব প্রান্তে এই সমস্যা সমান তীব্র নয়। কোথাও জলের অভাব এখনই প্রকট, আবার কোথাও সে বিপদ লুকিয়ে আছে সুদূর বা অদূর ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু, কোনও এক অঞ্চল জলের অভাবে বিপন্ন হওয়া যে আসলে এখনই বিপন্ন না-হওয়া অঞ্চলগুলির জন্যও সমান সমস্যার, সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছে রিপোর্টটি। কারণ, গোটা দুনিয়া এখন জোড়া রয়েছে হরেক সূত্রে— কোথাও সে সুতোর নাম বাণিজ্য, আবার কোথাও অভিবাসন। বিশ্বের এক প্রান্ত কৃষি অনাবৃষ্টি বা বন্যার কারণে বিপন্ন হলে যেমন সুদূরে তার প্রভাব পৌঁছে যায় খাদ্যের জোগানশৃঙ্খল বেয়ে, তেমনই ধারাবাহিক অনাবৃষ্টি বা বন্যায় বিপর্যস্ত অঞ্চলের মানুষের বাধ্যতামূলক অভিবাসন চাপ বাড়ায় অন্য প্রান্তে। রিপোর্টটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অনাবৃষ্টি বা খরা যেমন জলসঙ্কটের একটি রূপ, স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং বন্যাও তার আর একটি রূপ। এবং, খরা ও বন্যা দুই-ই এক অভিন্ন সমস্যার দুই ধরনের বহিঃপ্রকাশ।

সে সমস্যা হল পাল্টে যাওয়া বৃষ্টির ধরন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়েছে। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর অল্প কয়েক দিনের মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যা হচ্ছে, কিন্তু সে জল মাটির গভীরে প্রবেশ করার অবকাশ পাচ্ছে না। ফলে, মাটির নীচে জলের স্তর পূরণ হওয়ারও সুযোগ ঘটছে না। অন্য দিকে, হিমবাহের গলনের চরিত্রও পাল্টেছে, ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর জলপ্রবাহও অনিয়মিত হয়েছে। সমস্যা শুধু বৃষ্টিরই নয়, তুষারপাতেরও। এই মুহূর্তে ভারতের হিমালয় সংলগ্ন রাজ্যগুলিতে তুষারপাতের খরা চলছে। তার অর্থ এই নয় যে, শীতের শেষ পর্বেও সেখানে তুষারপাত হবে না। হয়তো হবে, হয়তো স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বেশি হবে। কিন্তু শেষ-শীতের সেই তুষার চরিত্রে আলাদা— তা দ্রুত গলবে, ফলে মাটির পক্ষে তার আর্দ্রতা টেনে নেওয়ার যথেষ্ট সময় মিলবে না। এই ঘটনাগুলির সম্মিলিত ফল হল, জলের প্রয়োজনের সঙ্গে জোগানের সাযুজ্য নষ্ট হবে। এই অবস্থায় জল-নীতিকে নতুন করে ভাবতে হবে। জলের অভাব মানে যে শুধু বসতি এলাকায় বাড়তি জলের জোগানের ব্যবস্থা করা বা কৃষিতে সেচের পরিধি বিস্তার নয়, তার চেয়ে ঢের বেশি কিছু, সে কথা বুঝতে হবে। প্রথম প্রয়োজন বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি তৎপর ও কুশলী নীতি গ্রহণ। মাটির জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির পন্থা উদ্ভাবনের জন্য আরও অনেক গবেষণা চাই। এবং, বৃহত্তর ভাবে, বৃষ্টিপাত ও জলের সঙ্কটের প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ করে তুলতে হবে। মানবোন্নয়নের ক্ষেত্রে তার নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলে যেতে হবে বারংবার। জলের অপর নাম যে জীবন, শিশুপাঠ্য এই উপদেশটি কোনও মতেই বিস্মৃত হওয়া চলবে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

UN Climate

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy