E-Paper

নিয়োগ-চিত্র

সরকারি সংস্থা অথবা বাণিজ্যিক সংস্থা, যে কোনও ক্ষেত্রেই নিয়োগে নমনীয়তা অবশ্যই প্রয়োজন।

শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১২
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

নির্বাচন এসে সরকারি চাকরির ফুটোফাটা দশাটি সকলের সম্মুখে উন্মুক্ত করেছে— ভোটের কাজের জন্য যথেষ্ট স্থায়ী কর্মীর জোগান দিতে পারছে না রাজ্য সরকার। রাজ্যে প্রায় ৮১ হাজার বুথে প্রয়োজন সাড়ে তিন লক্ষ কর্মী। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ, চুক্তি-কর্মী বা অস্থায়ী কর্মী দিয়ে নির্বাচনের কাজ করানো যাবে না। এই সিদ্ধান্তের পিছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। চুক্তি-কর্মীরা নির্দিষ্ট কোনও কাজের জন্যই নিযুক্ত হন। বাড়তি কোনও কাজ, বিশেষত নির্বাচনের মতো গুরুদায়িত্বের কাজে তাঁদের নিয়োগ করা চলে না। ফলে রাজ্য উভয়সঙ্কটে। এ দিকে চুক্তি-কর্মীদের কাজে না নেওয়ার নিয়ম অমান্য করায় এক জেলাশাসককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। ও দিকে গ্রুপ-ডি পদে দীর্ঘ দিন স্থায়ী কর্মী নিয়োগ না হওয়ায় তৃতীয় পোলিং অফিসারের সংখ্যায় ৩০-৩৫ শতাংশ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কী করে মেটাবে রাজ্য, তা অবশ্যই একটা বড় সমস্যা। কিন্তু ভোট মিটে গেলেও মূল সমস্যাটি মিটবে না। তা হল, চুক্তি-কর্মী, অস্থায়ী কর্মীর দ্বারা স্থায়ী পদের পূরণ। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, জেলাশাসকের দফতর থেকে আদালত, সর্বত্র আজ তা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে।

সরকারি সংস্থা অথবা বাণিজ্যিক সংস্থা, যে কোনও ক্ষেত্রেই নিয়োগে নমনীয়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কেবল আইনের কাঠিন্যের জন্য, অথবা শ্রমিক সংগঠনের চাপের জন্য যদি অপ্রয়োজনীয় কর্মীর বোঝা বইতে হয় নিয়োগকারীকে, তা হলে দীর্ঘমেয়াদে তা কোনও পক্ষের জন্যই লাভজনক হয় না, দেশের স্বার্থও ব্যাহত হয়। কিন্তু নিয়োগে নমনীয়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন স্বচ্ছ, ন্যায্য নিয়োগ প্রক্রিয়া। কেবল নির্দিষ্ট কাঠামোয় বেতন, পেনশন প্রভৃতি দেওয়ার দায় অস্বীকার করার তাগিদে চুক্তি-কর্মী বহাল করা অন্যায়। অভিযোগ উঠেছে, সেই জন্যই স্থায়ী পদগুলি শূন্য হলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ এড়িয়ে যাচ্ছে রাজ্য সরকার। উপদেষ্টা, প্রযুক্তিবিদ, করণিক থেকে সাফাইকর্মী, সর্বস্তরে নিয়োগ হচ্ছে চুক্তিতে। এতে একাধিক পক্ষের প্রতি অন্যায় হয়। প্রথমটি অবশ্যই কর্মীর সঙ্গে, কারণ স্থায়ী কর্মীদের সমান দক্ষতা, পরিশ্রম এবং দায়িত্বের কাজ করেও অস্থায়ী কর্মীরা বেতন পান অনেক কম। পদোন্নতির আশা করতে পারেন না, পেনশন প্রভৃতির সুবিধাও পান না। দ্বিতীয় অন্যায়ের মোকাবিলা করতে হয় সরকারি দফতরগুলিকে। স্থায়ী কর্মীর অভাবে নিয়মিত কাজ খুঁড়িয়ে চলে, কয়েকজন পদাধিকারীকে অনেকগুলি বিভাগের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। তৃতীয় সঙ্কট রাজ্যবাসীর। একটি সরকারি চাকরির জন্য অজস্র উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর হা-পিত্যেশ সেই সঙ্কটের একটি মাত্রা। কল্যাণকামী রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য যে বিপুল, বিচিত্র পরিষেবার দায়িত্ব স্বীকার করেছে, তা বহন করার পরিকাঠামো ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। চুক্তি-কর্মীরা নির্দিষ্ট কয়েকটি কর্তব্যই করেন, সামগ্রিক ভাবে পরিষেবার দায় গ্রহণের উপায় বা ক্ষমতা তাঁদের নেই। স্থায়ী কর্মী-আধিকারিকদের পদ শূন্য থাকলে সরকারি পরিষেবা শিথিল হতে বাধ্য।

সুপ্রিম কোর্ট নানা মামলায় একাধিক রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে স্থায়ী কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট পদগুলিতে চুক্তি-কর্মীদের দিয়ে কাজ করানো যাবে না। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৪ সালে নিম্ন আদালতগুলির ৫০০টি পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল রাজ্য সরকার। সেই বিজ্ঞপ্তি খারিজ করে কলকাতা হাই কোর্টের দুই বিচারপতির একটি বেঞ্চ বলেছিল, সরকারি দফতর এবং বিচার বিভাগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে একটা সীমা থাকা দরকার। চুক্তিতে নিয়োগের পদ্ধতি স্বচ্ছ না-ও হতে পারে। চুক্তি-কর্মীরা পদোন্নতির সুযোগ হারান। অতএব আদালত রাজ্যকে আরও বেশি বেশি চুক্তি-কর্মী নিয়োগের অনুমতি দিতে পারে না। এমন নানা নির্দেশ-পরামর্শ উপেক্ষার ফলে আজ নির্বাচনের মতো গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য কর্মী জোগান দিতে পারছে না রাজ্য।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

State Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy