E-Paper

নতুন করে শুরু

আশা তো সবচেয়ে বেশি থাকে স্বদেশ ঘিরেই। নতুন বছরে ভারতে কেমন হবে সংসদীয় গণতন্ত্রের রূপটি, ভারতবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ও প্রত্যাশাও তা নিয়ে।

শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৭

রাতারাতি কিছুই পাল্টায় না। একটি বছর ক্যালেন্ডারের পাতায় ফুরিয়ে গেল, শুরু হল নতুন বছর, ২০২৬— তার মানেই কি গত বছরের সব সমস্যা ও সঙ্কটও অতীত হয়ে গেল? অতি রোম্যান্টিক বা চরম আশাবাদীও জানেন, উত্তরটি: না। কিন্তু প্রতি রাতেই এক জন সাধারণতম মানুষও যেমন এই ভেবে ঘুমোতে যান যে আগামী কাল এই এই কাজ করতে হবে, বিশ্বাসও করেন যে তা ভাল ভাবে করা যাবে, নতুন বছরের প্রথম সকালে পৃথিবীও সেটুকুই করতে পারে— আশা। ফেলে-আসা বছরটিতে বিশ্ব যে রাজনৈতিক সামাজিক ও মানবিক বিশৃঙ্খলার সাক্ষী থেকেছে, যুদ্ধ গৃহযুদ্ধ ও সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়েছে, অর্থনীতির পরিসরে মূল্যস্ফীতি, শুল্ক ও বাণিজ্য-উত্তেজনার উথালপাথাল সামলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, সেই সার্বিক দুর্দশা ও অসহায়তার ছবিটি এ বার পাল্টাক, চাইবেন সকলেই।

ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণের, অর্থাৎ উপায়ের পথে বিশ্বশক্তিগুলি কতটা এগোবে, নতুন বছরে তা-ই দেখার। ভূরাজনীতির স্বার্থ সম্ভবত এ বছরেও বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতির নির্ণায়ক হবে। রাজনৈতিক হিংসার জেরে সাম্প্রতিক অতীতে ভূমিচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিও, সেই করুণ বাস্তবতায় কি কোনও পরিবর্তন আনবে নতুন বছর? আমেরিকায় ও ইউরোপের নানা দেশে দক্ষিণপন্থা বা অতিরক্ষণশীলতার হাওয়ায় জাতীয়তাবাদ যে চেহারা নিয়েছে, তার জেরে মানবতাবাদী বহুত্ব আরও মুছতে চলেছে কি না— সেই সংশয় অমূলক নয়। তদুপরি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে দুর্যোগে জীবনের বিপর্যয়, যা দেশের সীমানা মানে না, শাসকের নীতি বা নীতিহীনতার অপেক্ষা রাখে না। এই বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সরিয়ে রেখে দেশগুলি কি এ বছর কোনও সাহমত্যে পৌঁছবে? নতুন বছরে ফুটবল বিশ্বকাপ হবে এমন তিন দেশ মিলিয়ে, যাদের পারস্পরিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝামেলা সম্প্রতি চরমে উঠেছিল। তর্কের খাতিরেও যদি একে সম্প্রীতি, সহযোগিতা, বৃহত্তর লক্ষ্যপূরণের পথে এক পদক্ষেপ বলে ধরি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এ-হেন নজির দেখতে চাওয়া কি খুব উচ্চাশা হবে? প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এআই-এর পরিকাঠামো নির্মাণ ও প্রসারে অবিশ্বাস্য অর্থ বিনিয়োগ করছে, শেয়ার বাজারে এআই-স্টক ঘিরে বিপুল চাহিদা ও উত্তেজনা— পুরো বিষয়টিই এতই নতুন যে আর্থিক ভাবে তা সুদূরপ্রসারী ফল দেবে কি না, নতুন বছরে চোখ থাকবে সে-দিকেও।

আশা তো সবচেয়ে বেশি থাকে স্বদেশ ঘিরেই। নতুন বছরে ভারতে কেমন হবে সংসদীয় গণতন্ত্রের রূপটি, ভারতবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ও প্রত্যাশাও তা নিয়ে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, বিশেষত অ-বিজেপি রাজ্যগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের সমীকরণ কোনও নতুন বাঁক নেবে কি না, বিশেষ করে এ বছর পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও কেরলের মতো রাজনৈতিক বিরোধী রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আবহে— সারা দেশ সে-দিকে তাকিয়ে থাকবে। এই প্রসঙ্গেই বলতে হয় গোড়ার কথাটি: নতুন বছরই হোক কিংবা বছর বছর, যে কথা বর্তমান ভারত শাসকদের মনে করিয়ে দেওয়া প্রচারমাধ্যমের এক প্রকার কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে: দেশের সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মর্যাদা যেন রক্ষিত হয়; ভাষা ধর্ম খাবার পোশাক বা নাগরিকত্ব নিয়ে রাষ্ট্রীয় উৎপীড়ন যেন দেশের মানুষকে অপমানিত, সন্ত্রস্ত না করে। গত বছর জুড়ে যে ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, ভাষিক মেরুকরণ প্রতি পদে ভারতের সংবিধান ও নাগরিকদের অসম্মানিত করেছে, নতুন বছরের প্রথম সকালে তা থেকে পরিত্রাণের প্রার্থনা খুব বেশি চাওয়া কি? রাতারাতি, বা গোটা একটি বছরেও তা হয়তো হওয়ার নয়— জানা। কিন্তু জনগণমন এক হয়ে আশা করতে দোষ কী, অথবা আর এক ধাপ এগিয়ে— একটু চেষ্টা করতে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

hope New Year 2026 Trade Deal Economy Share Market AI Democracy Harmony

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy