E-Paper

হিতে বিপরীত

সমাজমাধ্যম অ্যালগরিদম-এর সহায়তায় মানসিক টান উৎপন্ন করে ও অবিরাম নোটিফিকেশনের চক্রে ডিজিটাল আসক্তি তৈরি করে মনকে মোহজালের খাঁচায় বন্দি করে, যা অপরিপক্ব মন ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বিরাট অন্তরায়।

শেষ আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬ ০৭:২২

সমাজমাধ্যমের কুপ্রভাব থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কী ভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, আবার ডিজিটাল যুগের সুযোগ-সুবিধাও বজায় রাখা যায়— জটিল প্রশ্ন ঘুরছে বিশ্ব জুড়ে। অস্ট্রেলিয়া ষোলো বছরের নীচে সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, ফ্রান্স অভিভাবকের সম্মতি বাধ্যতামূলক করার আইন আনছে। বহু দেশই বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধের পথে এগোচ্ছে এবং ভারতেও তার রেশ পড়ছে। কর্নাটক ঘোষণা করেছে, ষোলো বছরের নীচে শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে; অন্ধ্রপ্রদেশও তেরোর নীচে সমাজমাধ্যমে প্রবেশ রদ করার পথে। এই উদ্যোগগুলির মূলে যে উদ্বেগ তা অমূলক নয়। মোবাইলের নেশা এখন জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত। চোখ, মস্তিষ্ক-সহ শারীরিক নানা ক্ষতি ও জড়তা, স্মৃতি ও একাগ্রতার বিপর্যয় তো রয়েইছে, সঙ্গে রয়েছে ডিজিটাল হেনস্থা-প্রতারণার মতো সমস্যা, বিপজ্জনক বিষয়বস্তুর সঙ্গে অবাধ পরিচয়ের নানা সুযোগ। কোমল, অপরিণত মনে যার প্রভাব মারাত্মক। কিন্তু, শুধুমাত্র প্রবেশদুয়ারটি শিশুদের সামনে জবরদস্তি বন্ধ করে রাখলে কি সমস্যার সমাধান মিলবে? এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও কিন্তু অত্যন্ত কঠিন।

সমাজমাধ্যম অ্যালগরিদম-এর সহায়তায় মানসিক টান উৎপন্ন করে ও অবিরাম নোটিফিকেশনের চক্রে ডিজিটাল আসক্তি তৈরি করে মনকে মোহজালের খাঁচায় বন্দি করে, যা অপরিপক্ব মন ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বিরাট অন্তরায়। চটকদার শরীর ও জীবনযাপনের ছবি ও উদাহরণ দেখিয়ে স্বাভাবিক চেহারা ও জীবন সম্পর্কে হীনম্মন্যতা গড়ে তোলে, বুলিং-দৈত্য ডিজিটাল পথে স্কুলের চৌহদ্দিতে থেকে বেরিয়ে এসে প্রতি পলে অনুসরণ শুরু করে। বার বার অভিযোগ উঠেছে, অনলাইন পৃথিবী শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনিদ্রা, হতাশা, অবসাদ বাড়াচ্ছে, নিজের ক্ষতি করার চিন্তা উস্কে দিচ্ছে। এই প্রভাবকে অস্বীকার করা বাস্তববিমুখতা, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবটিও একই রকম বাস্তববোধবিরহিত। ডিজিটাল প্রবেশের বয়সসীমা নিয়েই তো নানা রাজ্যের নানা মত। যন্ত্র, প্ল্যাটফর্ম ও রাজ্য নির্বিশেষে বয়সসীমা কার্যকর করার উপায় নিয়েও কোনও স্পষ্ট ভাবনার লক্ষণ নেই। বয়সসীমা নির্ধারক প্রযুক্ত হলে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হওয়ার ও ডিজিটাল মাধ্যমে রাষ্ট্রের নজরদারির প্রবণতা সক্রিয়তর হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

অতএব, রাষ্ট্র বা আইনের মুখাপেক্ষী না থেকে পারিবারিক স্তর থেকেই বিপদটির প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। অতিশৈশবেই বাচ্চাকে সহজে ভুলিয়ে রাখতে ফোন দেওয়ার সুবিধাবাদী অভ্যাসটিরই মূল্য চোকাতে হচ্ছে এখন। শুধুই পড়াশোনা-সংক্রান্ত কাজ করা যাবে এমন যন্ত্র একটি বিকল্প হতে পারে। বয়সসীমা বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, ডিজিটাল সুরক্ষা ও সচেতনতা নিয়ে লাগাতার প্রচার-অভিযান জরুরি, যাতে ছোটরাই বিপদগুলিকে ও তাদের নিয়ত পরিবর্তনশীল স্বভাবকে চিনে সতর্কতার প্রযুক্তিগত উপায় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। সমাজমাধ্যমের কান্ডারিরা যাতে কোনও ভাবে দায় না এড়াতে পারে, সেই দায়িত্বটি রাষ্ট্রের। কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বয়সভিত্তিক ফিল্টার প্রয়োগ এবং দ্রুত বিপজ্জনক বিষয়গুলির উপর সতর্কবার্তার ভারী পর্দা আবরণে তাদের বাধ্য করতে পারে একমাত্র প্রশাসনই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Social Media Digital Technology Mobile Addiction

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy