E-Paper

দুর্লক্ষণ

দুর্গা অঙ্গন প্রকল্পের বিরোধিতায় পূর্বতন বাম ফ্রন্ট সরকারের আবাসনমন্ত্রী গৌতম দেব মন্তব্য করেছেন যে, নিউ টাউনের পরিকল্পনায় প্রথম থেকেই আবাসন, স্কুলকলেজ, হাসপাতাল, শিল্পভবন ইত্যাদি তৈরির পরিকল্পনা ছিল, কোনও ধর্মকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ভাবনা ছিল না।

শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৬:৫১

গণতান্ত্রিক দেশে যে কোনও রাজনীতিরই ক্রমে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠার প্রবণতা থাকে। সঙ্কীর্ণতার রাজনীতিরও। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত দুর্গা অঙ্গন নিয়ে এখন রাজনীতির মঞ্চ যেমন সরগরম, তা দেখে আশঙ্কা হয় যে ঘুরপথে আবারও ধর্মবিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতিই জয়ী হতে চলেছে। নিউ টাউনের একটি বিরাট মাপের সরকারি জমিতে ব্যয়বহুল দুর্গা অঙ্গনের পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধী দল সিপিএম যে প্রশ্ন তুলেছে, তা নিতান্ত সঙ্গত। কেন সরকারি জমিতে, সরকারি অর্থে, সরকারি উদ্যোগে আদৌ কোনও ধর্মীয় প্রকল্প হবে— এ কাজ কি সংবিধানবিরোধী নয়? কেন নিউ টাউনের অতি মূল্যবান এবং প্রধান বা ‘প্রাইম’ জায়গা এই জন্য নির্বাচিত হবে? জনগণের অর্থে এমন প্রকল্প কি সমর্থনযোগ্য? দুর্গা অঙ্গন প্রকল্পের বিরোধিতায় পূর্বতন বাম ফ্রন্ট সরকারের আবাসনমন্ত্রী গৌতম দেব মন্তব্য করেছেন যে, নিউ টাউনের পরিকল্পনায় প্রথম থেকেই আবাসন, স্কুলকলেজ, হাসপাতাল, শিল্পভবন ইত্যাদি তৈরির পরিকল্পনা ছিল, কোনও ধর্মকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ভাবনা ছিল না। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, সময়ের সঙ্গে প্রাথমিক ভাবনার পরিমার্জন ও সংশোধন নিশ্চয়ই সম্ভব, কিন্তু তা হতে হবে সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমূলক। সরকারি পরিসরে ধর্মাঙ্গন প্রতিষ্ঠা— সে মন্দির মসজিদ গুরুদ্বার যা-ই হোক, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে পারে না। বিশেষত যে রাজ্য আর্থিক সঙ্কটে জেরবার, রীতিমতো বিপর্যস্ত, তার জন্য এই ভাবনার কোনও অগ্রাধিকার থাকতে পারে না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিশ্চয়ই ‘যুক্তি’ দেবেন, ইউনেস্কো যখন দুর্গোৎসবকে অন্যতম বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়ে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ শীর্ষক সম্মান প্রদান করেছে, তখন কলকাতায় এমন অঙ্গন তৈরি কেবল ধর্মস্থান প্রতিষ্ঠা হিসাবে দেখা উচিত নয়— এ হল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ। যুক্তিটি সারহীন নয়। এমন ভাবনা থেকেই দুর্গাপূজার বিসর্জনের সময়ে ‘কার্নিভাল’ প্রচলন হয়েছিল। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থাকছে। প্রথম থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসাবে কেন এই প্রকল্প জরুরি, তা না বলে দক্ষিণে দিঘার জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং উত্তরবঙ্গে শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দিরের প্রস্তাবের সঙ্গে একে মিলিয়ে দেওয়া হল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষ রাজনীতিক, তিনি কি জানতেন না এর কী অর্থ দাঁড়াতে পারে? বাঙালি সমাজে দুর্গোৎসবের মধ্যে কতখানি ধর্মীয় ভাবনা আর কতখানি সাংস্কৃতিক উৎসব, এ বিতর্ক অনেক দিন ধরে চলছে, আরও অনেক দিন চলুক। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ধর্মরাজনীতির আবহে এই ভাবে দুর্গা-পরিসরকে নিয়ে আসার অর্থ, এই বিতর্কে আগে থেকেই একটি দিককে জিতিয়ে রাখা। কোন দিককে, বলা বাহুল্য। সন্দেহ নেই, বিজেপি-আরএসএস’এর হিন্দুত্ব রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে, হিন্দু ভোটের দিকে তাকিয়েই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর এই সিদ্ধান্ত।

সমস্যাটি কত গভীর, মুর্শিদাবাদের নেতা হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণার সঙ্গে একই সময়ে দুর্গাঙ্গন প্রতিষ্ঠার বন্দোবস্ত তা স্পষ্ট করে। বাঙালি সংস্কৃতির অসীম দুর্ভাগ্য, এই রাজ্য আবারও বিজেপি-আরএসএস এবং কিছু মুসলমান গোষ্ঠীর প্রতিযোগিতামূলক ধর্ম-রাজনীতির মঞ্চ হয়ে উঠেছে— দেশভাগের আট দশক পরও। লক্ষণীয়, মন্দির, মসজিদ, অঙ্গন, ধর্মীয় রাজনীতির বিস্তর চাপ সত্ত্বেও কোনও দাবিই কিন্তু বাঙালি হিন্দু বা বাঙালি মুসলমান সমাজের ভিতর থেকে উঠে আসেনি। নেতানেত্রীরা স্বতঃপ্রণোদিত ভাবেই এ নিয়ে ব্যস্ত হয়েছেন, কেননা তাঁরা যে ভাবে ভোট-অঙ্কের হিসাব কষতে জানেন, তাতে এর গভীর ‘উপযোগিতা’। সেই অঙ্ক ভুল না ঠিক, তা অন্যত্র বিচার্য। কিন্তু ভোটের বাইরেও যে কিছু মৌলিক নীতি ও ন্যায়ের প্রশ্ন আছে, সংবিধানের দিগ্‌নির্দেশ আছে, আজকের পশ্চিমবঙ্গকে, এবং ভারতকে এই নেতানেত্রীরা তা ভুলিয়ে দিতে সক্ষম।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

TMC CPIM HIDCO New Town

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy