E-Paper

সশব্দ নিশ্চলতা

নিঃসন্দেহে ন্যায্য ও জরুরি দাবি। যানজটে আটকে থাকা মানে অমূল্য সময় ও কর্মঘণ্টার ক্ষতি, মানসিক ক্লান্তি, প্রাণশক্তি ও উৎপাদনশীলতার ক্ষয়। অপেক্ষমাণ গাড়িগুলি থেকে নির্গত দূষকমাত্রাও বেশি, ফলে বায়ুর গুণমানের অবনমন হয় এবং শ্বাসযন্ত্র ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯

ভারতের যানজট সমস্যা কিন্তু আর ব্যঙ্গ-কৌতুকের উপাদান রূপে তিক্ততা-সহযোগে মানিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতিতে নেই। গত বছরই ইন্দোর-দেওয়াস সড়কে ভয়ঙ্কর দীর্ঘ যানজটে তিনটি প্রাণ ঝরে গিয়েছে। পরোক্ষ শিকার অগণিত, যানজটের ফলে জরুরি কাজে বা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে সময় মতো পৌঁছতে না-পারা এবং তার ফলে অর্থ, জীবন-জীবিকা দিয়ে মাসুল দিতে হয়েছে যাঁদের। অতঃপর রাজ্যসভায় এ বিষয়ে উদ্বেগ দেখা গিয়েছে। জানানো হয়েছে, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুর মতো মহানগরে যানজটের কারণে প্রতি দিনের যাতায়াতে মানুষের বিপুল সময় নষ্ট হচ্ছে— কোথাও বছরে ১৫০ ঘণ্টারও বেশি, অর্থাৎ প্রায় সপ্তাহকাল নষ্ট শুধুমাত্র রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা বসে থেকে। কলকাতার অবস্থা তথৈবচ। দশ কিলোমিটার যেতে এখানে সময় লাগে গড়ে ৩৫ মিনিট, যা তিলোত্তমাকে বিশ্বের শ্লথ শহরতালিকায় ঠেলেছে। এই সশব্দ নিশ্চলতা সম্পর্কে সংসদের আলোচনা সমস্যাটিকে অবশেষে সঙ্কট রূপে স্বীকৃতি দেবে, আশা করা যায়। জাতীয় স্তরে সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি সমধানের দাবিও উঠেছে।

নিঃসন্দেহে ন্যায্য ও জরুরি দাবি। যানজটে আটকে থাকা মানে অমূল্য সময় ও কর্মঘণ্টার ক্ষতি, মানসিক ক্লান্তি, প্রাণশক্তি ও উৎপাদনশীলতার ক্ষয়। অপেক্ষমাণ গাড়িগুলি থেকে নির্গত দূষকমাত্রাও বেশি, ফলে বায়ুর গুণমানের অবনমন হয় এবং শ্বাসযন্ত্র ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। আটকে থাকে অর্থনীতিও। সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের চার বৃহত্তম মহানগর মিলে যানজটের কারণে প্রতি বছর গড়ে ১.৪৭ লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন। এই অচলাবস্থার কারণ বহুচর্চিত। গত দু’দশকে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন গাড়ির সংখ্যায় বিস্ফার দেখা দিয়েছে, সেই অনুপাতে রাস্তা ও পার্কিং ব্যবস্থার প্রসারণ হয়নি। শহরের এলাকার ৩০% যানচলাচলে ন্যস্ত হওয়াই আদর্শ, কিন্তু ক’টি মহানগর সেই লক্ষ্যে পৌঁছয়? কলকাতার রাস্তা তো আয়তনের মাত্র ৬%। ভারতের অধিকাংশ নগরীর বিস্তারই অপরিকল্পিত, আধুনিক জীবন ও যাতায়াতের উপযোগী নয়। তার জন্য উড়ালপুল বা রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্পও যে যথেষ্ট নয়— উদাহরণ খোদ রাজধানী দিল্লি।

ব্যক্তিগত গাড়ি কেনায়, ব্যবহারে কঠোরতা প্রয়োগ কখনওই উপায় নয় ও তা অনৈতিকও, বিশেষত যেখানে মানুষ বহু ক্ষেত্রেই নিজস্ব দুই বা চার চাকা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর মোদ্দা কারণ গণপরিবহণের অপ্রতুলতা ও বেনিয়ম। তাই প্রথম লক্ষ্য সে দিকেই হওয়া উচিত। পর্যাপ্ত বাস, তার আধুনিকীকরণ, নিয়মিত পরিষেবা এবং মেট্রো ও শহরতলির রেল ব্যবস্থার সঙ্গে তার নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় নিশ্চিত হলে গণপরিবহণের সুদিন ফিরবে। তিন চাকা ও দু’চাকার ছোট যানগুলির বাড়বৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণে রাখলে যানজট, বিশৃঙ্খলা কমবে। পাশাপাশি নগর পরিকল্পনায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। বহু দেশেই মহানগরে বহুমুখী অঞ্চলের ধারণা সুপ্রযুক্ত যেখানে শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র, বাসস্থান ও পরিষেবা কাছাকাছি রাখা হয় যা মানুষের পথশ্রম কমিয়ে উৎপাদনশীলতাকে বাড়ায়। ভারতের প্রেক্ষাপটেও এমন মিশ্র-ব্যবহার ভিত্তিক অঞ্চল, বৈজ্ঞানিক পার্কিং স্থান, পথচারীর পরিসর কোনও কল্পবাস্তব নয়, বরং অবিলম্বে এই পথে অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয়। নচেৎ, নগরগুলি তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যকেই হারিয়ে বসবে, অর্থাৎ, গতি। পরিণাম ভয়ঙ্কর।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Traffic Congestion traffic control

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy