E-Paper

উৎসবের বিষ

রাসায়নিক-সদৃশ নামধারী মাদকগুলি প্রথমে ব্যথা বা উদ্বেগনাশক, ঘুমের বড়ির ভেক ধরে বাজারে আসে, রাসায়নিক গঠনের অল্প পরিবর্তনেই ফরেনসিক পরীক্ষা ও আইনের জালকে ধুলো দেয়। গবেষণাগারে প্রস্তুতি সহজ ও বিপুল। পাচারের প্রকৃতিও ভিন্ন।

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৫:৪৫

বর্ষবরণের রাত যত এগিয়ে আসে, পুলিশের ব্যস্ততা বাড়ে, বাজির শব্দ ছাপিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের ঘণ্টিরও আওয়াজ মেলে, চিকিৎসালয়ের জরুরি বিভাগেও থাকে বিশেষ প্রস্তুতি। মত্ত চালক, জনতার ভিড় সামাল দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসন এখন এক প্রবল সঙ্কটের সম্মুখীন যা সমাজের বহু গভীরে প্রোথিত এবং কব্জা করেছে নতুন প্রজন্মের একাংশকে। পরিসংখ্যান এবং পুলিশি অনুসন্ধান সাক্ষী, দেশে মাদক-পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১২ জন মাদকাসক্তির কারণে প্রাণ হারান, অন্ধকারকে আরও বিপজ্জনক করছে ঘাতক ‘সিন্থেটিক’ মাদক, দেশে তার ব্যবহারের হার বেড়েছে ২০-৩০ শতাংশ, বড়দিন-বর্ষবরণের পার্টির আবহে নব্যপ্রজন্মে ‘ফ্যাশনেবল’ নেশার চাহিদায় অবস্থা সঙ্গিনতর। বিপণন কৌশল, সরবরাহ থেকে ব্যবহার— প্রযুক্তির সহায়তায় গোপনীয়তা, কপটতার সুবিধাই সিন্থেটিক মাদকের রমরমার কারণ।

এই গোপনীয়তাই প্রকৃতিজাত নেশাবস্তুর থেকে রসায়নাগারে প্রস্তুত সিন্থেটিক ড্রাগকে পৃথক করেছে। রাসায়নিক-সদৃশ নামধারী মাদকগুলি প্রথমে ব্যথা বা উদ্বেগনাশক, ঘুমের বড়ির ভেক ধরে বাজারে আসে, রাসায়নিক গঠনের অল্প পরিবর্তনেই ফরেনসিক পরীক্ষা ও আইনের জালকে ধুলো দেয়। গবেষণাগারে প্রস্তুতি সহজ ও বিপুল। পাচারের প্রকৃতিও ভিন্ন। গাঁজা-হেরোইন-চরস ইত্যাদি চেনা শত্রু। তার উৎস, ঠেক, পাচারের রাস্তা, মানবশরীরে প্রভাব ও মোকাবিলার পথটি অনেকটাই জানা। কিন্তু নতুন শত্রু সিন্থেটিক মাদক ডিজিটাল গোলকধাঁধার সুযোগ নিচ্ছে। ডার্ক ওয়েব-এ এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে লেনদেন, নগরজীবনে অপরিহার্য কুরিয়ার পরিষেবার আড়ালে সরাসরি ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেওয়া— অদৃশ্য শৃঙ্খলে ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় গোপনে থাকছে। লুকোনোর কৌশল বহুবিধ, গন্ধবিহীন, এবং ‘নিয়ন্ত্রিত মাত্রা’, ‘নিরাপদ’ ইত্যাদির ভিত্তিহীন দাবি রাখায় সিন্থেটিক মাদক ‘আধুনিক নেশা’ বা ‘অ্যাডভেঞ্চার’ রূপে ডিজিটাল নাগরিক তথা যুবসমাজে জনপ্রিয় হচ্ছে। রাসায়নিক গঠনে নিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়ায় এদের প্রভাবের সীমা অনির্দিষ্ট, অজানা। মানসিক স্থিতি ও অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা তীব্রতর, উৎসব-অছিলায় এক বার সেবনেই জীবনহানির প্রচণ্ড আশঙ্কা।

১৯৮৫ সালের মাদক বিরোধী আইনে প্রচলিত বা সিন্থেটিক— সব মাদকদ্রব্যই নিষিদ্ধ। প্রশাসন এ নিয়ে নজরদারি বাড়ালেও উৎসবের সময় কুরিয়ার পরিষেবার সঙ্গে বিশেষ সমন্বয় ও সংবেদনশীল এলাকায়, রাতঠেকগুলিতে সাদা পোশাকে আরও পুলিশ মোতায়েন প্রয়োজন। এই ধরনের অপরাধ দমনে প্রক্রিয়াগত নিশ্ছিদ্রতা না থাকলে তদন্ত দুর্বল হবে এবং কোনও বড় চক্রকে ধরার পরও সাফল্য অধরা হয়ে যেতে পারে। এই সঙ্কটে ঢিলেমি, অপেশাদারি চলবে না। ক্রমাগত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশকে সতর্কতা, ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে হবে, রাসায়নিক রূপ চিনতে ফরেনসিক বিভাগকে তৈরি থাকতে হবে, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়। ড্রাগের নেশা সামাজিক সঙ্কট। পরিবার, শিক্ষায়তন ও পাড়ায় বিষয়টিকে নৈতিক গণ্ডির জ্ঞানদানে সীমাবদ্ধ না-রেখে এর স্বাস্থ্যগত ভয়াবহতা নিয়ে প্রচার অত্যন্ত জরুরি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

festival police

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy