এই মুহূর্তে শহরের কোনও প্রান্তে এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স (একিউআই) কত, জানার জন্য কোনও পরিশ্রম করতে হয় না। হাতে ধরা স্মার্ট ফোনের পর্দায় কার্যত না-চাইতেই সেই তথ্য ভেসে ওঠে। এবং, সেখানেই জানা যায়, কখন একিউআই ‘খারাপ’, কখন ‘খুব খারাপ’ আর কখন ‘ভয়াবহ’। অর্থাৎ, কোন বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে হচ্ছে, তা শরীরে পক্ষে কতখানি বিপজ্জনক, সে বিষয়ে নিখুঁত তথ্য আক্ষরিক অর্থেই নাগরিকের হাতের মুঠোয়। বাতাসের গুণগত মানের অবনতি কেন ঘটে, সে তথ্যও মানুষের কাছে আছে, নানাবিধ আলোচনায় সে তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে— অতএব, দূষণ যখন এমন ভয়াবহ স্তরে পৌঁছয়, তখন তো মানুষেরই স্বপ্রবৃত্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ করার কথা, বিশেষত শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত মানুষের। নিজের ভাল তো সবাই বোঝে। যত তথ্য, ততই বোধের স্পষ্টতা, এবং যত স্পষ্টতা, ততই সচেতন প্রয়াস— এই ‘আধুনিক’ ভাবনাটি বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে। সেই রাজনীতির অন্যতম দাবি, পরিবেশ সচেতনতার প্রসার ঘটলেই বিপদে রাশ টানা যাবে। একিউআই-এর উদাহরণটি যে-হেতু হাতে-কলমে এই দাবির অসারতা দেখিয়ে দেয়, তাই এই ‘আধুনিক’ অবস্থানটিকে খানিক নেড়েচেড়ে দেখা বিধেয়। তথ্য এবং সচেতনতার গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই— কী ঘটছে, তা না জানলে সেই ঘটনাকে প্রতিহত করার কাজ শুরুই করা চলে না। বাতাস কেন দূষিত হয়, দূষণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে তা কতখানি ক্ষতিকর, এবং কোন পথে চললে সেই দূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে— সবই তথ্য, এবং অতি জরুরি তথ্য। প্রশ্ন হল, এই তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই কি যথেষ্ট? শুধু তথ্য থাকলেই কি মানুষ নিজের আচরণ পাল্টায়?
প্রশ্নটির বাস্তব উত্তর জানা— না, শুধু তথ্য থাকাই যথেষ্ট নয়। কেন, তার কারণ বহুবিধ। যেমন, বেশির ভাগ মানুষ আরও একটি সত্য কথা জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে, তাঁর একার চেষ্টায় কিছু হওয়ার নয়। কিন্তু, নিজের চেষ্টার ব্যয়ভার নিজেকেই বহন করতে হয়। যে ব্যয় অন্তত আপাতদৃষ্টিতে ফলহীন, মানুষ স্বভাবতই তাতে অনাগ্রহী। অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় বাতাস একটি বিশুদ্ধ পাবলিক গুড। তার ট্র্যাজেডি স্নাতক স্তরের ছাত্রদের পাঠ্য। দ্বিতীয় কথা হল, যত ক্ষণ না রাষ্ট্রীয় স্তরে পরিবেশ নীতির প্রশ্নে সততা তৈরি হচ্ছে, যত ক্ষণ না শিল্পক্ষেত্রের প্রতি দূষণের প্রশ্নে সত্যিই কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, তত ক্ষণ ব্যক্তির চেষ্টায় খুব বেশি কিছু পরিবর্তিত হয় না। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। ফলে, ফাটা ডিমে তা দিয়ে ফল পাওয়ার চেষ্টা করে না।
কিন্তু, তথ্যের প্রতুলতার ‘আধুনিক’ যুক্তির সঙ্গে বাস্তবের বিরোধ শুধু এটুকুতেই আটকে নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল, রক্তমাংসের মানুষ সর্বদা যুক্তিবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের অনুকূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে তাৎক্ষণিক বিবিধ চাপ, আবেগ, যুক্তিহীনতা। অর্থশাস্ত্রের পরিসরে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে আচরণবাদী অর্থনীতির বিরোধ ঠিক এখানেই। পরিবেশের প্রশ্নও তাই। যে মানুষের পক্ষে রোজকার নুন-ভাতের ব্যবস্থা করা কঠিন, জৈব জ্বালানির বিপদ, এবং তাঁর নিজের স্বাস্থ্যের উপরেই সেই জ্বালানির কুপ্রভাবের কথা তাঁকে পইপই করে বুঝিয়ে বলেই বা কী লাভ— তাঁর পক্ষে এই মুহূর্তে কাঠকুটো জোগাড় করে রান্না করাই পথ। অথবা, অফিসে পৌঁছে যাকে টানা দশ ঘণ্টা বিবিধ কাজের চাপে নাজেহাল হতে হবে, পরিবেশ দূষণের বিপদের কথা জেনেও তিনি বাসে চাপার বদলে নিজস্ব বাইকই ব্যবহার করতে চাইবেন। উদাহরণের তালিকা বাড়িয়ে যাওয়া চলে, কিন্তু মূল কথাটি স্পষ্ট— মানুষের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ তার দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। দূষণ যতই বাডুক, স্মার্টফোন যতই একিউআই-এর ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিক, এই বাস্তবটি পাল্টায় না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)