Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

অবিবেচনার দিবারাত্র

১৮ অক্টোবর ২০২১ ০৬:২০

আতঙ্কের প্রহর কি ফুরাইল? না কি, তাহার সূচনা হইল মাত্র? পূজার দিনগুলিতে রাজ্যবাসী যে অবিবেচনার পরিচয় দিলেন, তাহার জন্য কোন মূল্য চুকাইতে হইবে? উৎসবোন্মুখ বঙ্গজনকে দেখিয়া বুঝিবার উপায় ছিল না যে, কোভিড অতিমারি এখনও ঘোর বাস্তব; বিশেষজ্ঞেরা বারে বারেই তৃতীয় প্রবাহের অনিবার্যতার কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছেন। তৃতীয়া-চতুর্থী হইতেই প্যান্ডেলের সম্মুখে সম্মুখে লাইন দীর্ঘায়িত হইয়াছে, মণ্ডপে প্রবেশ করিতে মানুষ প্রাণপণ ছুটিয়া গিয়াছেন— পতঙ্গ যেমন মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়াও অগ্নিশিখার দিকে ছুটিয়া যায়, তেমনই। কোথাও কোথাও এমনই লাগামছাড়া ভিড় হইয়াছে যে, প্রশাসনও শেষ অবধি নড়িয়া বসিতে বাধ্য হইয়াছে— মণ্ডপে ‘বহিরাগত’ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হইয়াছে। সিঁদুরখেলা হইতে বিসর্জন, বঙ্গবাসী প্রতিটি পর্যায়েই নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে স্থান দিলেন আনন্দকে। তাঁহাদের স্ফূর্তি হইল বিলক্ষণ, কিন্তু সেই আনন্দ তাঁহারা শুধুই নিজেদের বিপদের মূল্যে কিনিলেন না, তাঁহারা বিপন্ন করিলেন অন্যদেরও। বিপদের সম্ভাবনাকে মাথায় রাখিয়া যাঁহারা উৎসবের সর্বজনীন আনন্দ হইতে দূরে থাকিলেন, তাঁহাদেরও বিপন্ন করিবার অধিকার আমোদ-উন্মাদ বঙ্গবাসীকে কে দিল, এই প্রশ্নটি করা প্রয়োজন।

পূজায় যাঁহারা আত্মবিস্মৃত হইয়া আনন্দে মাতিলেন, তাঁহারা এই সমাজেরই মানুষ। দেড় বৎসরের অতিমারির মূল্য তাঁহারাও কিছু কম চুকান নাই। তাঁহাদের অনেকেই কাজ হারাইয়াছেন, অনেকের আয় কমিয়াছে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে; পরিবারের মধ্যে যদি না-ও বা ঘটে, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের মধ্যে কোভিডে আক্রান্ত কিংবা গ্রস্ত হইবার ঘটনাও অনেকেরই ঘটিয়াছে। সর্বোপরি, তাঁহারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ করিয়াছেন যে, মাত্র কয়েক মাস পূর্বে অতিমারি এই সমাজকে কোন বিপন্নতার সম্মুখীন করিয়াছিল। হাসপাতালে শয্যা ছিল না, অক্সিজেনের জোগান ছিল না; বহু দিন এমনও কাটিয়াছে যখন শ্মশানেও ঠাঁই ছিল না। সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির স্মৃতি মানুষ এত দ্রুত বিস্মৃত হয় কী ভাবে, এই প্রশ্নটি মনে আসা স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হইল, ইহাই মনুষ্যচরিত্র— যাহার আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি ক্ষীণ, অতীতের ভ্রান্তি হইতে শিক্ষা লইবার ক্ষমতা ক্ষীণতর। ক্ষণিকের আনন্দ যাহাকে বিপুল ঝুঁকির কথা ভুলাইয়া দিতে পারে। কেহ বলিবেন, অতিমারিজনিত অনিশ্চয়তা মানুষের সচেতন চিন্তার ক্ষমতাকে আরও সঙ্কুচিত করিয়াছে, যাহার ফলে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করিয়াই মানুষের ঢল নামিয়াছে রাজপথে।

মনুষ্যচরিত্র সম্বন্ধে এই কথাগুলি যে বিজয়া দশমীর দিনই জানা গেল, তাহা অবশ্য নহে— পূজা হইলে রাস্তায় জনপ্লাবন হইবেই, তাহা এক প্রকার নিশ্চিত ছিল। সেই প্রত্যাশিত বিপর্যয়টি ঠেকাইবার দায়িত্ব পুলিশ-প্রশাসনের উপর ন্যস্ত ছিল। তাহারা সেই কাজে ব্যর্থ বলিলে অনৃতভাষণ হইবে। ব্যর্থ হইতে গেলেও চেষ্টা করিতে হয়। পূজার কয়েক দিন রাজ্যের প্রশাসন সম্পূর্ণ নিশ্চেষ্ট ছিল। ঢালাও দুর্গোৎসবের অনুমতি দেওয়া ছিল প্রথম ভুল। গোড়াতেই রাশ টানিলে পরবর্তী বিশৃঙ্খলা ঠেকাইবার কাজটি সহজতর হইত। কিন্তু, রাজনীতি আসিয়া প্রশাসনের পথ রুধিয়া দাঁড়াইয়াছিল— যেখানে নেতা-মন্ত্রীরাই নিয়ম ভাঙিবার হোতা, সেখানে ভিন্নতর কিছু প্রত্যাশা করা অর্থহীন। পূজা হইলেও মণ্ডপ ও প্রতিমা দর্শনের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা জরুরি ছিল। কোভিড শংসাপত্র দেখাইয়া মণ্ডপে ঢুকিতে হইবে, এমন নির্দেশ কোনও মণ্ডপেই পালিত হইতে পারে না। তবুও, ধোঁকার টাটি সাজাইবার ভঙ্গিতে কোভিড শংসাপত্রের নামে দর্শন হইতে সিঁদুরখেলা, সবই হইল। সময়ের নিয়মে উৎসব ফুরাইয়াছে। তাহার মূল্য কত দিন ধরিয়া চুকাইতে হয়, এক্ষণে তাহাই প্রশ্ন।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisement