Advertisement
E-Paper

জন্ম বার্বাডোজ়ে, ঠাকুর্দা খেলেছেন সোবার্সদের সঙ্গে, রুটের খুঁজে পাওয়া ‘হিরে’ বেথেলই কাঁপুনি ধরিয়ে দিলেন ভারতের বুকে

ইংল্যান্ডের হয়ে কোনও দিন খেলবেন ভাবাই যায়নি। ১২ বছর পর্যন্ত ছিলেন বার্বাডোজ়ে। ‘হিরে’ খুঁজে পেয়েছিলেন জো রুট। তবে ইংল্যান্ড ক্রিকেটে জেকব বেথেলে নিজের প্রতিভাতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ ০০:২০
cricket

শতরানের পর জেকব বেথেলের উচ্ছ্বাস। ছবি: পিটিআই।

শেষ ওভারে দরকার ছিল ৩০ রান। গোটা দল, গোটা ইংল্যান্ড, এমনকি ভারতীয় সমর্থকেরাও তাকিয়ে ছিলেন তাঁর দিকে। ইংরেজ সমর্থকেরা চাইছিলেন পাঁচটা ছয়। ভারতীয়েরা চাইছিলেন একটি উইকেট। তিনি, জেকব বেথেল, চেষ্টা করছিলেন নিজেকে শান্ত রাখার। শিবম দুবের প্রথম বলটা ছিল অফস্টাম্পের সামান্য বাই।ে কোনও মতে লং অফে পাঠিয়ে দৌড় শুরু করলেন। হার্দিকের থ্রো যখন সঞ্জু স্যামসনের হাতে পৌঁছে গিয়েছে, তখন তিনি মাঝ পিচে। ঝাঁপিয়েও লাভ হল না। সঞ্জুর হাতে তখন স্টাম্প ভেঙে দিয়েছে। গোটা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম গর্জন করে উঠেছে।

ইংরেজ ক্রিকেটারেরা হতাশ মুখে হাততালি দিচ্ছিলেন বটে। তবে চোখমুখ বলে দিচ্ছিল, সব আশা শেষ। মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরে গেলে তিনিও, যিনি আর একটি সুযোগ পেলে বৃহস্পতিবারের নায়ক হয়ে যেতে পারতেন। তবে সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে, বিপক্ষের ২৫৪ রানের বোঝা ঘাড়ে নিয়েও ও রকম শতরান বুঝিয়ে দিল, বেথেল এত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার মতো ক্রিকেটার নন। তিনি দাপট দেখাতেই এসেছেন। হারলেও বেথেলের ইনিংস আলাদা সম্ভ্রম আদায় করে নিল ক্রিকেটবিশ্বের থেকে।

মাত্র কয়েক মাস আগেই হইচই হয়েছিল বেথেলকে নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে তখন ল্যাজেগোবরে হয়ে গিয়েছে ইংল্যান্ড। সিরিজ় হেরেছে। একের পর এক টেস্টে ব্যর্থ হয়ে চলেছেন অলি পোপ। বাধ্য হয়ে ইংল্যান্ড ডেকে নিল বেথেলকে। মেলবোর্নে নেমে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। তবে ইংল্যান্ড টেস্টটা জিতেছিল। কিন্তু সিডনিতে সফরের শেষ টেস্টে বেথেলের ব্যাট থেকে বেরোল শতরান। তখন থেকেই ইংল্যান্ডের পরবর্তী প্রতিভা হিসাবে তাঁকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেটাই প্রমাণ করলেন বেথেল।

বৃহস্পতিবার তিনি যখন চারে ব্যাট করতে নেমেছিলেন, তখন ৩৮ রানে ইংল্যান্ডে ২ উইকেট চলে গিয়েছে। মাথার উপর আড়াইশোর বেশি রানের চাপ। অভিজ্ঞ ব্যাটারদেরও ওই মুহূর্তে ঘাবড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বেথেল অন্য ধাতুতে গড়া। উল্টো দিকে একের পর এক উইকেটের পতন দেখতে হলেও বেথেলকে নড়ানো যায়নি। চাপের মুখে এ রকম শতরান রোজ রোজ দেখা যায় না। উইল জ্যাকস এবং স্যাম কারেনের সঙ্গে জুটি বেধে ম্যাচটা প্রায় বার করে দিয়েছিলেন। অল্পের জন্য হল না।

অন্য ধাতুতে গড়া হবেন না-ই বা কেন। ইংল্যান্ডের হয়ে খেললেও, বেথেলের জন্ম ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বার্বাডোজ়ে। সেখানে তাঁর পরিবারের রিয়াল এস্টেটের ব্যবসা। তবে গোটা পরিবারের মজ্জায় জড়িয়ে রয়েছে ক্রিকেট। বেথেলরা আদতে বাজান সম্প্রদায়ের। বেথেলের দাদু আর্থার খেলেছেন গ্যারি সোবার্স এবং ওয়েস হলের সঙ্গে। বেথেলের বাবা গ্রাহাম পড়াশোনায় যেমন প্রতিভাবান ছিলেন, তেমনই দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলতেন। বার্বাডোজ় জুড়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলে বেড়াতেন। সেই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তারকা পারফর্মার ছিলেন। মিলটন স্মল, রিক এলকক, রোলান্ড হোল্ডারের মতো ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলেছেন। বাজান সম্প্রদায় থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন প্রফ এডওয়ার্ড, ডেভিড অ্যালান, জিওফ্রে গ্রিনিজের মতো ক্রিকেটারেরা। আর্থার এবং গ্রাহাম ভেবেছিলেন, তাঁদের পরিবারের সন্তানও হয়তো ক্যারিবিয়ানদের হয়েই খেলবে।

সব বদলে গেল জো রুটের জন্য।

সময়টা ২০১৫ সাল। সবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সফর শেষ করেছে ইংল্যান্ড। পরিবারের সঙ্গে কিছু দিনের ছুটি কাটাবেন বলে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রুট। তাঁর বাবা ম্যাথু দীর্ঘ দিন ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন গ্রাহামের সঙ্গে। দুই বন্ধু পুনর্মিলনের আয়োজন করেন।

সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে স্থানীয় একটি মাঠে গ্রাহামের দশ বছরের ছেলের খেলা দেখছিলেন রুট। সেখানে বেথেলের খেলা দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। বাকিদের থেকে চেহারায় অর্ধেক হওয়ার পরেও সেই ম্যাচে শাসন করছিলেন বেথেল। শতরানও করেছিলেন। ছোটখাটো চেহারার ক্রিকেটারকে মনে ধরেছিল রুটের। বুঝেছিলেন, ইংল্যান্ড ক্রিকেটের ‘হিরে’ হতে পারে এই ছেলে।

পরের ঘটনা বেথেলের বাড়িতে। দুই পরিবারের আড্ডার সময় রুট শুনছিলেন পাশের ঘরে একটি বল নিয়ে ‘নকিং’ করছে বেথেল। কিছু ক্ষণ পর আওয়াজ না পেয়ে পাশের ঘরে যান রুট। দেখেন, ১০ বছরের বেথেল টিভিতে স্থাপত্যশিল্প নিয়ে একটি অনুষ্ঠান দেখছে। রুট বুঝেছিলেন, ১০ বছরে এতটা মনঃসংযোগ সকলের থাকে না।

ইংল্যান্ডে ফিরে রুট চেষ্টা করেন ইয়র্কশায়ারে বেথেলকে সই করানোর। সেই কাউন্টির কর্তাদের বোঝান বেথেলের প্রতিভার ব্যাপারে। তখন থেকেই পেশাদার ক্রিকেটে বেথেলকে আনতে চেয়েছিলেন রুট। সেই মুহূর্ত সই না করানো হলেও, পরে পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে এসে রাগবি স্কুলে ভর্তি হন বেথেল। যোগ দেন ওয়ারউইকশায়ার অ্যাকাডেমিতে। রুট কখনও ভোলেননি বেথেলকে।

ওয়াকউইকশায়ারের হয়ে খেলতে খেলতেই নামডাক করেন বেথেল। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর শট এবং রানের পরিমাণ দ্রুত নজর কেড়ে নেয়। ‘দ্য হানড্রেড’ এবং ‘টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট’-এ সুযোগ পান। সেখানেও ভাল খেলার পর ইংল্যান্ডের থেকে ডাক আসে। নিজের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই অর্ধশতরান করে দেশকে জেতান বেথেল।

মাত্র তিন মাসের মধ্যে ইংল্যান্ডের হয়ে তিনটি ফরম্যাটেই অভিষেক হয় বেথেলের। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলেন। কয়েক মাস পরে এক দিনের ক্রিকেট। সে বছরই নভেম্বরে টেস্ট। মনে করা হয়েছিল টেস্ট দলে পাকাপাকি ভাবে থেকে যাবেন। তা হয়নি। গত বছর আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে খেলেছিলেন বেথেল। সেই সময়ই জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ় আয়োজন করেছিল ইংল্যান্ড। আইপিএলের চুক্তি থাকায় সেই টেস্টে খেলতে পারেননি বেথেল। সেই ম্যাচে অলি পোপ ১৭১ রান করার সুবাদে ভারত সিরিজ়ের দলে জায়গা পেয়ে যান। নেওয়া হয়নি বেথেলকে।

সেই পোপেরই লাগাতার ব্যর্থতা বেথেলের সামনে আরও একটি সুযোগ এনে দেয়। ওভাল টেস্টের দলে নেওয়া হয় তাঁকে। তবে দুই ইনিংসে মিলিয়ে ১১ রান করে আবার বাদ পড়েন। এর পর অ্যাশেজ়েও ডাক পান আচমকাই। বাকিটা ইতিহাস।

সাদা বলের ক্রিকেটে অবশ্য ইংল্যান্ডের হয়ে নিয়মিত খেলছেন। এই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামেই নেপালের বিরুদ্ধে বিপদে পড়েছিল ইংল্যান্ড। সেখান থেকে ৫৫ রানের ইনিংস খেলে দলকে ভদ্রস্থ রানে পৌঁছে দিয়েছিলেন বেথেল। ইংল্যান্ড ম্যাচটা চার রানে জেতে। ফলে বেথেলের ওই ইনিংস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

ইংল্যান্ড বিদায় নিলেও বেথেল আবার কিছু দিন পর আসবেন ভারতে। আইপিএলে এ বারও তিনি আরসিবি-র সদস্য। ট্রফি ধরে রাখার লড়াই। চ্যালেঞ্জ তো আরও বড়।

Jacob Bethell India vs England Joe Root County Cricket
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy