E-Paper

নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ

কলকাতা পুলিশ এলাকাতেই ‘নো হর্ন জ়োন’-এ বিধিভঙ্গের অপরাধে ৯৫৫টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শেষ কথা নয়। এ জাতীয় অপরাধের এক বৃহৎ অংশই পুলিশের খাতা অবধি পৌঁছতে পারে না।

শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৩

সাইলেন্ট জ়োন বা ‘নিঃশব্দ এলাকা’ নামকরণের একটি বিশেষ পরিবেশগত তাৎপর্য রয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকাকে প্রশাসনিক উদ্যোগে যথাসম্ভব শব্দমুক্ত রাখা। সাধারণত হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, আদালত চত্বরের চার পাশের অন্তত ১০০ মিটার এলাকাকে নিঃশব্দ এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখানে দিনের শব্দমাত্রা ৫০ ডেসিবেল এবং রাতের শব্দমাত্রা ৪০ ডেসিবেলের নীচে থাকাই নিয়ম। একই সঙ্গে যে সমস্ত অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, সেই অঞ্চলকে ‘নো হর্ন জ়োন’-এর আওতাভুক্ত করা হয়। এত বিধিনিষেধের একটাই লক্ষ্য— শিক্ষার্থী, অসুস্থ মানুষজন তো বটেই, অন্য গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিযুক্তরাও যাতে বাইরের শব্দের উৎপাত থেকে নিশ্চিন্তে নিরাপদে থাকতে পারেন। কিন্তু ভারতের মতো দেশে সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসন— উভয়েই তার গুরুত্ব যথাযথ উপলব্ধি করতে পারে কি? সম্প্রতি কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ডিসেম্বর মাসে শুধুমাত্র কলকাতা পুলিশ এলাকাতেই ‘নো হর্ন জ়োন’-এ বিধিভঙ্গের অপরাধে ৯৫৫টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শেষ কথা নয়। এ জাতীয় অপরাধের এক বৃহৎ অংশই পুলিশের খাতা অবধি পৌঁছতে পারে না। সুতরাং, শুধুমাত্র ওই একটি মাসে নগরবাসীকে কী বিষম শব্দের উপদ্রব সহ্য করতে হয়েছে, সহজবোধ্য।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশকর্মীদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠে এসেছে— এই শহরে যাঁরা অকারণে হর্ন বাজাতে পারদর্শী, তাঁরাই ভিন দেশে গেলে বদলে যান। প্রধান কারণ, সে দেশের কঠোর আইনব্যবস্থা। নির্দিষ্ট এলাকায় শব্দবিধি না মানলে কলকাতা পুলিশ এলাকায় ‘মোটর ভেহিকল আইন’ অনুযায়ী মামলার পাশাপাশি জরিমানা গ্রহণের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাস্তবে ‘নো হর্ন জ়োন’-এ জোরে হর্ন বাজানোর অপরাধে ক’জনকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়? সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা জরিমানা ও ক্ষেত্রবিশেষে ২০০০ টাকা জরিমানা আদায়ের বিধানও কতটা মানা হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় কর্তব্যরত পুলিশ নজর দেন না, নয়তো সতর্ক করেই ছেড়ে দেন। ফলে, অপরাধ প্রবণতাও অব্যাহত থাকে।

অবশ্যই পশ্চিমের দেশগুলির তুলনায় এ দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি, যানবাহনের সংখ্যাও বেশি। কিন্তু আইনভঙ্গের ক্ষেত্রে এগুলি কোনও অজুহাত নয়। জনসংখ্যা বেশি বলেই নিঃশব্দ এলাকাগুলিকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে অনেক বেশি তৎপরতা প্রয়োজন ছিল। তার প্রমাণ মেলেনি। বরং উৎসব-দিনে হাসপাতাল চত্বরেও অবাধে শব্দবাজি ফেটেছে। পরীক্ষার মাসে পাড়ার অনুষ্ঠানে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাইক, ডিজে বক্সের অত্যাচার চলেছে। অভিযোগ জানালেও প্রশাসনকে পাশে পাওয়া যায়নি, বরং আইনভঙ্গকারীদের হাতে প্রতিবাদী নিগৃহীত হয়েছেন, শব্দশহিদ হয়েছেন। শব্দবাজির ক্ষেত্রে আদালতের বারংবার কঠোর নির্দেশ সত্ত্বেও প্রশাসন উদ্যোগী হয় না। প্রতি বছরই শব্দবাজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুলিশি তৎপরতার প্রমাণ উৎসব-শেষে ফলাও করে বর্ণিত হয়। কিন্তু পিছনের সুবিশাল অন্ধকারটির প্রমাণ মেলে পরের উৎসবে, শব্দতাণ্ডব আরও খানিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে। নিঃশব্দ এলাকার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। শুধুমাত্র জনগণের অ-সচেতনতার দোহাই দেওয়া চলে না। মামলার পরিসংখ্যান না-সাজিয়ে পুলিশ-প্রশাসন দায়িত্ব পালনেও সজাগ হোক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

No Horn Zone noise

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy