E-Paper

চিহ্ন ও বার্তা

যোগী আদিত্যনাথের শাসনকালে উত্তরপ্রদেশে যে ভাবে ও হারে ‘বুলডোজ়ার দাওয়াই’ ও ‘বুলডোজ়ার রাজনীতি’র ব্যাপক প্রয়োগ হয়ে চলেছে, তা নিয়ে নতুন করে বলার নেই।

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৫

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনী প্রচারে বাঁকুড়ায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের আগমন আর সোনামুখীতে তাঁর সভাস্থলের পাশে বুলডোজ়ারের উপস্থিতি, এই দু’টি ঘটনাকে অতি কষ্টেও কাকতালীয় বলা যাচ্ছে না। স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা যতই বলুন রাস্তায় কাজ হচ্ছিল বলে যন্ত্র-যানটি এনে রাখা ছিল, কিছু উৎসাহী সমর্থক দলের পতাকা-হাতে সেখানে চড়ে বসেন এবং সেই ছবিই প্রচারমাধ্যমে দেখা গেছে— এই যুক্তির দুর্বলতা স্পষ্ট। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহও বাংলায় নির্বাচনী প্রচারে ঘুরে গেছেন, আদিত্যনাথ আসতেই কেন বুলডোজ়ারেরও দেখা মেলে! সোনামুখীতে কিছু না বললেও, নন্দকুমারের সভায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে উঠে এসেছে বুলডোজ়ারের জয়গান— উত্তরপ্রদেশে বুলডোজ়ার ‘শুধু রাস্তা তৈরিতেই নয়, দুর্বৃত্ত দমনেও কাজে লাগে’, কিংবা ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার থাকলে তবেই বুলডোজ়ার ছুটবে’, ইত্যাকার সুভাষিত।

যোগী আদিত্যনাথের শাসনকালে উত্তরপ্রদেশে যে ভাবে ও হারে ‘বুলডোজ়ার দাওয়াই’ ও ‘বুলডোজ়ার রাজনীতি’র ব্যাপক প্রয়োগ হয়ে চলেছে, তা নিয়ে নতুন করে বলার নেই। সাম্প্রতিক কালে সেখানে এমন বহু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে জননির্বাচিত একটি সরকার বুলডোজ়ার এনে বাড়িঘর, দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিয়েছে সেগুলি অবৈধ বলে, কিংবা মাফিয়া, দুর্বৃত্ত, অপরাধীদের অকুস্থল বলে। গণতন্ত্রে যে ‘আইনের শাসন’ বলে একটি বস্তু আছে, দেশে এক সুনির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থাও বর্তমান; এই দুইয়ের তোয়াক্কা না করে নিজের মর্জিমাফিক কারও বাড়িঘর বুলডোজ়ারে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলে না, এমনকি অভিযুক্তেরও নয়— বিরোধীদের এই যুক্তিও সেখানে পাত্তা পায়নি। বুলডোজ়ারের বিরাট ও প্রবল উপস্থিতি সেখানে হয়ে উঠেছে সরকারের ‘হাতে-গরম দাওয়াই’-এর সমশব্দ, আদিত্যনাথ হয়ে উঠেছেন ‘বুলডোজ়ার বাবা’, এবং সব ছাপিয়ে তাঁর এই বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ক্ষমতা হাতে থাকলে আইন, বিচার, অভিযুক্তের বিচারের অধিকার, এই কোনও কিছুই বড় কথা নয়, বরং শাসকই আইন ও বিচারেরও ঊর্ধ্বে, তার বুলডোজ়ারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নিদানই ন্যায়বিচার।

ভোটের প্রচারে বহু বিচিত্র কীর্তিকলাপ নজর কাড়ে, হতে পারে বাঁকুড়ার বুলডোজ়ারও তেমনই এক। তবু একে হালকা ভাবে নেওয়া চলে না, কারণ রাজ্যেই হোক কি কেন্দ্রে, বিজেপির ক্ষমতা প্রদর্শনের কিছু বিশেষ চিহ্ন রাজনীতির মূল বয়ানের অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। রামনবমীর ‘শোভাযাত্রা’য় শাণিত অস্ত্রের ঝনঝনানি, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্রের আস্ফালনে যে বার্তা স্পষ্ট, উত্তরপ্রদেশে বুলডোজ়ারও সেই একই কাজ করে চলেছে, দু’টিই দমন নীতির প্রতীক। কোনও প্রতীকের বহুল ব্যবহার তার ভিতরের অর্থটিকে জনপরিসরে গ্রহণীয় করে তোলে— পশ্চিমবঙ্গে যেমন একদা রামনবমীর মিছিলে অস্ত্রশস্ত্রের ঝিকিয়ে ওঠা অবিশ্বাস্য ছিল, আজ তা রীতিমতো বাস্তব। আজ নির্বাচনী প্রচারে বুলডোজ়ার দেখা গেল, এই পথ ধরে যদি তার দৃশ্যমানতাও রাজনীতিতে এবং জনমনে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে, তার চেয়ে বেশি ঝুঁকি ও দুর্ভাগ্যের আর কিছুই হতে পারে না। যোগী আদিত্যনাথ বুলডোজ়ার দিয়ে বাংলার মা-বোন ও যুবসম্প্রদায়কে ‘রক্ষা’র কথা বলেছেন; বাঙালিই ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজে যার ‘সরকারি’ ব্যবহার, তা দিয়ে আদৌ রক্ষা করা চলে কি না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Yogi Adityanath Bulldozer

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy