E-Paper

অত্যাগ্রহী

ক্যামেরা হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন গঙ্গাবিহার করছেন, এবং সেই নম্রমধুর ছবি ভোট-প্রস্তুত জনসাধারণের কাছে যখন সমাজমাধ্যমে প্রবলবেগে পৌঁছে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই মণিপুর কেবল অশান্ত নয়, রীতিমতো জ্বলন্ত।

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৬

পশ্চিমবঙ্গ নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হিসাবে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিশ্চয়ই একটি বড় ঘটনা। বিশেষত হিন্দুত্ব-রাজনীতি অধ্যুষিত উত্তর ভারতের প্রান্তবর্তী এই বিরোধী-শাসিত প্রদেশকে যে-হেতু ভারতীয় জনতা পার্টি আজ অবধি জয় করতে পারেনি, এ বারের নির্বাচনের আলাদা গুরুত্ব সহজেই বোধগম্য। সামগ্রিক এসআইআর প্রক্রিয়া সেই গুরুত্বকে বিরাট পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতে একের পর এক মামলা জড়ো হচ্ছে, অনবরত, অবিচ্ছিন্ন ভাবে। সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতিও বিস্মিত হয়ে বলছেন, কেবল পশ্চিমবঙ্গ নিয়েই কি মামলা চালিয়ে যাবেন তাঁরা। সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের দিকে এখন ভারতীয় রাজনীতির অতিরিক্ত মনোযোগ— সন্দেহ নেই। কিন্তু তা বলে তো অবশিষ্ট ভারত থেমে নেই। এক দিকে, নানা রাজ্যে নানা সঙ্কট উদ্ভূত ও ঘনীভূত হচ্ছে, এবং সেই সব অঞ্চলের মানুষ সমাধানের অপেক্ষায় উৎকণ্ঠিত অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। যেমন, মণিপুরে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। যেমন, নয়ডায় তীব্র শ্রমিক অশান্তির জেরে জনজীবন বিপর্যস্ত। যেমন, উত্তরপ্রদেশে গাজ়িয়াবাদে কিশোরীর ধর্ষণ ও মৃত্যু নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, দিল্লিতে কৈলাস হিলস-এ তরুণীর নৃশংস হত্যা। নারীনিরাপত্তার কথা ভেবে অন্যথা-কাতর মন্ত্রীদ্বয় কিন্তু অনুদ্বিগ্ন, ভোটপ্রচাররত। অন্য দিকে, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের একের পর এক ঘটনায় মুখে কালি, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতকে ‘নরককুণ্ড’ নামে বর্ণনা করছেন। ইজ়রায়েল-ইরানের যুদ্ধে ভারতের নিষ্ক্রিয়তা ও পাকিস্তানের সক্রিয়তা বিশ্বময় আলোচ্য হচ্ছে। হরমুজ় প্রণালী এখনও বন্ধ, এলপিজি-র সমস্যা সারা দেশ জুড়ে আরও অন্তত এক মাস অব্যাহত। তবুও প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব দায় ও দায়িত্ব ফেলে পশ্চিমবঙ্গে বিরাজমান। সন্দেহ জাগে, পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও যে দেশের অন্য কিছু সমস্যা থাকতে পারে, সেই সম্ভাবনাটি বিষয়ে তাঁরা আদৌ সচেতন কি না।

ক্যামেরা হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন গঙ্গাবিহার করছেন, এবং সেই নম্রমধুর ছবি ভোট-প্রস্তুত জনসাধারণের কাছে যখন সমাজমাধ্যমে প্রবলবেগে পৌঁছে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই মণিপুর কেবল অশান্ত নয়, রীতিমতো জ্বলন্ত। ভিডিয়ো বার্তায় ক্রন্দনরত অধিবাসীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অসহায়তা ও ক্রোধের বার্তা দিচ্ছেন। নতুন করে হিংসার উদ্গিরণে নিহতদের কেন্দ্র করে ক্রোধান্ধ জনতাকে ঠেকাতে রাজ্য সরকার হিমশিম খাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কিন্তু অন্যথা ব্যস্ত। ভারতকে অন্যায় অসম্মান করায় ইরান পর্যন্ত ভারতের পক্ষ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রত্যুত্তর দিচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কিন্তু অন্যত্র ফোটোশুট-মগ্ন। এ কেবল উদাসীনতা নয়— দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মোদী বহু বার এই রাজ্যে আসছেন, আসতেই পারেন, কিন্তু উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুর ভয়ঙ্কর হিংসাগ্রস্ত হওয়ার পর তিনি মাত্র এক বার মণিপুরে যাওয়ার সময় বার করতে পেরেছিলেন, ঘটনার আড়াই বছর পর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

পশ্চিমবঙ্গ অতিথিবৎসল রাজ্য। এখানে সকলেই স্বাগত, সর্বদা। তবু বিস্ময়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের দুই দফা নির্বাচন মিলিয়ে টানা পনেরো দিন থাকলেন, তা দেখে। বিজেপি-শাসিত অসমের কথা নাহয় বাদ গেল, বিরোধীশাসিত তামিলনাড়ুতেও তো তাঁকে এমন সময়সূচি করতে দেখা গেল না? এমন তারকাখচিত ‘কার্পেট বম্বিং’ প্রচার অন্যত্র দেখা গেল না? কোন সিদ্ধান্ত কেন তাঁরা নিচ্ছেন তাঁরাই জানেন, তবে পশ্চিমবঙ্গের উষ্ণীষে এ কিন্তু সত্যিই আর এক পালক। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা বাংলায় দেখেছিলেন ‘দ্য মোস্ট সলিড অপোনেন্টস হুম উই নিড টু ডিভাইড অ্যান্ড উইকেন’। আজকের দিল্লি-শাসকরাও ঠিক সে রকম ভাবেই এই রাজ্যকে দেখছেন, স্পষ্টতই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Narendra Modi BJP Manipur

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy