E-Paper

ধর্মের দস্তানা

ভারতে এক-একটি ধর্মের মধ্যে বহু দর্শন ও আচার-অনুসারী মতধারা রয়েছে, পূজার্চনার নিজস্ব বিধিও রয়েছে। তা মনে রেখেই ভারতের সংবিধান একই সঙ্গে সাম্যের অধিকার (ধারা ১৪) এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলিকে নিজস্ব বিষয়গুলি পরিচালনার অধিকার (ধারা ২৬) রেখে এই দু’টি বিষয়ে ভারসাম্য রাখতে চেয়েছে।

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৪৩

শবরীমালা মন্দিরে ঋতুযোগ্য মেয়েদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করবে কেন্দ্রীয় সরকার, তা এক রকম জানাই ছিল। তবু এই অসম্মান মেয়েদের বিঁধেছে। ঋতুকালে ‘অপবিত্রতা’-র যুক্তি সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের রায়েই খারিজ করে দিয়েছিল, পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ মন্দিরে প্রবেশের সমানাধিকার দিয়েছিল মেয়েদের। এ বার ভিন্ন কৌশল নিয়েছে কেন্দ্র। কেন্দ্রের যুক্তি, ভগবান আয়াপ্পাকে চিরকুমার হিসাবে মানা হয় বলেই ঋতুমতী নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছে, লিঙ্গবৈষম্যের কারণে নয়। শুনে মনে পড়ে ষোড়শ শতাব্দীর ভক্ত ও কবি মীরাবাইয়ের কথা। মীরা নারী, তাই জীব গোস্বামী মীরার সঙ্গে সাক্ষাতে অসম্মত হন। শুনে মীরা বলেন, বৃন্দাবনে পুরুষ তো এক জনই, তিনি শ্রীকৃষ্ণ। কথাটি ভারতে ভক্তি আন্দোলনের সারাৎসার। কারণ তাতে বিধৃত এই বিশ্বাস যে ভগবান ভক্তের লিঙ্গ, জাত, কুল দেখেন না, দেখেন হৃদয়ের পবিত্রতা, ত্যাগ, প্রেম। সাম্য ও মানবতার এই বার্তা ভারতের ঐতিহ্য। অতএব অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল যখন কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করেন যে, ভারতের নিজস্ব ঐতিহ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাংবিধানিক অধিকারকে, তখন প্রশ্ন জাগে, মেয়েদের মন্দিরে প্রবেশাধিকারকে সমর্থন করে, ভারতীয় সভ্যতায় এমন ‘ঐতিহ্য’ কি নেই?

ভারতে এক-একটি ধর্মের মধ্যে বহু দর্শন ও আচার-অনুসারী মতধারা রয়েছে, পূজার্চনার নিজস্ব বিধিও রয়েছে। তা মনে রেখেই ভারতের সংবিধান একই সঙ্গে সাম্যের অধিকার (ধারা ১৪) এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলিকে নিজস্ব বিষয়গুলি পরিচালনার অধিকার (ধারা ২৬) রেখে এই দু’টি বিষয়ে ভারসাম্য রাখতে চেয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি, ২৬(বি) ধারা প্রাধান্য বিস্তার করছে ২৫(২)(বি) ধারার উপরেও, যা রাষ্ট্রকে হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির দরজা সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। আইনের ব্যাখ্যায় কেন্দ্রের সমর্থনে কূট যুক্তি নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, সংবিধানের অনুশাসন থেকে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ছাড় দিলে ধর্মস্থান থেকে নারী, নিম্নবর্ণ, দলিতের নির্বাসন প্রায় নিশ্চিত। কেন্দ্রকে পাছে পুরুষতান্ত্রিক, নারীবিদ্বেষী বলে ‘ভুল’ হয়, তাই আইনজীবীর দাবি, শবরীমালা প্রসঙ্গে পিতৃতন্ত্র বা লিঙ্গভিত্তিক স্টিরিয়োটাইপ (আদল) সংক্রান্ত যা কিছু বলা হচ্ছে, সেগুলো বাইরে থেকে আমদানি করা। ভারতীয় সভ্যতার অংশ নয়। ভারতের ইতিহাসে নারীদের শুধু সমদৃষ্টিতে দেখাই হয়নি, উচ্চাসনে বসিয়ে পুজোও করা হয়। আন্দাজ হয়, আইনের বই মুখস্থ করতে গিয়ে আইনজীবী তুষার মেহতা হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১৯৩৬) নৃত্যনাট্যটি পড়ে উঠতে পারেননি। না হলে তাঁর মনে পড়ত এক নারীর মুখে সেই অবিস্মরণীয় সংলাপ, “পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি নহি/ হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি।” কথাগুলি ‘শভেনিজ়ম’ বা পরিশীলিত আধিপত্যবাদের নকশাটি মেলে ধরে— নীচে রাখলে যেমন সম্পত্তি, রোজগার, রাজনীতি থেকে মেয়েদের দূরে রাখা যায়, অত্যুচ্চ স্থানে রাখলেও তেমনই।

ভারতে মেয়েদের ‘উচ্চাসন’-এ বসানোর ধুমটি কত দূর, তা দেখা গিয়েছিল ১৯৮৭ সালে, যখন স্বামীর চিতায় আঠারো বছরের একটি মেয়েকে বসিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছিল। ‘সতী’-মন্দির নির্মাণ ভারতে মেয়েদের ‘পূজার’ই নিদর্শন। মেহতা ঠিক বলেছেন, এই পুরুষতন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করা নয়। নিখাদ ভারতীয়। শবরীমালার ‘ঐতিহ্য’-ও আকাশ থেকে পড়েনি, তার পিছনে রয়েছে ঋতুমতী মেয়েদের প্রতি অমানবিক আচরণের দীর্ঘ ইতিহাস। শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশাধিকারের রায় (২০১৮) দিয়ে আদালত এই বার্তা দিয়েছিল যে, রাষ্ট্র ঋতুমতী মেয়ের প্রতি বৈষম্য সমর্থন করে না। আট বছর পর পুরুষতন্ত্র ফের নেমেছে লড়াইয়ে। কেন্দ্রীয় সরকার তার বাঘনখ লুকোচ্ছে ধর্মের দস্তানায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sabarimala Temple Sabarimala Verdict Sabarimala Issue Kerala Central Government Menstruating Women Menstruation

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy