পরিবেশের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাই বিশ্বের পরিবেশবিদরা আবর্জনা-কুড়ানিদের নাম দিয়েছেন ‘জলবায়ু স্বেচ্ছাসেবক’। অথচ, এই রাজ্যে সমাজের চোখে তো বটেই, প্রশাসনের কাছেও এঁরা উপেক্ষিত। শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই প্রায় পঁচিশ হাজার আবর্জনা-কুড়ানি প্রতি দিন শহরকে আবর্জনামুক্ত রাখার গুরুদায়িত্বের অনেকখানিই পালন করে চলেছেন নীরবে। অথচ, এই শহরের মানুষই তাঁদের আবর্জনা-জ্ঞানে দূরে সরিয়ে রাখে। প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা কিছু নয়। ২০১৬ সালের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধি অনুসারে তাঁদের এই ব্যবস্থায় যোগদান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের সংগঠনের স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা, পরিচয়পত্র প্রদানও প্রশাসনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অথচ, সেই নির্দেশ যথাযথ পালিত হয়নি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এগিয়ে আসতে হয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালতকে। সম্প্রতি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আবর্জনা কুড়ানিদের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পুর দফতরের প্রধান সচিব এবং স্টেট আর্বান ডেভলপমেন্ট এজেন্সি (সুডা)-র ডিরেক্টরকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই সংক্রান্ত অগ্রগতি ও গৃহীত পদক্ষেপের সমস্ত রিপোর্ট পরবর্তী শুনানির অন্তত তিন দিন আগে আদালতের কাছে জমা দিতে হবে।
অথচ, আবর্জনা-কুড়ানিদের জন্য কেন্দ্রের নির্দিষ্ট প্রকল্প আছে— ন্যাশনাল অ্যাকশন ফর মেকানাইজ়ড স্যানিটেশন ইকোসিস্টেম, সংক্ষেপে ‘নমস্তে’। এই প্রকল্পে জঞ্জাল-কর্মীদের সংগঠিত, নিয়মবদ্ধ কর্মী-বাহিনীতে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ-সহ বিভিন্ন শহরে তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এবং সমবায় গঠন করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে তাঁদের সংগঠনকে স্বীকৃতি, পরিচয়পত্র, তাঁদের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে পুরসভা। কিন্তু অনেক পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। অথচ, পরিবেশ প্রশ্নে তাঁদের এই বিপজ্জনক, সম্মানহীন কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্যই উৎসে আবর্জনার পৃথকীকরণ। সেই জরুরি কাজটি কলকাতার মতো শহরে যথাযথ হয় না। জৈব আবর্জনার সঙ্গেই অবাধে মেশে প্লাস্টিক-সহ শুকনো জঞ্জাল। তা সত্ত্বেও নানা শ্রেণির বর্জ্যের বিভাজন এবং পুনর্ব্যবহারের যেটুকু কাজ নিয়মিত হয়ে চলেছে, তার পিছনে এই আবর্জনা-কুড়ানিদের ভূমিকা সর্বাধিক। তাই তাঁদের কাজকে আইনি স্বীকৃতি দান পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নেই গুরুত্বপূর্ণ।
তা ছাড়া এঁরা প্রধানত পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ, অধিকাংশই মহিলা। এঁদের ‘অবৈধ’, ‘অপরাধী’ বলে দূরে সরিয়ে রাখলে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নটিও যেমন উপেক্ষিত হয়, তেমনই রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তা সু-ইঙ্গিতবাহী নয়। সর্বোপরি, নগর পরিকল্পনার কাজে এই ময়লা-নিষ্কাশন কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত না করা গেলে শহর পরিচ্ছন্ন রাখার সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। পুরসভার জঞ্জাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণ— এই সমগ্র ব্যবস্থাপনার মধ্যে আবর্জনা-কুড়ানিরা এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগের কাজটি করে থাকেন। সেই কাজের গুরুত্ব রাজ্যের পুরসভাগুলি অনুধাবন করতে পারেনি। জাতীয় পরিবেশ আদালত যে সে কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, তার জন্য তাঁরা ধন্যবাদার্হ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)