পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ামাত্র ভারতীয় অর্থব্যবস্থা সম্বন্ধে যে আশঙ্কাগুলি দানা বাঁধতে আরম্ভ করেছিল, এ বার কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকও তা স্বীকার করে নিল। মন্ত্রকের রিপোর্ট বলছে, বিপদ চারমুখী— এক, তেল-গ্যাস-সারের আমদানি ধাক্কা খেতে পারে, উল্টো দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রফতানিও; দুই, টাকার দামের পতন অব্যাহত থাকলে তা ভারতীয় অর্থব্যবস্থার উপরে বিশেষ চাপ তৈরি করতে পারে; তিন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহণ ব্যয় বাড়ায় তার প্রভাবও পড়বে অর্থব্যবস্থার উপরে; এবং চার, পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতে অনাবাসীরা যে টাকা পাঠান, তা বন্ধ হতে পারে, বা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কমে যেতে পারে। কেন্দ্রীয় রিপোর্টে আশঙ্কাগুলির প্রত্যেকটিই ‘ভবিষ্যকাল’ হিসাবে বর্ণিত হলেও বিপদ যে আর ভবিষ্যতের গর্ভে নেই, বরং দরজায় কড়া নাড়ছে, তা নিয়ে তিলমাত্র সংশয়ের অবকাশ নেই। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই পেট্রলিয়ামের দামে উৎপাদন শুল্ক কমিয়েছে। অনুমান করা চলে, পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন মেটার আগে অবধি সেই ছাড় বলবৎ থাকবে। কিন্তু, এই ছাড়ের ফলে কেন্দ্রীয় রাজকোষে ১.৫-১.৭ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হবে— পরিমাণটি ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি-র ০.৫ শতাংশের কাছাকাছি। গোটা দুনিয়াতেই কৃষিক্ষেত্র বিপুল আশঙ্কার সম্মুখীন— কারণ, যুদ্ধের কারণে সারের দাম বৈশ্বিক স্তরেই বাড়ছে। ভারতে এর প্রভাব আরও ভয়ঙ্কর, কারণ দেশের অধিকাংশ কৃষকেরই কোনও ঝুঁকি সামলানোর সাধ্য নেই। এর পাশাপাশি ২০২৬-এর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এল নিনো-র প্রভাবে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা। এই জোড়া ধাক্কায় কৃষি বিপর্যস্ত হলে এক দিকে খাদ্যের জোগান কমবে, মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তীব্রতর হবে; অন্য দিকে, কৃষির আয় কমলে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদায়। তার ফলে জিডিপি কমার আশঙ্কা। অর্থাৎ, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সর্বার্থেই বহু মাইল দূরে অবস্থান করেও ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় যুদ্ধের তীব্র প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকট।
প্রশ্ন হল, এই বিপদের কোনও দায়ভাগই কি কেন্দ্রীয় সরকারের নেই? যে কোনও বৈশ্বিক সঙ্কটেই ভারতীয় অর্থব্যবস্থা কেন এমন ভাবে প্রভাবিত হয়? কোভিড-এর সময়েও ভারতের আর্থিক সঙ্কোচনের হার ছিল বিশ্বের বৃহৎ অর্থব্যবস্থাগুলির মধ্যে সর্বাধিক। এ বারও দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় টাকার দামে যতখানি পতন ঘটেছে, বিশ্বের অন্য কোনও প্রধান মুদ্রার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার আগেই ভারতীয় বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষেত্র বিপুল চাপের মুখে ছিল— যুদ্ধ যাকে বিপন্নতার স্তরে নিয়ে গিয়েছে। ভারতের বাজার ছেড়ে বিদেশি লগ্নির চলে যাওয়ার ঘটনাও যুদ্ধের সঙ্গে শুরু হয়নি, তার আগে থেকেই লগ্নির বহির্গমন ঘটছিল। যে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি বা এফডিআই-কে তুলনামূলক ভাবে দীর্ঘস্থায়ী লগ্নি বিবেচনা করা হয়, অতিমারির আগে ভারতে তার পরিমাণ ছিল ৪,০০০ কোটি ডলারেরও বেশি— ২০২৪-২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে একশো কোটি ডলারের কম। অন্য দিকে, ২০২৪-২৫ সালে ভারত থেকে প্রত্যাহৃত হয়েছে ৫,০০০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি পুঁজি— ২০২০-২১ সালে যা ছিল ২,৭০০ কোটি ডলার, এবং ২০১৫-১৬ সালে মাত্র ১,১০০ কোটি ডলার। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ভারতীয় লগ্নিকারীরাও দেশের বদলে ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশে লগ্নি করতে মনস্থ করছেন। এমন পরিস্থিতি কিন্তু যুদ্ধের কারণে তৈরি হয়নি। হয়েছে অর্থব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ, অদক্ষ পরিচালনার কারণে। যুদ্ধ সেই বিপদকে প্রকট করে তুলেছে। এবং, স্বধর্মে অবিচল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এই বিপদের গোটা দায়টিই যুদ্ধের ঘাড়ে চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে। অতিমারির পর্বেও ঠিক যে কাজটি করেছিল সরকার— অতিমারি শুরু হওয়ার আগের চার বছর যে ভারতে আর্থিক বৃদ্ধির হার তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল, সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। দায় নেওয়ার অভ্যাসটি বারো বছরেও সরকারের রপ্ত হল না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)