সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদকীয় ২

খলনায়কের পরিচয়

টাক, আঁচিল, বলিরেখা। খলনায়কদের রূপ নির্মাণে ত্বকের বিকৃতিকে ব্যবহার করে হলিউড। মার্কিন গবেষকরা সমীক্ষায় দেখিয়াছেন, দুষ্ট, অসৎ লোক বুঝাইতে চোখের নীচে ঘন কালো দাগ বা কেশবিরল মস্তক বারবার দেখানো হইয়া থাকে। ইহাতে লোকের মনে ত্বকের রোগের প্রতি বিরূপ মনোভাব জন্মাইতে পারে, সতর্ক করিয়াছেন ওই গবেষকরা। যুক্তি দিয়া এই চিন্তার অসারতা বুঝিলেও, ছবিতে রোগ ও দুষ্টচরিত্রের সংযোগ দেখিতে দেখিতে মানুষ যুক্তিপ্রয়োগের পূর্বেই রোগাক্রান্তকে সন্দেহের চোখে দেখিবেন, আশঙ্কা ওই গবেষকদের। ভারতীয় ছবিতে খলনায়কের চরিত্রচিত্রণ লইয়া এমন সমীক্ষা হয় নাই, কিন্তু তাহার ফল সম্ভবত খুব ভিন্ন হইবে না। প্রথম দর্শনেই নায়ক ও খলনায়কের পার্থক্য বুঝাইতে ত্বক ও চুলের পার্থক্য ব্যবহার অতি সহজ  উপায়। প্রসঙ্গটি লঘু মনে হইতে পারে, কিন্তু তাহা নহে। রোগের জন্য লজ্জিত, নিন্দিত, উপেক্ষিত হইতে হইলে তাহা দৈহিক কষ্ট অপেক্ষা অধিক পীড়াদায়ক হইয়া ওঠে। উচ্চ রক্তচাপ বা মধুমেহর মতো অসুখ ক্ষতিকর, কিন্তু সমাজে তাহার প্রতি সহানুভূতি রহিয়াছে। অথচ ত্বকের বেশ কিছু অসুখ মারাত্মক না হইলেও সমাজে তাহা উপহাসাস্পদ। তাহাতে অনেক সময়ে যথাযথ চিকিৎসাও হয় না। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করিবার কাজটি গণমাধ্যম, বিশেষত দৃশ্যমাধ্যমগুলি অনেকটাই করিয়া থাকে। অতএব চলচ্চিত্র কিংবা গণমাধ্যমে রোগ ও রোগীর চিত্রণ কী ভাবে হইতেছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য তাহা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পূর্বেও নানা গবেষণায় দেখা গিয়াছে, গণমাধ্যমে নানা ধরনের অসুখ যে ভাবে প্রতিফলিত হইতেছে, বাস্তবের সহিত তাহার দূরত্ব অনেক। গ্লাসগোর একটি গবেষকদল দেখাইয়াছিলেন, মানসিক রোগীদের টেলিভিশন সিরিয়ালে প্রায়ই হিংস্র বলিয়া দেখানো হইয়া থাকে। বাস্তবে অপরের প্রতি হিংস্রতা দেখা যায় অতি সামান্য মনোরোগীর মধ্যে। এই প্রবণতায় মনোরোগীদের পুনর্বাসন প্রকল্পগুলি বাধা পাইতে পারে, আশঙ্কা করিয়াছিলেন ওই গবেষকরা। এ দেশে সংবাদমাধ্যম আবার যে কোনও নৃশংস অপরাধে অভিযুক্তকে ‘মনোরোগী’ আখ্যা দিয়া দেয়। ফল একই। ব্রিটেনের অপর একটি গবেষণা দেখাইয়াছিল, সিরিয়ালের শিশুরা কেহই স্তন্যপায়ী নহে, সকলেই বোতল-নির্ভর। ইহা জনমানসে বোতলের দুধকে শিশুর জন্য ‘স্বাভাবিক’ করিয়া তুলিতেছে, সতর্ক করিয়াছিলেন ওই গবেষকরা।

স্বাস্থ্যসম্পর্কিত সকল বিচ্যুতি আইন করিয়া নিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নহে। তাহা উচিতও নহে। চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা সিরিয়ালের প্রযোজক স্বাস্থ্যের বার্তা প্রচার করিতে বাহির হন নাই। তাঁহাদের চরিত্রচিত্রণের স্বাধীনতা আছে। এই ধরনের গবেষণাকে তাঁহাদের চলচ্চিত্রের সমালোচনা বলিয়া গ্রহণ করা প্রয়োজন। দৈহিক ত্রুটি ব্যবহার করিয়া চারিত্রিক ত্রুটি দেখাইবার মধ্যে কোনও স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য নাই, তাহা বাস্তবানুগও নহে। এই গবেষকরা সামগ্রিক ভাবে শিল্পের সহিত বাস্তবের সম্পর্ককে পরীক্ষা করিতেছেন এবং চিত্রনির্মাতাদের তথ্য-বিচ্যুতি দেখাইতেছেন। বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে শিল্পের পরীক্ষার ফল মানিতে হইবে বইকী। চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ মানিলেই অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতার অকারণ ব্যবহারে রাশ টানিতে হইবে।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন