স্বভাবত মিতবাক রাজনাথ সিংহের কণ্ঠে ক্রমাগত তোপধ্বনি শোনা যাইতেছে। নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ বোধ করি তাঁহাকে জাগিয়া উঠিতে বলিয়াছেন। পাকিস্তানের সহিত কথা যদি হয় তবে তাহা হইবে পাক অধিকৃত কাশ্মীর লইয়া— তাঁহার এই কার্যত অভূতপূর্ব ঘোষণা বুঝাইয়া দেয়, মোদী সরকার খেলা পাল্টাইবার খেলা চালাইয়া যাইতে চাহে। দুই দিন আগেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর মুখে শোনা গিয়াছিল আর একটি অ-স্বাভাবিক ঘোষণা। অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি বলিয়াছিলেন: পারমাণবিক অস্ত্র (অনুরূপ অস্ত্রের দ্বারা আক্রান্ত হইবার) আগে ব্যবহার না-করিবার ‘নো ফার্স্ট ইউজ়’ নীতিতে ভারত বরাবর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকিয়াছে, কিন্তু ভবিষ্যতে কী হইবে তাহা ভবিষ্যৎই বলিতে পারে। প্রসঙ্গত, তিন বছর আগে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পর্রীকরও পারমাণবিক অস্ত্র আগে ব্যবহার না করিবার নীতি সম্পর্কে দ্বিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা ছিল প্রয়াত নেতার ব্যক্তিগত অভিমত। রাজনাথ সিংহের এই উচ্চারণ কিন্তু দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসাবেই। আপাত দৃষ্টিতে ইহার অর্থ: ভবিষ্যতে ভারত যে পারমাণবিক আক্রমণের শিকার হইবার আগেই কাহারও বিরুদ্ধে সেই অস্ত্র ব্যবহার করিবে না, এমন নিঃশর্ত প্রতিশ্রুতি আর দেওয়া হইতেছে না। এই ঘোষণাও স্পষ্টতই ইসলামাবাদের উপর চাপ বাড়াইবার লক্ষ্যে। খেলা পাল্টাইতেছে।

এবং বিপদ বাড়িতেছে। পারমাণবিক বিপদ। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও সঙ্কেতের মূল্য অপরিসীম। বস্তুত, ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগ হইতে একটি সত্য কার্যত সর্বজনস্বীকৃত: পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য নহে, কারণ সত্যই সেই অস্ত্রের আক্রমণ (এবং তাহার প্রতি-আক্রমণ) ঘটিলে আক্ষরিক অর্থেই সর্বনাশ হইবে। অন্য ভাবে বলিলে, পারমাণবিক যুদ্ধে কাহারও জয় হইতে পারে না, কারণ সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাহা হইলে এই অস্ত্র ধারণ কেন? উত্তর একটিই: ডেটারেন্স বা নিবারণ। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই বা ততোধিক দেশের কেহ অপর কাহাকেও আক্রমণ করিলে পাল্টা আঘাত আসিবে— এই বাস্তব সম্ভাবনাই তেমন আক্রমণকে নিবারণ করে। ‘নো ফার্স্ট ইউজ়’ নীতি ও তাহাতে নিহিত অভয়-সঙ্কেত এই নিবারণী কৌশলকেই স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য রূপ দেয়। পারমাণবিক শক্তি হিসাবে (কার্যত) স্বীকৃতির সময় হইতেই চিন (১৯৬৪) এবং ভারত (১৯৯৯) এই নীতি গ্রহণ করিয়াছে। এই অঙ্গীকার বিশ্বের দৃষ্টিতে ‘দায়িত্বশীল’ পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য হইবার একটি প্রধান শর্তও বটে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর উক্তি সেই দায়িত্বশীল ভাবমূর্তির পক্ষে ক্ষতিকর।

কিন্তু তাহা এক অর্থে ‘সামান্য ক্ষতি’। গভীরতর উদ্বেগের কারণ উপমহাদেশের পরিস্থিতি। প্রথম আক্রমণের সম্ভাবনা জাগাইয়া তুলিয়া ভারত হয়তো পাকিস্তানের যুদ্ধপ্রবৃত্তি বা সন্ত্রাসে প্ররোচনার মানসিকতাকে ভয় দেখাইয়া দমন করিতে চাহিতেছে। কিন্তু, সমস্যা হইল, পরমাণু আক্রমণের শিকার হইবার বাস্তব আশঙ্কা থাকিলে একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র আগেই আক্রমণ করিয়া বসিতে পারে, বিশেষত সংশ্লিষ্ট দুই রাষ্ট্র যখন যুযুধান প্রতিবেশী। এই কারণেই পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রস্তাব করিয়াছেন, মোদীর রাজত্বে ভারতের হাতে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের নিরাপত্তা কতখানি, তাহা নূতন করিয়া ভাবা দরকার। আন্তর্জাতিক বিশ্বে এমন প্রস্তাব— লজ্জার কথা বটে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র জটিল, সেনাবাহিনী এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব অত্যধিক— এমন একটি রাষ্ট্র যদি প্রতিবেশীর পারমাণবিক আক্রমণ সম্পর্কে শঙ্কিত থাকে, তবে তাহার বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া হইবে না, এই গ্যারান্টি রাজনাথ সিংহরা দিতে পারিবেন কি? পারমাণবিক কূটনীতিকে যে ভাবে অস্থির করা হইতেছে, তাহা উদ্বেগজনক বলিলে কম বলা হয়।