ঘোড়া গড়িতে বলিলে যাহা উট গড়ে, তাহাই ‘কমিটি’। প্রবচনটি সুপরিচিত। এবং, যে কোনও প্রবচনের মতোই, সারগর্ভ। অনেকের উপর একটি কাজের দায়িত্ব দিবার পর অতি বিলম্বে অতি অনুপযোগী কিছু মিলিয়াছে, তাহার দৃষ্টান্ত কম নাই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ‘শিশুসাথী’ প্রকল্পের জন্য গঠিত কমিটির গাফিলতির কারণে যাহা ঘটিতেছে, তাহা আদৌ কৌতুকপ্রদ নহে, মর্মান্তিক। গত তিন মাস এই প্রকল্প স্থগিত। হৃৎপিণ্ডে অস্ত্রোপচার হয় নাই, ঝুঁকি বাড়িতেছে। ক্ষুদ্র প্রাণগুলি যে কোনও মুহূর্তে ঝরিয়া যাইতে পারে, কারণ কমিটি তাহাদের অস্ত্রোপচারের ছাড়পত্র দিতে ব্যর্থ। ইহা কি কেবল কর্তব্যে ত্রুটি? ইহা কি প্রাণহানির সমান অপরাধ নহে? শিশুর প্রাণরক্ষার জন্য যে প্রকল্প, কমিটির গাফিলতিতে যদি তাহা ব্যর্থ হইয়া যায়, চিকিৎসায় বিলম্বের জন্য শ্বাসকষ্টে নীল হইয়া যায় শিশুরা, তাহা হইলে কমিটি গড়িয়া কী লাভ হইল? ২০১৩ সালে ‘শিশুসাথী’ প্রকল্পটি শুরু হইয়াছিল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করিয়াছিলেন, হৃৎপিণ্ডে সমস্যা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে যে শিশুরা, তাহাদের অস্ত্রোপচার করিতে হাসপাতালের যাহা খরচ হইবে, তাহা প্রকল্পের অর্থ হইতে মিটাইয়া দিবে সরকার। কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয়েই অর্থ বরাদ্দ করিবে এই প্রকল্পের জন্য, এমনই স্থির হইয়াছিল। যদিও সরকারি এবং বেসরকারি, দুই প্রকারের হাসপাতালকেই তালিকায় রাখা হইয়াছে, কিন্তু প্রায় নব্বই শতাংশ অস্ত্রোপচার হইয়াছে বেসরকারি হাসপাতালে। এখন কর্তাদের সন্দেহ হইয়াছে, হয়তো অকারণেই অস্ত্রোপচার করিতেছে বেসরকারি হাসপাতাল। অতএব গঠিত হইয়াছে মূল্যায়ন (স্ক্রিনিং) কমিটি। সেই কমিটি ছাড়পত্র দিলে তবেই অস্ত্রোপচার হইবে।

প্রশ্ন উঠিবে, কেন? বেসরকারি হাসপাতালে অপ্রয়োজনেও অস্ত্রোপচার হয় সত্য। কিন্তু ছানি কাটা আর জটিল অস্ত্রোপচারের পার্থক্য আছে। শিশুর হৃৎপিণ্ডে অস্ত্রোপচারে দক্ষ শল্যবিদ এতই কম, আর চিকিৎসার জন্য প্রতীক্ষারত শিশুর সংখ্যা এতই বেশি (সমীক্ষা অনুসারে, গড়পড়তা দশ জন শিশুর এক জন হৃদ্‌যন্ত্রের কোনও না কোনও ধরনের সমস্যা লইয়া জন্মায়) যে অপ্রয়োজনে কেন এই অস্ত্রোপচারটি করিতে হইবে, সাধারণ বুদ্ধিতে তাহা বোঝা দুষ্কর। তৎসত্ত্বেও, মানিতেই হইবে, সরকারি প্রকল্পে নজরদারি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাহার আয়োজন পরে করিলে হয় না? চিকিৎসার পূর্বের ও পরের বিবিধ পরীক্ষার রিপোর্ট হইতে স্পষ্ট হইবে, অপ্রয়োজনে চিকিৎসা হইল কি না। দোষ প্রমাণিত হইলে হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কালো তালিকাভুক্তি প্রভৃতি শাস্তি হইতে পারে। তাহাতে সকল হাসপাতাল সতর্ক হইবে। যথাযথ নীতি ঝুঁকি বাড়াইবে দুষ্কৃতীর। নিরপরাধ শিশুর ঝুঁকি বাড়াইবে কেন? ‘স্ক্রিনিং’ কমিটির ছাড়পত্রের জন্য প্রতীক্ষার বিধি বাতিল হইবার যোগ্য।

যদি বাতিল করিতে সরকার রাজি না থাকে, তাহা হইলে কেবল এই কাজটির জন্য কমিটি গঠন করিতে হইবে। শিশুসাথীর ছাড়পত্র অনুমোদনের কাজটি সরকারি চিকিৎসকের দৈনন্দিন কাজের অতিকায় বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো চাপাইয়া দিলে চলিবে না। সরকার যে কর্মরত চিকিৎসকদের উপরেই মূল্যায়নের দায়িত্ব চাপাইয়াছে, তাহাতে আশঙ্কা হয়, তবে কি শিশুর প্রাণ বাঁচাইবার চাইতে টাকা বাঁচাইবার তাগিদ অধিক হইল? ইতিপূর্বেও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল অভিযোগ করিয়াছে, অস্ত্রোপচারের পর খরচ মিটাইতে সরকার অত্যন্ত বিলম্ব করিতেছে। ফলে প্রকল্পটি মন্দ গতিতে চলিয়াছে। শিশুরোগীর প্রতীক্ষা দীর্ঘ হইয়াছে। এ বার সরকার-নির্মিত কমিটি প্রতীক্ষা বাড়াইতেছে। তবে এই বিষয়ে নালিশ করিতেও ভয় হয়। সরকার হয়তো বিলম্বের কারণ খুঁজিতে আরও একটি কমিটি বসাইবে।