জু ন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সোমবারের কাগজে সচিত্র সংবাদ এল শনি বার ঝড়বৃষ্টির পর বীরভূমে অন্তত একটি ছোট নদীর বাঁধের জল খুলে দিতে হয়েছে, যদিও ‘কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি’। তেইশ তারিখ খবর পাওয়া গেল সেই জেলারই হিংলো নদীর বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। স্মৃতিধর পাঠকদের মনে থাকতে পারে ১৯৭৮ সালে দুর্গাপুজোর নবমীর রাত্রে আচমকা এসে পড়া বিপুল জলের ধাক্কায় বোলপুরের কাছে অজয়নদীর পাশবাঁধ তেইশ কিলোমিটার ভেঙে যায়। যার ফলে ওই অঞ্চলের বন্যায় অনভ্যস্ত লোকজনের দুর্দশার সীমা ছিল না। সেই আচমকা জল এসেছিল এই হিংলো নদীর বাঁধ ভাঙার দরুনই। সে বছর অবশ্য তার আগে দুদিন ধরে সমগ্র অববাহিকা জুড়েই প্রবল বৃষ্টি হওয়ায় অজয় নদীও ছিল অনেকখানি ভরা, হঠাৎ এসে পড়া বাঁধখোলা জল ধরার জায়গা ছিল না নদীতে। পূর্বদিকের পাশবাঁধ ভেঙে সে জল ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের পর গ্রাম সমস্ত চাষের মাঠ ছয়-আট-এগারো ফুট বালিকাদার নীচে চাপা পড়েছিল। শ্রীপান্নালাল দাশগুপ্ত সেই মানুষদের হয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। কিন্তু এ বছর টানা বর্ষার বৃষ্টি এখনও নামেইনি বলে রাজ্য ইতিমধ্যেই খরার আশংকায় দিন গুনছে। এ দিকে দু’দিন বৃষ্টির পরেই আসন্ন বন্যাভয়ও জাগছে। সে আশংকা কেবল বীরভূমের নয় একেবারেই। ইতিমধ্যেই দুর্গাপুরের সন্নিকটে ডিভিসি-র ব্যারেজ নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের মধ্যে চাপানউতোর শুরু হয়ে গিয়েছে। বিবাদের বিষয়টিও রোমহর্ষক। সময়মত ডিভিসি ব্যারেজ-এ জমতে থাকা মাটি তুলে না ফেলার দরুন রিজার্ভারের জল-ধারণ ক্ষমতা অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই সরকারের পারস্পরিক দোষারোপ থেকে এ-ও জানা গেল যে তৈরির পর এই ব্যারেজ-এ কখনওই ড্রেজিং করানো হয়নি।

যে কোনও বড় বাঁধ তৈরির শুরুতেই এ কথা স্পষ্ট বলা হয় যে সেটি ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর কার্যকর থাকবে। তার প্রধান কারণ এই যে,  নদীতে জলের সঙ্গে মাটিও ভেসে আসে। বাঁধের পেছন দিকে জল জমানোর জন্য যে রিজার্ভার তৈরি হয়, সেখানে স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা মাটিও জমে। বিশেষত হিমালয় পর্বত থেকে আসা নদীগুলির বয়ে আনা মাটির পরিমাণ আমেরিকা-ইউরোপের পাথুরে পাহাড় থেকে আসা মাটির চেয়ে অনেক বেশি। স্বাভাবিক অবস্থায় নদীর বহতা ধারা সে মাটি ভাসিয়ে নিয়ে যেত। বর্ষায় প্রবল জলের সঙ্গে নেমে আসা অতিরিক্ত মাটি নদীর দুই কূল উপচে পাশের খেতে পলিমাটি বিছিয়ে দিত। বর্ষা বা বন্যার জলে ভেসে আসা সেই মাটিই আবার এই দেশকে এমন উর্বরতা দিয়েছে। অতিরিক্ত জল দ্রুতগতি বয়ে যাওয়ার কালে স্বাভাবিক ড্রেজিং-এ গভীর হয়ে যাওয়া নদীখাত সহজেই সারা বছরের জল ধরে রাখতে পারত। আজকের মতো বৃষ্টিকালের শেষেই নদী শুকিয়ে যেত না। কিন্তু বড় বাঁধগুলো যখন সেই বহমান ধারার মাঝখানে আড়াআড়ি দাঁড়াল বিরাট উঁচু প্রাচীর হয়ে, তখন নদীর কোটি কোটি বছরে তৈরি শৃঙ্খলা গেল ভেঙে। এবং, নদীর যা করার কথা নয়, সেগুলোই ক্রমাগত ঘটতে লাগল সারা দেশ জুড়ে।

এই দেশে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে প্রচুর বৃষ্টি হয় বলেই এখানে এত নদী তৈরি হয়েছে। বিশাল ভারতবর্ষের ভূমিরূপের বৈচিত্রের জন্যে অঞ্চলভেদে আমাদের নদীদের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। জলমাটির সেই অমোঘ নিয়মকে দীর্ঘকাল লক্ষ করার ফলে, তার সঙ্গে মানিয়ে জীবন কাটানোর তাগিদে, এ দেশের নদী-কিনারি মানুষদের বৃত্তি, সংস্কৃতি ও অভ্যাসে এত বৈচিত্র। বিশ্বমান্য নদীবিজ্ঞানী প্যাট্রিক ম্যাককুলি তাঁর বই দ্য সাইলেন্সড রিভারস-এ বলছেন, নদী আর বড়-বাঁধ দুটি পরস্পরবিরোধী অস্তিত্ব, এরা এক সঙ্গে টিকে থাকতে পারে না। একটি আর একটিকে সংহার করে। আজ দেশ জুড়ে সেই সংহারপ্রক্রিয়া প্রতি বছর আগের বছরের চেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশ জুড়ে একটি নদীও আজ আর নিত্যবহমানা ‘সদানীরা’নেই।

বর্ষাকালে বন্যা এই দেশে এক স্বাভাবিক ঘটনা ছিল এবং নদী-কিনারি মানুষরা সাধারণ বন্যাকে সে ভাবে ভয়ও করতেন না। বরং তাঁরা নদীর ওই নিয়মকে মান্য করেই নিজেদের ঘর-গৃহস্থালি সামলাতেন। খেয়াল করলে দেখা যাবে, নদীর কাছাকাছি গ্রাম থাকত ছোট-নদীর ধারে। যেখানে বন্যা-ভাঙনের ভয় কম। ‘বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে’ ঘটত ছোট-নদীরই পাশে। বড়-নদীর পাশে থাকত ফসলখেত, যেখানে বন্যায় পলি পড়বে। সেখানে বসত হত নদী থেকে দূরে, উঁচুতে। ফলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ ভাবে অনিয়ন্ত্রিত হত না। বিধ্বংসী বন্যাও হত, কিন্তু তা হত অনেক দিন পর পর। আজ ডিভিসি ব্যারেজ নিয়ে বিতণ্ডা এ জন্য যে, ভরাট হয়ে যাওয়া নদীতে বর্ষার স্বাভাবিক জল এসে পড়লেও বাঁধ বাঁচাতে বাঁধের গেট খুলে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে নিম্ন-দামোদর অববাহিকা ডুবে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। প্রাক-ডিভিসি যুগে দামোদরের বিখ্যাত ‘হড়পা বান’ বিপুল জল নিয়ে আসত এবং সেই জলের তোড়ে নদীর খাত গভীর করে দেওয়ার সঙ্গে গঙ্গার মুখে জমা হওয়া বালি সমুদ্রের ভেতর পর্যন্ত ঠেলে দিত। সে ‘বান’-এর স্থায়িত্ব হত কয়েক ঘন্টা। এখন যেহেতু গঙ্গা ও দামোদর— দুই নদীরই মুখ বন্ধ, বাঁধ-খোলা জল সহজে বয়ে যেতে পারবে না, জল-ডুবি চলবে কয়েক মাস পর্যন্ত। একই অবস্থা নর্মদার। পশ্চিম ভারতের এই অন্যতম প্রধান নদীটির ১৩০০ কিমি বয়ে আসা জলের বিপুল অংশ আটকে পড়েছে প্রায় একশো চল্লিশ মিটার উঁচু বাঁধের পেছনে। ফলে ‘মুক্তধারা’র শিবতরাইবাসীরা বাস্তব হয়ে উঠলেন গুজরাতে। নর্মদার নিম্নপ্রবাহে নদীর জল আসছে কম, সংবাদ অনুযায়ী ভারুচ বন্দরের চল্লিশ কিমি ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়ছে সমুদ্রের নোনা জল, ঠিক যেমনটি হয়েছে দামোদরে, অনেকখানি গঙ্গাতেও। গুজরাতে কৃষিজীবী, জেলে, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানাকর্মী সহ প্রায় ন’লক্ষ লোক বিকট সমস্যার মুখে পড়েছেন। টান ধরছে পানীয় জলের ভাণ্ডারেও। আবার আসন্ন বর্ষায় বাঁধ-রক্ষার জন্য খুলে দেওয়া জল প্রলয় ঘটাবে এই একদা সমৃদ্ধ এলাকায়।

এরই সঙ্গে গত কয়েক বছরে দেশময় আর এক বিপদ উদ্যত হয়েছে। বড় নদীদের অনেকখানি করে জমির যদি দখল নিয়েছে বিভিন্ন বাঁধ, সারা দেশে ছোট নদীদের প্রাণ শুকিয়ে উঠছে জমিদখলের টানে। কোথাও নগরায়ণ, কোথাও ধানখেত, কোথাও বা আরও কিছু জমির জন্য এক-দু’জন মানুষের, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের, হত্যা প্রায় অভ্যস্ত খবর হয়ে উঠেছে। নদী-হত্যাও এখন প্রায় সে রকমই নিত্য ঘটনা। সারা দেশে একটি নদীও নেই যা তার নিজস্ব প্রাকৃতিক ধারায় বয়ে যাচ্ছে। ফলে বহু যুগ ধরে নদীর যে নিজস্ব খাত তৈরি হয়েছিল, তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু প্রকৃতির প্রতিটি জিনিসই পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন, কাজেই জঙ্গল সাফ, সারা বছর চাষের দরুন নদীর পাশের মাটি আলগা হয়ে থাকা, ছোটর চেয়ে ছোট নদীরও নির্দিষ্ট পথের ওপর কিছু না কিছু গড়ে ওঠার ফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী। নদী-কিনারি মানুষদের একটি পুরনো কথা আছে: ‘সোঁত মরলেও রেক মরে না’। অর্থাৎ নদী শুকোলেও তার চলার পথচিহ্নটি অমোঘ ভাবে রয়ে যায়। কাজেই বর্ষার জল নদীর ভরাট হয়ে যাওয়া খাত বেয়েই নামে। কেদারনাথে ২০১৩’র বীভৎসতাকে ‘প্রলয়ংকর বৃষ্টি’ বলে অভিহিত করে সে এলাকায় একই রকম প্রকৃতিবিরোধী কাজ চলছেই। ফলত, গত মাসে সেখানে ফের ভয়ংকর কাদাধ্বস হয়েছে। প্রাণ ও সম্পত্তির হানিও হয়েছে। ক্ষতিপূরণ কখনও প্রকৃতি ধ্বংসের সমাধান হতে পারে না। এবং, যে ‘বিপুল ক্ষয়ক্ষতি’র হিসাব হয়, নদীর ক্ষতি এখনও তার মধ্যে ধরা হয় না।

পুনশ্চ: একটি উপায় ভেবে দেখা যায়। বিজ্ঞানের কোনও আশ্চর্য প্রযুক্তিবলে বর্ষাঋতুর বৃষ্টিকে যদি শুকিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে আর নদী নিয়ে সমস্যা থাকবে না। পুরো দেশের জমিকেই কিছু-না-কিছু ‘কাজে’ লাগানো যাবে!