Advertisement
E-Paper

ভোলবদল

নির্বাচনের আগে একটি দলের সদস্য হিসাবে প্রচার চালানো, আর ভোটে জিতিবা-মাত্র রাতারাতি আনুগত্য পাল্টাইয়া অন্য দলে নাম লেখানো, ইহাকে কী বলে?

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০১৭ ০০:০০

নির্বাচনের আগে একটি দলের সদস্য হিসাবে প্রচার চালানো, আর ভোটে জিতিবা-মাত্র রাতারাতি আনুগত্য পাল্টাইয়া অন্য দলে নাম লেখানো, ইহাকে কী বলে? ইহাকে বলে ভারতীয় গণতন্ত্র! বারংবার বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই প্রবণতার প্রবল প্রকাশ দেখিয়াছে এই দেশ। এ বারের পুরভোটে আবারও তাহা দেখিল পশ্চিমবঙ্গ। প্রার্থীরা বিরোধী দলের হইয়া প্রচার করিলেন, ভোট কুড়াইলেন, জনতার রায়ে জয়ও পাইলেন, তাহার পর রাত্রি পোহাইলে ভোল পাল্টাইয়া সরকারি দলের প্রতিনিধি হইয়া গেলেন। এক বারও ভাবিলেন না যে এমনিতেই যে রাজ্যে একদলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠার অশ্বমেধ চলিতেছে, সেখানে ভোটের ব্যালটে বিরোধী পক্ষের প্রার্থী নামটিতে যাঁহারা ছাপ দিয়াছিলেন, সেই জনসাধারণের প্রতি ইহা কতখানি অবিচার হইল। তাঁহারা স্থিতাবস্থা পছন্দ করেন নাই বলিয়াই বিরোধী দলকে ভোট দিয়াছিলেন, অথচ দেখিলেন যে তাঁহাদেরই প্রদত্ত ভোটে বিজয়ী প্রার্থী স্থিতাবস্থার অংশ হইয়া গেলেন! গোটা ঘটনাটির মধ্যে কেবল অবিচার নাই, ঘোর অনৈতিকতাও আছে। গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্ছাচার আছে। জনপ্রতিনিধিত্বের নামে জনপ্রতারণা আছে। সুস্থ গণতন্ত্রের স্বার্থে ইহা যথাসত্বর বন্ধ করা জরুরি। দরকার হইলে বর্তমান আইনের সংশোধন করিয়া তাহা করিতে হইবে।

বাস্তবিক, বর্তমানে যে আইনটি দল-পরিবর্তন আটকানোর জন্য রহিয়াছে, ১৯৮৫ সালে রাজীব গাঁধী সরকার অনুমোদিত সংবিধানের সেই বাহান্নতম সংশোধনী ধারা এ বিষয়ে যথেষ্ট কি না, তাহার পুনর্বিচার করা একটি গুরুতর কাজ। যে সময়ে এই আইনের প্রয়োজন হইয়াছিল, তখন কংগ্রেসের টিকিটে জিতিয়া রাজনৈতিক নেতাদের বিজেপি-তে যোগ দিবার হিড়িক পড়িয়াছিল। সুতরাং দলীয় সিদ্ধান্তে দলত্যাগীদের আটকানো কিংবা বহিষ্কার করা জরুরি হইয়া উঠিয়াছিল। ঘটনাক্রম বলিতেছে, তাহাতে পরিস্থিতির মাত্র আংশিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হইয়াছে। বিধানসভায় শাসক দলের প্রাধান্যের সৌজন্যে বহু ক্ষেত্রেই এখনও নির্বাচিত প্রতিনিধি দলের টিকিটে প্রতিনিধিসভায় বসিয়াও দলের বিরুদ্ধতা করিবার সুযোগ পাইতেছেন। সাক্ষাৎ দৃষ্টান্ত, এ রাজ্যের দলোর্ধ্ব মতোর্ধ্ব নেতা মানস ভুঁইয়া, যিনি কংগ্রেস বিধায়ক হইয়াও তৃণমূল কংগ্রেসের মঞ্চে মঞ্চে দৃশ্যমান, এবং তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়াও যিনি কংগ্রেসি বিধায়ক পদটিতে বিরাজমান। তাঁহার নিজের ভাষায়, রাজনীতি কোনও স্থিতিশীল পদার্থ নহে, বহমানতাই তাহার চরিত্রলক্ষণ। মুশকিল হইল, এই বহমানতার সুযোগে ভোটার সমাজ যদি বুঝিতেই না পারেন, তিনি কী, কে এবং কেন, তবে সংশয় জন্মায় যে তাঁহার জন-‘প্রতিনিধিত্ব’ খুব একটা দৃঢ় ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

এই অকার্যসাধনে ভারতই যে একমাত্র উদগ্রীব দেশ, তাহা বলিলে অবশ্য সত্যের অপলাপ হইবে। দলত্যাগ-বিরোধী আইন কী রূপ হওয়া সঙ্গত, এ বিষয়ে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সমস্যা কম নয়। তবে ভারতে কিন্তু এই প্রবণতার একটি বাড়াবাড়ি লক্ষণীয়, এবং তাহার সঙ্গে এ বিষয়ে রাজনৈতিক সচেতনতার উল্লেখযোগ্য রকমের অভাবও লক্ষণীয়। সোজা কথায় ইহা একটি স্বীকৃত প্রথা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অথচ, কেবল রাজনৈতিক সমাজে নয়, নাগরিক সমাজেও এই অনৈতিক প্রথা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা থাকা উচিত। সেই সচেতনতা ব্যতীত গণতন্ত্রের অপব্যবহার সংশোধিত হইবার আশা নাই। সচেতনতা নাইষ বিরোধিতা নাই, বহিষ্কার নাই: তাই মানস ভুঁইয়ারা অনায়াসে তাঁহাদের বহমানতার তত্ত্ব আউড়াইতে পারেন। বহমান রাজনীতির পুরোধারা এ বারের পুরভোটে প্রশ্নটি আবার ঠেলা দিয়া সামনে আনিলেন।

political awareness Party Change
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy