গত দুই দিনে স্পষ্ট, বিহারে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের জয় মোটেই উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির চোখধাঁধানো সাফল্যের সহিত গৌরব-অঙ্কে পাল্লা দিতে পারিতেছে না। দুর্ভাগ্যজনক। লালুপ্রসাদ যাদবের দল যে পরিস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির সহিত সরাসরি দ্বন্দ্বে নামিয়া আরারিয়া ও জাহানাবাদ কেন্দ্রে সম্মানজনক ব্যবধানে জিতিয়া গেল, তাহা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিক দিয়া চিত্তাকর্ষকও বটে। গত কিছু কাল যাবৎ লালুপ্রসাদ ও তাঁহার সমগ্র পরিবার যে ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের ডাকিনী-তাড়নার শিকার হইয়া আছেন, তাহা দলের সংগঠনের উপর ছাপ ফেলিবারই কথা ছিল। নেতার প্রতি কিছু অনাস্থা প্রকাশিত হইবার কথা ছিল। কিন্তু ভোটময়দানে সেই অনাস্থা দেখা গেল না। তেজস্বী যাদব ইহাকে লালুপ্রসাদের আদর্শের জয় বলিয়াছেন। এত দূর না গিয়াও বলাই যায় যে, ইহা লালুপ্রসাদের রাজনীতির শিকড়মুখিতার জয়। যাদব পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ লইয়া আলোচনায় যাইবার প্রয়োজন নাই, কিন্তু তাঁহাদের যে ভাবে একের পর এক গ্রেফতার করা হইতেছিল, তাহাতে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনার ছাপ জ্বলজ্বল করিতেছে। সুতরাং বিজেপি এবং এনডিএ অংশীদার জেডি(ইউ)-এর যুগ্ম রাজনৈতিক অভিসন্ধি-প্রণোদিত কর্মপদ্ধতিই আরারিয়ায় আরজেডি-র জয়ের প্রথম ও প্রধান কারণ বলা যায়। দ্বিতীয় কারণ, নীতীশ কুমার অংশগ্রহণ না করায় বিজেপির সহিত সোজাসুজি দ্বিমুখী লড়াইয়ের সুযোগে আরজেডি সেখানকার চল্লিশ শতাংশ মুসলিম ভোট ও তৎসহ অতি-অনগ্রসর জাতের ভোটের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিয়াছে। জাহানাবাদের চিত্রটি আরও সুবোধ্য, জাতগত সমীকরণটি সেখানে স্পষ্টতর, উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও বিজেপির পরাজয়ের হেতু তাই খুঁজিয়া বেড়াইতে হয় না।

আরারিয়া ও জাহানাবাদ, দুইটি জয়ের ক্ষেত্রেই একটি তৃতীয় কারণও উপস্থিত। তাহা, তেজস্বী যাদব স্বয়ং। তিনি ইতিমধ্যেই প্রমাণ করিয়াছেন, তাঁহার মধ্যে চোখধাঁধানো গুণাবলি না থাকিলেও তিনি এক জন ‘সম্ভাবনাময়’ নেতা। গত কয়েক বৎসরে দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতীশ কুমার-লালুপ্রসাদ সমীকরণটির রাজনৈতিক সুবিধা কী ভাবে লইতে হয়, তাহা তেজস্বী হাতেকলমে দেখাইয়া দিয়াছেন। লালুপ্রসাদ জেলবাসী হইবার পর হইতে তিনি দলীয় সংগঠনের ভার চালনা করিয়াছেন, নির্বাচনী প্রচার আয়োজন করিয়াছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী নীতীশ কুমারের বিরুদ্ধে লাগাতার চাপ জারি রাখিতে পারিয়াছেন। কাজটা অবশ্য সহজ হইয়াছিল নীতীশের কারণেই। প্রথমত তাঁহার রাজনৈতিক ডিগবাজি দিয়া এবং দ্বিতীয়ত মদের নিষেধাজ্ঞা দিয়া নীতীশ বিস্তর কুখ্যাতি অর্জন করিয়াছেন।

সুরানিবারণের বিষয়টি বিহার রাজনীতিতে কতখানি গুরুতর হইয়া উঠিবে, তাহা কি নীতীশ নিজেও বুঝিয়াছিলেন? তাঁহার এই সংস্কার রাজ্যময় একটি আড়াআড়ি শ্রেণিগত বিভাজন তৈরি করিয়াছে। প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ এ জন্য গ্রেফতার হইয়াছেন, প্রায় সকলেই ‘নিচু’ জাতির, যাহার মধ্যে অতি-অনগ্রসর জাতভুক্তের সংখ্যা লক্ষণীয় রকম বেশি। অভিযোগ, সমাজের উচ্চবর্গ যথেচ্ছ আইন ভাঙিলেও বিনা বাধায় পার পান, দুর্গতির একশেষ হয় গরিবদের। সুতরাং আরও এক বার জাত-রাজনীতি একটি প্রত্যক্ষ শ্রেণি-মাত্রা পাইয়াছে। তেজস্বী এই বার পরিস্থিতির সুযোগ লইতে পারিলেন। পরবর্তী সময়ে কে বা কাহারা কী ভাবে এই ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তোষের সুযোগ লইবেন, দেখা যাক। কেবল নীতীশ-লালু-জিতনরাম নেতৃ-কোন্দলই একমাত্র দ্রষ্টব্য নহে, বিহার রাজনীতির বৃহত্তর সামাজিক পরিসরটিই এখন ক্ষোভ-বিক্ষোভের টানাপড়েনে অতিশয় অস্থির।