সামাজিক বিশ্বাসের মাত্রা কোন অতলে নামিলে এনআরএস-কাণ্ডটি ঘটিতে পারে, পশ্চিমবঙ্গবাসী বুঝিতেছেন। চিকিৎসকের সদিচ্ছায় রোগীর পরিজনদের বিন্দুমাত্র আস্থা নাই। তাঁহারা কব্জির জোরে রাজত্ব করিতে চাহেন। সেই জুলুম হইতে প্রশাসন তাঁহাদের রক্ষা করিতে পারে, অন্তত সেই চেষ্টা করিবে, এমন বিশ্বাসের কণামাত্র চিকিৎসকদেরও নাই। তাঁহারা রাজ্যব্যাপী কর্মবিরতি ঘোষণা করিয়াছেন। কাহার দোষে রাজ্য এমন অবিশ্বাসের চোরাবালিতে তলাইয়া গেল, তাহা আর অনুসন্ধানসাপেক্ষ নহে— উত্তরটি জানা। এই পাপ সর্বাগ্রে, এবং সর্বাধিক, প্রশাসনের। বিশিষ্ট চিকিৎসকরাও অভিযোগ করিতেছেন, গত কয়েক বৎসর যাবৎ কলিকাতা ও রাজ্যের অন্যত্র হাসপাতালে হামলার একের পর এক ঘটনায় একটি লোকেরও শাস্তি হয় নাই। অভিযোগটি আক্ষরিক অর্থে সত্য কি না, সেই বিচার অপ্রয়োজনীয়— প্রশাসন সম্বন্ধে চিকিৎসকদের, এবং বৃহত্তর সমাজের, এই ধারণাটিই তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য প্রশাসন কি অস্বীকার করিতে পারে যে এ হেন হামলার ঘটনায় তাহাদের নিস্পৃহতায় সাধারণ মানুষ ধরিয়া লইয়াছে যে ‘কিচ্ছু হইবে না’? পুলিশ কাহাকেও ধরিবে না, কাহারও শাস্তি হইবে না? এই পুলিশের উপর ভরসা করিবে কে? 

যূথবদ্ধ হামলাকারী সমস্ত আইনের ঊর্ধ্বে, এ হেন আশ্বাসে ভর করিয়াই একের পর এক হাসপাতালে হামলা চলিতেছে। যাঁহারা প্রধান আক্রান্ত, সেই জুনিয়র ডাক্তাররা নিতান্ত অল্পবয়স্ক কিছু ছেলেমেয়ে, যাঁহাদের উপর কাজের চাপ বিপুল, রোগীর পরিজনদের সামলাইবার চাপ বিপুলতর— তাঁহারা ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত না-হওয়া অবধি সম্পূর্ণ অসহযোগের পথে হাঁটিতে চাহিলে সেই মনোভাবের হেতু বোঝা যায়। তাঁহাদের নিরাপত্তার দাবি অনস্বীকার্য, এবং তাহার ব্যবস্থা প্রশাসনকেই করিতে হইবে। হাসপাতালের সুপারদের বৈঠকে ডাকিয়া রাজ্য সরকার যে আরও এক দফা ধোঁকার টাটি সাজাইতেছে না, তাহা প্রমাণ করিবার দায়িত্ব সরকারেরই। তবে, আন্দোলনের কারণটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আন্দোলনের পথের প্রশ্নটিও তেমনই। আন্দোলন করিতে হইলেই রোগীর প্রতি নৈতিক দায়িত্ব বিসর্জন দিতে হইবে, এমন নহে। হাসপাতালে কর্মবিরতি ডাকিয়াও গেটের বাহিরে বসিয়া জুনিয়র ডাক্তাররা রোগী দেখিতেছেন, এই রাজ্যেই একাধিক বার এমন ঘটনা ঘটিয়াছে। ডাক্তারদের সমস্যা যতই তীব্র হউক, তাঁহাদের দাবি যতই সঙ্গত হউক, চিকিৎসা পরিষেবা প্রত্যাহার করিবার সিদ্ধান্তটি অনৈতিক। প্রশাসনকে তাহার দায়িত্ব লইতে বাধ্য করিবার জন্য ইহাই একমাত্র পথ কি না, তাহা ভাবা উচিত ছিল। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নটি শুধু নৈতিকতার নহে, কৌশলেরও। পশ্চিমবঙ্গের এই বিশ্বাসহীন সমাজের উপর এই কর্মবিরতি কী প্রভাব ফেলিবে— দূরদূরান্তর হইতে আসা রোগী বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হইলে চিকিৎসকদের প্রতি রোগীর বিশ্বাসে আরও চিড় ধরিবে কি না, সেই কথাটি ভাবা জরুরি ছিল। 

মুকুল রায়দের অবশ্য ভাবিবার দায় নাই। তাঁহারা অবিশ্বাসের ঘোলা জলে সাম্প্রদায়িকতার মাছ ধরিতে নামিয়া পড়িয়াছেন। হাসপাতালে আক্রমণের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গ কম দেখে নাই। তাহা লইয়া রাজনৈতিক চাপানউতোরও চলিয়াছে বিলক্ষণ। কিন্তু, সেই ঘটনাক্রমকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ হইতে দেখা এবং এই হিংস্রতার দায় ‘কোনও একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের’ উপর চাপাইয়া দেওয়া— রাজ্যে ইহা শুধু নূতন নহে, অতীব বিপজ্জনক। বিজেপি এই ভাবেই এই রাজ্যে রাজনীতি করিতে চাহে। রাজ্যের দখল লওয়ার জন্য তাঁহারা যে কোনও প্রশ্নকে হিন্দু-মুসলমান সংঘাতের প্রশ্ন করিয়া তুলিতে পারেন, এত দিনে তাহা স্পষ্ট। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ ইহাই। রাজ্যের স্বার্থেই এই রাজনীতিকে প্রতিহত করা প্রয়োজন।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।