চলচ্চিত্রের গরু না-হয় ভারতমাতার মহাসিংহাসনেই চড়িয়া বসিবে। কিন্তু, তাহার প্রদর্শন বন্ধ করিয়া দেওয়া কি বাক‌্‌স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নহে? ‘পিএম নরেন্দ্র মোদী’ নামক বায়োপিক বা জীবন-নির্ভর চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গে প্রশ্নটি উঠিলে উত্তর দ্বিমাত্রিক। লোকসভা নির্বাচন চলিতেছে। এই অবস্থায় নির্বাচনের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রকে লইয়া একটি প্রশস্তিমূলক জীবন-চিত্র প্রদর্শিত হইলে তাহা আদর্শ আচরণবিধির পরিপন্থী। অতএব, এক্ষণে ছবিটির মুক্তিতে স্থগিতাদেশ বাক‌্‌স্বাধীনতার প্রশ্ন নহে। কিন্তু, একটি গূঢ়তর প্রশ্নের অবতারণা করা প্রয়োজন। সেই প্রশ্ন চিত্রায়িত জীবনকাহিনির চরিত্র লইয়া। স্বাভাবিক ভাবে যাঁহাদের জীবন-চিত্র নির্মিত হইয়া থাকে, ছবি নির্মাণের লগ্নে তাঁহারা অতীত। মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, সুভাষচন্দ্র বসু, বল্লভভাই পটেল বা ভগৎ সিংহের জীবনকাহিনি তাঁহাদের জীবদ্দশায় চলচ্চিত্রায়িত হয় নাই। মিলখা সিংহের মতো কাহারও কাহারও বর্তমানেই জীবন-চিত্র হইয়াছে বটে, কিন্তু সেই আখ্যানের কেন্দ্রে থাকা ঘটনাক্রম তখন অতীত। চিত্রায়িত জীবনকাহিনির প্রচলিত ধর্ম হইল, তাহার কেন্দ্রীয় চরিত্র অথবা ঘটনাক্রম বর্তমানের পরিধির বাহিরে, এবং সেই কারণেই বাস্তবের জমিতে ছবিটি সেই ঘটনাক্রমের সহিত কোনও প্রত্যক্ষ ও কার্যনির্বাহী সংলাপ রচনা করিতে পারে না, ঘটনাক্রমকে প্রভাবিত করিতে পারে না। তাহার পরও যে সব ছবি রাজনীতিহীন হয়, তেমন নহে— কোনও শিল্পেরই রাজনীতিহীন হইবার দায় নাই— কিন্তু, সেই রাজনীতি ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের সাপেক্ষে পরোক্ষ। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

এই বিন্দুতেই অন্যান্য জীবন-চিত্রের সহিত ‘পিএম নরেন্দ্র মোদী’ বা ‘দি অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’-এর পার্থক্য। ছবি দুইটি যে ভিন্ন মেরুর, তাহাতে সংশয় নাই। কিন্তু মিল হইল, উভয় ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রই এখনও রাজনীতির পরিসরে উপস্থিত। এবং, তাঁহাদের যে আখ্যান চলচ্চিত্রায়িত হইয়াছে, তাহা এখনও প্রাসঙ্গিক। ফলে, এই ছবিগুলি তাহাদের দর্শকের নিকট যে গল্পগুলি পেশ করে, তাহার তাৎপর্য শুধু চলচ্চিত্রের পর্দায়, অথবা দর্শকের অনুভূতিতে, সীমাবদ্ধ নহে। তাহার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে রাজনীতিতে। এবং, সেই প্রভাব কোনও এক ব্যক্তিবিশেষের প্রতি গভীরতর শ্রদ্ধা নির্মাণ করে, বা তাহা ভাঙে। অর্থাৎ, এই গোত্রের জীবন-চিত্র প্রকৃত প্রস্তাবে বিজ্ঞাপনী কার্যক্রম। তাহা একান্তই রাজনৈতিক। প্রশ্ন উঠিবে, রাজনীতি তো বিজ্ঞাপন-বিবর্জিত নহে। তাহা হইলে এই জীবনকাহিনি লইয়াই বা আপত্তি উঠিবে কেন? আপত্তির কারণ, এই বিজ্ঞাপন প্রকাশ্য নহে, তাহা বিনোদনের মোড়কে প্রচারিত হইতেছে। এমন বিনোদন, যাহার অবস্থান সত্য-মিথ্যার অনিশ্চিত সন্ধিস্থলে। জীবনকাহিনি হইবার সুবাদে তাহার মধ্যে যেমন সত্যের দাবি আছে, আবার যে হেতু কাহিনিচিত্র, ফলে কল্পনার আশ্রয় লইবার স্বাধীনতাটিও অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে। অর্থাৎ, প্রচারের স্বার্থে সত্যর সহিত মিথ্যার মিশেল দিতে, অথবা নির্জলা মিথ্যা বলিতেও এই জীবনকাহিনির কোনও বাধা নাই। ইহা অঘোষিত বিজ্ঞাপন, এবং সেই কারণেই এই বিজ্ঞাপনে মানুষের  প্রতারিত হইবার সম্ভাবনা অধিকতর। অতএব, এই গোত্রের ছায়াছবিকে আদৌ কাহিনিচিত্র হিসাবে মান্য করা যায় কি না, সেই পরিচিতিতে তাহাকে জনসমক্ষে আসিতে দেওয়া যায় কি না, সেই তর্কটি করা প্রয়োজন। তাহা বাক্‌স্বাধীনতার তর্ক নহে। এমনকি, আদর্শ আচরণবিধি মানিয়া চলিবার দায় ফুরাইবার পরেও নহে।