যদি ঐতিহাসিক বলে কিছু হয়, তবে এই বারের লোকসভা অধিবেশনটি তা-ই। এই অধিবেশনেই ভারতীয় গণতন্ত্রের কফিনটি পাতা হল, চুপচাপ। একটা কাজ হওয়ার আগে প্রস্তুতি যদি অনেক দিন ধরে চলে, সে ক্ষেত্রে কাজটা হতে বেশি সময় লাগে না। এমনকি কাজটা যে হয়ে গেল, অনেকে সে খবর পায়ও না। এই অধিবেশনটিও ওই রকম। পর পর বেশ কিছু বিল পাশ হল, তার মধ্যে কয়েকটা ভারত নামে দেশটাকে আমূল পাল্টে ফেলার বন্দোবস্ত। এ দিকে আমরা যেন ভাল করে খেয়ালই করলাম না। 

প্রথমেই লক্ষণীয়, বিল পাশের তাড়া। খুব দ্রুত, বারোটি বিল পাশ হয়েছে এই অধিবেশনে— পনেরো বছরের মধ্যে সর্বাধিক সক্রিয় অধিবেশনে। ঠিক, লোকসভায় বিল পাশ মানেই আইন হয়ে যাওয়া নয়। বিলগুলি এ বার যাবে রাজ্যসভায়। রাজ্যসভা এখনও চরিত্রগত ভাবে লোকসভার থেকে আলাদা। তাই সনিয়া গাঁধী প্রমুখ শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছেন, একসঙ্গে সাতটি গুরুতর বিলকে রাজ্যসভায় আটকানোর। ‘আটকানো’ মানে, সিলেক্ট কমিটিতে স্ক্রুটিনির জন্য পাঠানো। বৃহস্পতিবারই রাজ্যসভায় উঠল ঐতিহাসিক একটি বিল: তথ্যের অধিকার (সংশোধনী) বিল। রাজ্যসভায় বিরোধীরা সফল হলে কিছু দিনের জন্য একটু স্থগিত হবে ভারতীয় গণতন্ত্রের দণ্ডাদেশ। তবে, নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই। স্থগিত করা মানে তো লুপ্ত করা নয়— কিছু সময় পাওয়া, এই মাত্র। যে গতিতে শাসক দল দেশ জুড়ে তার সর্বাত্মক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কাজে এগোচ্ছে, তাতে রাজ্যসভার এই পরিসরও আর বেশি দিন তাদের কবলের বাইরে থাকবে না। 

যে সাতটি বিল প্রতিরোধের জন্য চিহ্নিত হল, তার মধ্যে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব দু’টির: তথ্যের অধিকার (সংশোধনী) বিল, এবং বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল। আইনে পরিণত হলে দেশের রাজনীতি ও সমাজকে অনেকটা পিছনে ঠেলে দেবে দু’টি বিলই। বিরোধীরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন বিল দু’টি আটকানোর। ইউএপিএ সংশোধনী বিলটির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদে সনিয়া গাঁধী, অধীর চৌধুরী, শশী তারুর লোকসভা থেকে ওয়াকআউট করেছেন। ডেরেক ও’ব্রায়েন প্রতিবাদ করেছেন, মহুয়া মৈত্র সপাটে বলেছেন, এই বিল ‘‘মানুষবিরোধী, সংবিধানবিরোধী, যুক্তরাষ্ট্রীয়তার বিরোধী’’। কিন্তু সাংসদ-সংখ্যা যেখানে সম্পূর্ণত বিজেপির পক্ষে, সেখানে ঝড়ের মুখে কুটোর মতোই এই সব প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদ উড়ে গিয়েছে।

সত্যি বলতে, ইউএপিএ (সংশোধনী) বিলটি লোকসভায় পেশ করার আগেই আপত্তি জানিয়েছিলেন বিরোধীরা। আলোচনার সময়েও অধীর চৌধুরী জানান বিলটিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হোক। কেননা এতে ব্যক্তির অধিকার ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে। বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে, সেই ব্যক্তি কোনও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত কি না তা আর দেখার দরকার হবে না, সরাসরিই তাকে গ্রেফতার করা যাবে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে। অর্থাৎ এত দিন যেমন জাতীয়তাবিরোধী বলে চিহ্নিত গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ থাকলে তবেই তাকে দেশদ্রোহী বলা হত, এ বার থেকে সেটা আমূল পাল্টে গেল। ব্যক্তিকেই এখন থেকে ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ বা ‘টেররিস্ট’ বলে চিহ্নিত করা যাবে, তার জাতীয়তাবিরোধী ভাবনাচিন্তার জন্য। 

অর্থাৎ? এর সাহায্যে যে কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠকেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ হিসেবে জেলে পোরার রাস্তাটা পাকা হল। যে কোনও বিরোধীকে ‘শহুরে নকশাল’ বলা যাবে, এবং গ্রেফতার করা যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট বলে দিয়েছেন: ‘‘যাঁরা শহরে বসে তত্ত্বকথা আউড়ে মাওবাদীদের সাহায্য করেন, তাঁদের আর বরদাস্ত করা হবে না।’’ এত দিন ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ কথাটা বিরোধীদের প্রতি গালাগাল হিসেবে বর্ষিত হচ্ছিল। এর পর থেকে ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ শব্দটা হতে চলেছে একটা অস্ত্র— যার মাধ্যমে বিরোধীকে শেষ করে দেওয়া সম্ভব। না, মহুয়া মৈত্ররা একটুও ভুল বলেননি। এই শাসনকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলাটা আর কোনও অতিশয়োক্তি নয়। নতুন বিল অনুযায়ী, যে কোনও বিরোধী নেতা, মানবাধিকার কর্মী, সংখ্যালঘু ব্যক্তি, যে কেউ, যদি ভারতের বিজেপি-প্রদত্ত ভাবনার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পারেন, তবে তিনি সরাসরি ‘অ্যাট রিস্ক’— কেবল প্রতিবাদী নন, তিনি রাষ্ট্রের গ্রেফতারযোগ্য শত্রু। 

একই সঙ্গে এই আইন যুক্তরাষ্ট্রীয়তা নীতির বিরোধী, রাজ্যের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার বিশুদ্ধ আগ্রাসন। ইউএপিএ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার যখন এগোবে, রাজ্য সরকারের কোনও বক্তব্য বা তদন্তের জায়গাই থাকবে না। অমিত শাহের মন্ত্রক জানিয়েছে, পুলিশের উপর নির্ভর করলে কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) নিজেরাই এ বার থেকে যে কোনও রাজ্যের যে কোনও বাসিন্দার বাড়িতে তল্লাশি করে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। 

২৮৭ সাংসদের সমর্থনে পাশ হয়ে যায় বিলটি। 

তথ্যের অধিকার (সংশোধনী) বিলও একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার সঙ্কোচনের পথ, আর রাজ্য সরকারকে অতিক্রম করে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাবৃদ্ধির উপায়। বাস্তবিক, তথ্যের অধিকার আইনটি এ দেশের নাগরিককে একটা বিরাট ক্ষমতা দিয়েছিল। যে দেশে সরকার নিয়মিত ভাবে নিজের দায়বদ্ধতা থেকে ভ্রষ্ট হয়, সরকারি কর্তারা প্রকাশ্যেই দুর্নীতি এবং দুরাচার দিয়ে ক্ষমতা কায়েম রাখেন, বিরোধী, বিপক্ষ কিংবা অকিঞ্চিৎকর নাগরিককে ক্রমাগত বঞ্চিত করে চলেন, যে দেশে নাগরিকের সাধারণ অধিকারটুকু রক্ষা করাও একটা লড়াই ছাড়া অসম্ভব— সেই দেশে তথ্যের অধিকার নামক আইন ২০০৫ সালে নাগরিকের হাতে অসামান্য একটা অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। এই অস্ত্রের মাধ্যমে একেবারে সাধারণ নাগরিকও সরকারের কাছে তথ্য জানতে চেয়ে অন্যায়ের প্রতিকার করতে পারতেন। এই পথটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল আরটিআই আইনের সংশোধনী বিলটি পাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। নতুন আইন তৈরি হলে কেন্দ্রের চিফ ইনফর্মেশন কমিশনার (CIC) এবং অন্য ইনফর্মেশন কমিশনাররা (IC) তাঁদের নিয়োগ ও কাজের শর্তের জন্য আগের মতো আর প্রধানমন্ত্রী-সহ তিন সদস্যের কমিটির অধীন থাকবেন না। তাঁরা সকলে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন হয়ে যাবেন। কত দিন তাঁরা কাজ করতে পারবেন, প্রোমোশন হবে কি না, এই সবই এখন থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঠিক করবেন। সরকারের কথামতো কাজ না করলে তাঁদের সরে যেতে হবে। একই ভাবে, রাজ্যের ইনফর্মেশন কমিশনাররাও (SIC) কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ত্তে চলে গেলেন— এত দিন তাঁদের নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল মুখ্যমন্ত্রী-সহ তিন সদস্যের কমিটির মাধ্যমে। নতুন আইন অনুযায়ী তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত কোনও দায়দায়িত্বই রাজ্যের হাতে থাকবে না। 

এর ফল কী হতে পারে বুঝতে কষ্ট হয় না। তথ্যের অধিকার আইনটির মাধ্যমে নাগরিকের কাছে সরকারের যে দায়বদ্ধতা তৈরি করা হয়েছিল, সেটা সমূলে বিনাশ করা হল। যখন সারা দেশে দাবি উঠছে যে, সরকারের হস্তক্ষেপের বদলে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ হোক একটা স্বাধীন কলেজিয়াম ব্যবস্থায়, যখন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে নোটবন্দি, রাফাল চুক্তি, নির্বাচনী বন্ড, তথ্য কমিশনারদের নিয়োগে অসম্মতি ইত্যাদি একের পর এক অভিযোগ উঠছে— সে সময় তথ্য অধিকার আইন আটকে দেওয়ার তাড়াটা স্বাভাবিক বইকি। অনেকে এও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের কিছু কিছু শক্তিশালী প্রার্থীর অ্যাফিডেভিট-গুলিও তথ্য আইন দিয়ে ‘ক্রস-ভেরিফাই’ করার উদ্যোগ হচ্ছিল বলে খবর ছিল। সেই কারণেই আইনের সংশোধনী আনার এত ভয়ানক রকম তাড়া! প্রসঙ্গত, আশিরও বেশি ‘আরটিআই’ ব্যবহারকারী নাগরিককে ইতিমধ্যে খুন করা হয়েছে। স্বাভাবিক। যথেচ্ছাচার, সুবিধাবাদিতা, দুর্নীতি, বৈষম্য— সব কিছুকেই মুশকিলে ফেলার পথ যে আইন, তাকে তো মানে মানে বিদেয় করতেই হবে। সত্যি বলতে, এক ধাক্কায় রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিককে এতখানি দুর্বল করে দেওয়ার এমন কোনও দৃষ্টান্ত স্মরণে আনাই মুশকিল। 

২১৮ সাংসদের স্বাক্ষরে পাশ হয়েছে এই বিলও।  

না, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে বিল পাশ হওয়াটাকে কোনও মতেই অগণতান্ত্রিক বলা যাবে না! আসলে গণতন্ত্রই এখন গণতন্ত্রকে খেতে বসেছে, তাকে বাঁচায় কার সাধ্য। 

বরং টি এস এলিয়টের সেই কবিতার লাইনগুলি এখন আমরা ভাবি: দিস ইজ় দ্য ওয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড এন্ডস্, নট উইথ আ ব্যাং বাট আ হুইম্পার। পৃথিবী এই ভাবেই ধ্বংস হয়— তাণ্ডব বাধিয়ে নয়, একটু কেবল ফুঁপিয়ে।