সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ কি বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারবে?

সংবিধানের প্রস্তাবনার এই উচ্চকিত উচ্চারণ কি নেহাতই হুজুগ? নাকি নাগরিকত্বের প্রথম পাঠ? এই নিয়ে ভাবার চেয়ে কঠিন সময় স্বাধীন ভারতে আসেনি। লিখছেন সাহাবুদ্দিন

Protest
ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

সারা দেশ অবাক হয়ে  দেখল এক ব্যতিক্রমী সাধারণতন্ত্র দিবস। দেখল রাস্তায় দাঁড়িয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনা পাঠ। রীতিমতো স্লোগান উঠল ‘সংবিধান বাঁচাও’। স্বাধীনোত্তর ভারতে নজিরবিহীন।

 আবহটা অবশ্য  ছিলই। আবহটা তৈরি ছিল একটা তাগিদ থেকে। অস্তিত্বের তাগিদ। সংসদীয় সংখ্যার জোরে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে নস্যাৎ করে ধর্মের ভিত্তিতে নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তাগিদ। না, কোনও রাজনৈতিক পতাকার ছত্রছায়ায় নয়। ছত্রছায়া একটাই। ভারতের জাতীয় পতাকা। আর এই মহার্ঘ্য আবহ তৈরির কুশীলব একেবারে সাধারণ মানুষ। সেই সাধারণ মানুষ, যাদের উল্লেখ করেই শুরু ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা— “আমরা ভারতের জনগণ…”।  এ সেই জনগণ, যারা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে শুধু ভারতীয় বলেই জানে, জেনে এসেছে এতকাল। এবং কোনও দিন অবচেতনেও ভাবেনি এই ভারতীয় পরিচয়ের বাইরে তাদেরকে ধর্মের ভিত্তিতে এই ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে নতুন করে ভাগ করে কেউ নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্রত পালন করতে এগিয়ে আসবে। কারণ, দশকের পর দশক ধরে তারা এটাই জেনে এসেছে নাগরিকত্ব আসলে একটা অনুশীলন, একটা বোধের চর্চা। আর সে চর্চায় ইতিমধ্যেই তারা সসম্মানে উত্তীর্ণ। সে উত্তরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা কেউ কোনও দিন দেখায়নি, দেখাবে বলেও তারা ভাবেনি। কিন্তু হায়! সময় বড় পরিহাসপ্রিয়।

তাই সময়ের এই চরমতম পরিহাসের জবাবে সেই সাধারণ আজ পথে নেমে বলছে, ‘সংবিধান বাঁচাও’। সংবিধানের প্রস্তাবনার উচ্চকিত উচ্চারণ কীসের ইঙ্গিত? এ কি শুধুই হুজুগ? না কি বিপন্নতা? না কি অপমানের শীলিত সাংবিধানিক জবাব? যে জবাবের গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছে তার সংবিধান নিজেই, সেই সংবিধানকেই অস্ত্র করেছে সে। কারণ, এ অপমান শুধু তার নিজের নয়, এ অপমান তার সংবিধানেরও। একথা ঠিক  সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘সেকুলার’ শব্দটির সংযোজন হয়েছে অনেক পরে। ১৯৭৬-এ সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীতে। কিন্তু তাই বলে কি তার সত্তা, সর্বধর্ম সমভাবের ঐতিহ্য ছিল না? সংবিধানের প্রস্তাবনাতে যখন ‘সেকুলার’ কথাটা যোগ হল (Sovereign Socialist Secular Democratic Republic), তখন স্বাভাবিক ভাবেই ‘সেকুলার’ শব্দের অর্থ নিয়ে অনেক  আলোচনা হয়েছিল, হয়েছিল বিতর্ক। কিন্তু বিতর্ক যাই হোক না কেন, একটি ব্যাপারে ঐক্যমত ছিল যে, সেকুলার আদর্শটি ইতিবাচক এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের ক্রমোন্নতির সহায়ক। এমনই সম্ভ্রম ও মর্যাদা আদায় করল এই ‘সেকুলার’ শব্দটি যে, পরবর্তীতে মোরারজি দেশাইয়ের সরকার ইন্দিরা সরকারের আনা অনেক সংবিধান সংশোধনী রদ করলেও প্রস্তাবনার এই শব্দটিতে হাত দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখাননি। এমনকি, আন্তর্জাতিক সম্ভ্রম জাগিয়ে শব্দটি নিছক একটি শব্দ হয়ে রইল না। এর ভারতীয় প্রতিশব্দ তৈরি করা হল ‘পথনিরপেক্ষ’, মতান্তরে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’। ‘ধর্মনির্লিপ্ত’ নয়, যা পশ্চিমি সেকুলার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে  খাটে। আর এই তফাতটা না বুঝলে সেকুলার ভারত বলতে আসলে ঠিক কী বোঝায়, তা স্পষ্ট হবে না। কেমন সে তফাত? পাশ্চাত্যে ‘সেকুলার’ রাষ্ট্র বলতে বোঝানো হয় সেই রাষ্ট্রকে, যে ধর্ম (religion)-এর সঙ্গে রাষ্ট্রের যাবতীয় সংস্রবকে কার্যত নাকচ করে। ‘সেকুলারিজম’-এর এ ধারণা প্রথম এল ১৮৫১-তে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ জর্জ জেকবের হাত ধরে। অবশ্য শুরুরও তো শুরু থাকে। পাশ্চাত্য দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ-এর ‘পজিটিভিজিম’-এর প্রভাবেই জেকবের মাথায় এল ‘সেকুলারিজম’ ধারণা, যা আসলে সামনে আনতে চায় ‘a social order separate from religion, without criticizing religious belief.’

কিন্তু নেহরু এবং অম্বেডকর চাইলেন এমন এক সেকুলার ভারত, যা ধর্ম (religion) থেকে সংস্রবমুক্ত নয়, আবার বিশেষ কোনও ধর্মকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও তার কার্যকলাপের অঙ্গীভূতও করে না। প্রয়োজনে ধর্মীয় বিধির আধুনিকীকরণ করতে আইন প্রণয়ন করে, আবার ইতিবাচক ধর্মীয় বিধি ও ক্রিয়াকলাপের পৃষ্ঠোপোষকতা ও রক্ষাকবচের কাজও করে। এ হল সেই  ভারত যে— ‘protects all religions, but does not favour one at the expense of others and does not itself adopt any religion as the state relegion.’

অর্থাৎ, ভারতীয় ‘সেকুলারিজম’ আসলে একটা দর্শন, যা সংবিধানের কাঠামো নির্মাণে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত নয়, এ হল সেই অন্তর্গূঢ় দর্শন যা সংবিধানের সত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সেই সঙ্গে ভারতের আধ্যাত্মচর্চার আবহমানতা ও বহুমত বহুপথের সম্মিলন ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে সম্মান করে। আর এই দর্শনই নির্মাণ করেছে আর্টিকল ২৫, যেখানে ধর্মাচরণের স্বাধীনতার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এই দর্শনের উপর ভর করেই তৈরি হয়েছে ১৪ ও ২১ নং ধারা, যা বলে সর্বস্তরে সাম্যের কথা। এই দর্শন যেমন মনে করায় রামকৃষ্ণ-কথিত 'যত মত তত পথ'-এর আধ্যাত্মিক পরাকাষ্ঠাকে, তেমনই মনে করায় সম্রাট আকবরের সর্বধর্ম-সমন্বয়ে দীন্-ই-ইলাহি সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ভারতীয় ঐতিহ্যকে। এই দর্শনই পশ্চিমের সেকুলার রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে সেকুলার ভারতকে।

এই অনন্য সেকুলার দর্শনের নির্মাণে মনে রাখতেই হবে, সুভাষচন্দ্রের কংগ্রেসে থাকাকালীন ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান ও পরবর্তীতে তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নির্মাণের কথা। মনে রাখতে হবে  মহাত্মা গাঁধীকে, যাঁর সঙ্গে অনেক বিষয়ে মতানৈক্য সত্ত্বেও সুভাষ তাঁকে বললেন সেকুলার ভারত তথা জাতির পিতা আর রবীন্দ্রনাথ ডাকলেন ‘মহাত্মা’ বলে। 

  গাঁধী-সুভাষের স্বপ্নের সেকুলার ভারতের মৃত্যুঘণ্টা বাজাতে চায় যে শক্তি, তার প্রতি  ইতিমধ্যেই বহির্বিশ্ব জানিয়েছে দিয়েছে তার  বিরূপতা। প্রতিবেশী বাংলাদেশ তো বটেই, আমেরিকাও জানিয়েছে তার অসন্তোষ। ইউরোপীয় ইউনিউনের ৭৫১-এর মধ্যে ৬২৫ সদস্যই সিএএ-বিরোধী মতপ্রকাশ করেছে। আর গণতন্ত্রের সূচকে তো আমরা আগের অবস্থান থেকে আরও দশ ধাপ নেমে গিয়েছি। প্রশ্ন হল, কেন এমন হল? সাভারকর-গোলওয়ালকর-হেডগারীয় একরৈখিক হিন্দুত্ববাদী পথ ও তাঁদের উত্তরসূরীদের ঘোষিত নীতি তথা নির্বাচনী ইস্তেহার তো এই ভারতের অজানা নয়। তা হলে আর এত গেল গেল রব কেন? বিশেষ করে তাঁদেরই হাতে রয়েছে যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা? 

তবু প্রশ্ন ওঠে, কারণ সংসদীয় সংখ্যা আর দেশের বিপুল জনতা এক নয়। কিন্তু যে দেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতা দখলের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয়  সংখ্যা অর্জনে দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষের সম্মতিই যথেষ্ট, সেখানে তথাকথিত সেকুলার দলগুলির ঐক্যবদ্ধ হতে এত অনীহা কেন? সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ যদি সেকুলার ঐক্যের পথের অন্তরায় হয়, তা হলে তাঁদের সদিচ্ছা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে না কি? তাই তথাকথিত সেকুলার দলগুলি ‘সেকুলারিজম’ নিয়ে রাজনীতি করবে, না কি তাকে রক্ষা করবেন— সেটা নিয়ে তাদেরকেই ভাবতে হবে। এই নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার চেয়ে কঠিন সময় স্বাধীন ভারতে আসেনি। হয়তো এটাই সেই ক্রান্তিকাল।

আর এই ক্রান্তিকালে প্রশ্ন জাগে এই স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ কি বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারবে রাষ্ট্রীয় মেশিনারির পীড়নের বিরুদ্ধে? সময় তার উত্তর দেবে। 

কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, সংবিধান বাঁচানোর শপথ, বিশেষ করে তার সেকুলার সত্তার অবমাননার বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ কি দেশদ্রোহ? না কি মৌলিক অধিকার? 

সেই প্রতিবাদকে দমন করার রাষ্ট্রীয় পীড়নকে তবে কি বলব? বড় বেয়াড়া প্রশ্ন। কিন্তু খুব অসঙ্গত কি? 

 

শক্তিনগর হাইস্কুলের শিক্ষক

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন