কা‘চন্দ্রযান ২’-এর গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসা ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মাটি ছুঁয়ে মহাকাশ গবেষণায় মহীরূহ রোপণ করবে, এমন স্বপ্নের বাস্তব সন্ধিক্ষণ যে কোনও ভারতবাসীর কাছেই সীমাহীন আবেগঘন মুহূর্ত। মহাকাশ নিয়ে গবেষণারত বিশ্বের সুবিদিত সংস্থাগুলির সঙ্গে মহাকাশ গবেষণায় এগিয়ে যাবে ভারত, এই আকাশচুম্বী  স্বপ্নে গত ৭ই সেপ্টেম্বর রাতভর বিভোর ছিল ভারতবাসী।  ‘চন্দ্রযান টু’ থেকে নির্গত ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ যে মুহূর্তে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মাটি ছোঁয়ার কথা ছিল, সেই দুর্লভ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী থাকার উৎসাহে ইসরোর বিজ্ঞানীদের সাথে ভারতবর্ষের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও রাতভর জেগে অপেক্ষায় ছিলেন ইসরোর প্রধান কার্যালয়ে। চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২.১ কিমি দূরত্বে ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানী তথা লক্ষকোটি ভারতবাসীর স্বপ্নের রঙে আঁকা রামধনু ভেঙে চৌচির হয়ে গেলেও, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের এই নিরলস প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ মহাকাশ গবেষণার পথকে আরও প্রশস্ত করে চাঁদ ছোঁয়ার ইচ্ছাকে প্রবল থেকে প্রবলতর করেছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ উৎসাহে ঘটে যাওয়া এত বড় একটা ঘটনা ভারতবাসীকে নিয়ে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ আদৌ ঘটাতে পারলো কিনা তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্নটা কিন্তু রয়েই গেল!    

আফসোসটা হল, সমগ্র ভারতবর্ষ এবং তার অন্দরে বসবাসকারী সকল সহনাগরিকদের ন্যূনতম বেঁচে থাকাটা যদি চন্দ্র অভিযানের মতো এমন উৎসাহব্যঞ্জক হতো, আর আপামর দেশবাসীর সেই ‘মানুষের মতো বেঁচে থাকার’  অস্তিত্বের সাক্ষী হতে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি সশরীরে হাজির থাকতে পারতেন দারিদ্র্যমুক্ত ভারতবাসীদের উদ্দাম কোলাহলে, বেকারত্বহীন ভারতবাসীদের উচ্ছ্বাসের কলরোলে, অশিক্ষামুক্ত ভারতবাসীদের গর্বিত মিছিলে!

আজকের ভারতবর্ষের গৌরবান্বিত অর্ধটি নিঃসন্দেহে চন্দ্র অভিযানের আভিজাত্যে কানায় কানায় পূর্ণ, কিন্তু দেশের অন্য অর্ধটির অন্ধকারাচ্ছন্ন মানচিত্র থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তস্রোতে প্রলেপ লাগানোর উৎসাহের কৃপণতাই কি শুধু কাম্য? আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডের নির্যাস থেকে পাওয়া সংখ্যাতত্ত্ব বিশ্লেষণ করে ভারতবর্ষের অপর অর্ধটির পাংশু অবয়বের নির্মম প্রতিচ্ছবিটি কি চাঁদ ছুঁয়ে ফেলার গর্বিত অট্টহাসি ভরা মুখকেও ম্লান করে দিল না?       

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের দেওয়া ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার ২১.৯% এখনও দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। অতি সম্প্রতি, ১১ই মে, ২০১৯ তারিখে, প্রকাশিত ইন্ডিয়ান হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সার্ভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভারতীয় পরিবার (৪৭.৯%), যে পরিবারে সন্তান সংখ্যা পাঁচ বা তার অধিক, অন্ত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে আজও দিনযাপন করেন। এইসকল মানুষজন পানীয় জল, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা রক্ষার মতো ন্যূনতম সুযোগসুবিধা থেকে আজও বঞ্চিত। গৌরবান্বিত চাঁদের আলো থেকে তাঁরা এখনও সহস্র যোজন দূরের মানুষ, অথচ তাঁরাও কিন্তু খাঁটি ভারতীয়। 

ভারতবর্ষে বেকারত্বের হার নির্ধারণ করা হয়, ১৫ বছর ও তার অধিক বয়স্ক কর্ম সন্ধানী জনতা ও দেশের মোট শ্রমশক্তির অনুপাতের শতাংশের হিসেবে। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের রিপোর্টে, ২০১৭-১৮ বছরে ভারতবর্ষে বেকারত্বের  হার ৬%, ২০১১ সালে দেশের বেকারত্বের হার ছিল ৩.৫৩%।  সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি-র দেওয়া সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, অগস্ট, ২০১৯-এ ভারতবর্ষের বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪%। কর্মহীনতার তীব্র জ্বালা কি আদৌ ভাবতে পারে “আমার একলা আকাশ চাঁদ চিনেছে তোমার পাশে বসে!” 

২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে সাক্ষরতার হার ৭৪.০৪%। ২০১৫ সালের ইউনেস্কোর দেওয়া তথ্য অনুসারে, ভারতবর্ষে প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতার হার ৭২.১% এবং যুবাদের সাক্ষরতার হার ৮৬.১%, যেখানে শ্রীলঙ্কার মতো দেশেও এই দুই হার যথাক্রমে ৯২.৬% ও ৯৮.৮% এবং সমগ্র পৃথিবীর এই দুই হারের গড় যথাক্রমে ৮৬.৩% এবং ৯১.২%।  এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের দেওয়া ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ভূমিষ্ঠ প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে ৩৯-জনই মারা যায় তাঁদের পঞ্চম জন্মদিন পালনের আগেই। চাঁদের আলোর আঁচ এঁদের জীবনের অলিন্দে এসে পৌঁছল কই?  

‘চন্দ্রযান টু’-এর অভূতপূর্ব সাফল্যের আশা নিয়ে জেগে থাকা আবেগমথিত রাতগভীরেও ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘অক্সফাম ইন্ডিয়া’র রিপোর্ট সকল ঘুমপাড়ানিয়া মননকে সাঙ্ঘাতিকভাবে জাগিয়ে দেয়। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, গত আর্থিক বছরে ভারতবর্ষে উৎপাদিত সম্পদের ৭৩% পুঞ্জীভূত হয়েছে দেশের ধনীতম মাত্র ১% মানুষদের কাছে, যেখানে দেশের গরিবতম অর্ধেক জনসাধারণের (৬৭ কোটি) সম্পদের পরিমাণ মাত্র ১% বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভারতবর্ষে বিলিয়নার মানুষের সংখ্যা মাত্র ৯ থেকে ১০১-এ লাফিয়ে বেড়েছে এবং শুধুমাত্র গত আর্থিক বছরে ১৭ জন নতুন ভারতীয় বিলিয়নারের সংখ্যা বর্ধিত হয়েছে। গত আর্থিক বছরে এই ১% বিলিয়নারদের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ ২০,৯১৩ বিলিয়ন টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কিনা ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরের দেশের কেন্দ্রীয় বাজেটের সমতুল্য। ভারতের মোট সম্পদের ৭৩%-ই দেশের ধনীতম ১০% মানুষের দখলে।  অর্থাৎ, ভারতের মোট সম্পদের মাত্র ২৭% রয়েছে দেশের বৃহত্তর ৯০% জনসাধারণের হাতে। জানা নেই, দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এই অগাধ অসাম্য এনং বৈষম্য দূরীকরণের সন্ধানে একটি রাতও নিদ্রাহীন করে রেখেছিল কিনা! একথা নিশ্চিত ভাবে সত্য যে আজকের ভারত মহাকাশ গবেষণায় অভূতপূর্ব সাফল্যমণ্ডিত ভারত; সেই সঙ্গে একথাও বাস্তবিক সত্য যে আজকের ভারত বিপুল অসাম্যের এবং বৈষম্যেরও ভারত। স্বাধীনতা অর্জনের সাত দশকেরও বেশি সময় পরে জাতির জনক বা আজাদ হিন্দের প্রাণপুরুষ এই ভারত চেয়েছিলেন নাকি? নাকি সাধের এই ভারতবর্ষের আশায় বুক বেঁধেছিল জীবন ও জীবিকার সন্ধানে পিলপিল করে ছুটে চলা দেশের অগণিত আমনাগরিকেরা?  

ভারতবর্ষের মহাকাশযান সদর্পে ঘুরে আসুক মহাকাশের প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহের গভীরতম প্রান্তে। মহাকাশ গবেষণায় শ্রেষ্ঠ আসন পাতা থাক আমাদের গর্বিত জন্মভূমির জন্য। আবেগে, খুশিতে, উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বল হয়ে উঠুক আপামর ভারতবাসী। দুর্লভ গর্বিত মুহূর্তের সাক্ষী থাকার উৎসাহে, উচ্ছ্বাসে সমগ্র দেশবাসীর সঙ্গে নিদ্রাহীন রাত কাটুক ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও। কিন্তু সেইসঙ্গে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই ভারতবর্ষের সোনালী সূর্যের আলো ঠিকরে এসে আলিঙ্গন করুক আপামর ভারতবাসীকে। যে ভারতবর্ষে ক্ষুধার দুর্বার জ্বালায় একটি রাতও ছটফট করতে হবে না আমাদের একজন সহনাগরিককেও, যে ভারতবর্ষে বেকারত্বের শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে থাকবে না স্বপ্ন দেখার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা উচ্ছল যুবক-যুবতীরা, যে ভারতবর্ষে আপামর ভারতবাসী অশিক্ষার আশকারায় গড়ে ওঠা কুসংস্কারের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে না।

‘চন্দ্রযান টু’ থেকে বেরিয়ে আসা ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মাটি ছোঁয়ার আকাশচুম্বী স্বপ্ন আপাতত ব্যর্থতার আঁধারে বন্দি। ইসরোর বিজ্ঞানীদের মেধা, শ্রম এবং আত্মনিবেদন উজাড় করে গড়ে তোলা স্বপ্ন আপাতত অধরাই রয়ে গেল বটে, কিন্তু এই ব্যর্থ প্রয়াস দৃঢ়তর করে দিয়ে গেল চাঁদকে ছোঁয়ার অদম্য বাসনাকে। স্বপ্নভঙ্গ হল না কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-সহ দেশের লক্ষকোটি জনসাধারণের! 

শিক্ষক, এসআর ফতেপুরিয়া কলেজ