শেহলা রশিদকে জেলে যাইতে হয় নাই। এই তরুণী ছাত্রনেত্রীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার যে মামলা রুজু হইয়াছে, তাহার পরবর্তী শুনানি অবধি তাঁহাকে গ্রেফতার করা চলিবে না, বলিয়াছে সুপ্রিম কোর্ট। অতি সামান্য স্বস্তি— গাঢ় কালিমালিপ্ত কাচের মধ্য দিয়া লম্ফের সামান্য আলোর আভাসটুকুমাত্র। কিন্তু অতি অন্ধকার রাত্রিতে যাত্রীর তাহাই সম্বল, তাই আপাত-মুক্তির এই নির্দেশটুকুই আজ মহার্ঘ বলিয়া মনে হইতেছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারে বিশ্বাসী ভারতবাসীর। মনে রাখিতে হইবে, কাশ্মীরের একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য শেহলা। নিজের রাজ্য হইতে আগত ব্যক্তিদের মুখে সেনা-নিপীড়নের যে বিবরণ তিনি পাইয়াছেন, তাহা নাগরিক দায়িত্ব মনে করিয়া সমাজমাধ্যমে জানাইয়াছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের পর তাঁহার প্রচারিত খবর ভ্রান্ত প্রমাণিত হইতেই পারে। কিন্তু কোনও মতেই সেই খবরকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বলা চলে না। সরকার কিংবা সেনাবাহিনীর প্রচারের বিপরীত কথা বলিলেই রাষ্ট্র বিপন্ন হয় না— ইহা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্মরণে রাখিবার কথা। অথচ কাশ্মীরি কিংবা দলিত প্রসঙ্গে দমনপীড়নের কথা বলিলেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উঠাইতে বর্তমান সরকারকে (প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রথম দফার সরকারের মতোই) সতত সচেষ্ট দেখা যাইতেছে। বিপন্নতা রাষ্ট্রের, না কি তথ্য-কৃপণ প্রচারসর্বস্ব ক্ষমতাসীন সরকারের— সে প্রশ্ন তাই স্বভাবতই উঠে। পরিস্থিতি শোচনীয়— সমালোচনার স্বরকে অবরুদ্ধ করিবার ক্রমাগত অপচেষ্টা ভারতীয় রাষ্ট্রের মূলগত ভাবটিকে সমানে আঘাত করিতেছে, জাতির প্রাণশক্তিকে দুর্বল করিতেছে— কিছু দিন পূর্বেই সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি তাঁহার বিদায়ভাষণে মনে করাইয়া দিয়াছেন।   

বিচারপতি দীপক গুপ্তের ওই বিদায়-ভাষণখানি বর্তমান শ্বাসরোধী পরিবেশে যেন এক ঝলক শীতল হাওয়া আনিয়া দিল। তিনি মনে করাইয়া দিয়াছেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন রচনা করিয়াছিল ব্রিটিশ সরকার, যাহারা বিরোধিতার লেশমাত্র সহ্য করিতে রাজি ছিল না। দেশবাসীকে স্বাধিকার হইতে বঞ্চিত করাই তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল। ব্রিটিশ আদালতে মহাত্মা গাঁধীর বক্তব্য তিনি স্মরণ করাইয়াছেন। সরকারের প্রতি ‘অপ্রীতি’ ছড়াইবার দায়ে অভিযুক্ত গাঁধী বলিয়াছিলেন, আইন দিয়া প্রীতি জাগানো সম্ভব নহে। রাষ্ট্রের প্রতি কেহ যদি অপ্রীত হয়, তবে সেই অপ্রীতি সর্বসমক্ষে প্রকাশ করিবার স্বাধীনতা তাহার থাকা চাই। স্বাধীনতার সাত দশক পার করিয়া সেই কথাগুলি মনে করাইতে হইল বিচারপতিকে। এক বৎসর পূর্বে আইন কমিশনও রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়াছিল। বিতর্কে অংশগ্রহণ করা, সরকারের কাজের ত্রুটি তুলিয়া ধরা নাগরিক অধিকার, এমনকি নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সরকারের সমালোচনা আর রাষ্ট্রের সমালোচনা এক বস্তু নহে। হইতে পারে না।

স্পষ্টতই নরেন্দ্র মোদী সরকারের মন্ত্রী ও তাঁহাদের রাজনৈতিক অনুগামীরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারা দিয়া রাজনৈতিক বিরোধিতার কণ্ঠকে নীরব করিতে চাহেন। শেহলা তাঁহাদের সাম্প্রতিকতম লক্ষ্য। মোদী সরকারের প্রথম দফার তিন বৎসরে, ২০১৪-২০১৬ সালের মধ্যে, ১৭৯ জন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারায় অভিযুক্ত করা হইয়াছিল। অধিকাংশেরই চার্জশিট পর্যন্ত হয় নাই, মাত্র দুই জনের অপরাধ প্রমাণিত হইয়াছে। ইহাতেই সম্ভবত স্পষ্ট, রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো ভয়ানক একটি ধারাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করিয়া গণতন্ত্রের ভিত্তিকে কী ভাবে দুর্বল করা হইতেছে। বিচারপতি গুপ্ত মনে করাইয়াছেন, নিজের বিবেক অনুসারে মত প্রকাশের অধিকার সংবিধান নাগরিককে দিয়াছে। শেহলা রশিদকে এক মুহূর্তের জন্যও কারাবাসের আশঙ্কা করিতে হইবে কেন? ইহা কি স্বাধীন দেশ, না কি কারাগার-দেশ?