এই মাসে ঝাড়গ্রামে তিনটি হাতি তড়িদাহত হইয়া প্রাণ হারাইল। চাষিরা জমিতে বিদ্যুতের খুঁটি লাগাইতে আপত্তি করায় এক স্তম্ভ হইতে অন্যটির দূরত্ব প্রায় দ্বিগুণ হইয়া গেল, তারগুলি টানটান থাকিতে পারিল না। নিম্নে ঝুলিতে থাকা তার যে এত বিপজ্জনক, হস্তীরা বুঝিতে পারিল না। বিপদকে বিপদ বলিয়া চিনিবার এই অক্ষমতা যে হাতিদের নিকট কত প্রাণঘাতী হইয়া উঠিয়াছে, তাহা বোঝা যায় হাতি-মৃত্যুর ঘটনাগুলি স্মরণে রাখিলে। ২০০৯ হইতে ২০১৭ সালের মধ্যে সারা দেশে ৪৬২টি হাতি তড়িদাহত হইয়া মরিয়াছে। বাংলায় এই মৃত্যুর সংখ্যা ৪৮। কেবল বিদ্যুতের তার কেন? জলপাইগুড়িতে কিছু দিন আগেই ট্রেনের ধাক্কা খাইয়া মারা পড়িল এক হাতি। আরও একটি হাতি ট্রেনাঘাতে মারাত্মক আহত হইল। বাস্তবিক, হাতির ট্রেনে চাপা পড়িবার সংবাদ আজকাল মানবপ্রজাতির এতই গা-সওয়া যে বিস্ময়েরও উদ্রেক হয় না। হাতিদের গা-সওয়া হইয়াছে কি না, তাহা অবশ্য জানা নাই। এমন হইতেই পারে যে, ক্ষুব্ধ হাতিরা অন্য ভাবে তাহাদের বিরক্তি ও ক্রোধ প্রকাশ করিতেছে। সুতরাং, যখন খবর আসে, হাতিরাও বহু শস্য নষ্ট করিতেছে, বহু গ্রামবাসী প্রাণ হারাইতেছেন তাহাদের হামলায়, তাহাকে এই প্রজাতিগত সংঘর্ষ হিসাবেই ভাবিতে হইবে। এই বৎসরেরই জানুয়ারিতে বিষ্ণুপুরে এক হস্তিনী ও তাহার শিশু না বুঝিয়া শস্যক্ষেত্রে ঢুকিয়া পড়ায় গ্রামবাসীরা আগুনের গোলা ছুড়িয়া তাহাদের মারিয়াছিল। ওই জানুয়ারিতেই ঝাড়খণ্ডের গুমলায় হাতির দল নিদ্রিত শিশুসন্তান-সহ তরুণীকে মারে। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার ঘন জঙ্গলের সমীপবর্তী হইবার ফলে, হাতিরা সেখানে শস্য খাইয়া যায়। ২০১৫ সালে বাঁকুড়ায় ১৫৯৮ হেক্টরের শস্য, মেদিনীপুরে ৫০০ হেক্টর শস্যক্ষেত্র ধ্বংস হয়। ১০৮ জন মানুষ মারা যান হাতির হামলায়, ১৪টি হাতি তড়িদাহত হইয়া মারা যায়। ১৯৮০-র দশকের শেষ হইতে হাতিদের দক্ষিণবঙ্গের লোকালয়ে আসা শুরু, ১৯৯০-এর দশকেও দলমা হইতে হস্তিযূথ আসিয়া কিছু দিন পরেই ফিরিয়া যাইত। এখন তাহারা অধিক সংখ্যায় আসিতেছে, মানুষ বনাম হাতির সংঘর্ষও তাই বাড়িতেছে।  

স্বভাবতই, সংবাদজগৎ ও সমাজ-রাজনীতি যে হেতু মানবপ্রজাতির কবজায়, ‘সমস্যা’ এবং তাহার ‘মোকাবিলা’র নিদানগুলি মারাত্মক রকমের একপক্ষীয়। বন দফতরের কর্মীরা হাতিদের ঘুমপাড়ানি গুলিতে বশ করিবার প্রশিক্ষণ লইতেছেন। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় ট্রেনের গতিনিয়ন্ত্রণ সম্ভব কি না, বিতর্ক চলিতেছে। বৈদ্যুতিক তার মাটির তলায় বিন্যস্ত করা বেশি খরচসাপেক্ষ কি না, মিটিং চলিতেছে। মুশকিল হইল, হাতিরা মানুষের এলাকায় ঢুকিতেছে কেননা মানুষই প্রথমে হাতির এলাকায় ঢুকিয়াছে, অরণ্য ধ্বংস করিয়াছে, তাহাদের আশ্রয়চ্যুত করিয়াছে। আজ তাই হাতিরা অন্য আশ্রয় খুঁজিতেছে। সে ক্ষেত্রে কে কাহার এলাকায় অনুপ্রবেশ করিল? কে কাহার ‘সমস্যা’? 

কেবল মানুষের দিক হইতে সমগ্র ঘটনাকে দেখা মানবসভ্যতার স্ব-ভাব। অন্য প্রাণীর অধিকার দলিত করিয়াই মানুষের উত্থান ও সমৃদ্ধি। তাহার আমিষ ভক্ষণ হইতে প্রসাধনী সামগ্রীর গবেষণা অবধি সেই অকথ্য অত্যাচারের বিবরণ নিহিত। তবে কিনা, মানুষের ক্ষমতা হাতির অপেক্ষা বেশি, বুদ্ধিও— সুতরাং বিবেক ও বোধও সামান্য বেশি হইবার কথা। তাই তাহাকেই ভাবিতে হইবে, সহ-প্রাণীকে রক্ষার দায়িত্ব তাহার লওয়া উচিত কি না। এক আলোকচিত্রী (যিনি হাতিদের ছবি তুলিয়া থাকেন ও তাহাদের পক্ষে কথা বলেন) দেখাইয়াছেন, হাতিরা নিয়মিত বাঁকুড়ার বিরসা মুন্ডা হল্ট স্টেশন ও রেললাইন পার হইয়া থাকে। আর ১০০ মিটার দূরে স্টেশনটি নির্মিত হইলেই হাতিদের অসুবিধা হইত না, কিন্তু স্টেশনটি করা হইয়াছে অরণ্যের মধ্যস্থানে। ভদ্রলোক বলিয়াছেন, আজ পর্যন্ত তিনি এই স্টেশনে কাহাকেও নামিতে বা উঠিতে দেখেন নাই, এমনকি স্টেশনের যাবতীয় সুইচ ও পাখা, বৈদ্যুতিক তারও চুরি হইয়া গিয়াছে। অর্থাৎ কেবল মানুষের বুদ্ধির অভাবে হাতিদের প্রাণসংশয় হইল। হাতিরা গ্রামে আসিলে, লম্বা লাঠির অগ্রে কাপড় জড়াইয়া আগুন জ্বালাইয়া তাহাদের ভয় দেখানো হয়। অনেকে হাতিগুলিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল স্থানে ঠেলিয়া দেয়। অসততা, নির্বুদ্ধিতার বিষাক্ত মিশ্রণে এই মানুষ নামক প্রাণীটি তাহার চতুষ্পার্শ্বকে যথেষ্ট কণ্টকিত ও বিপন্ন করিয়া তুলিয়াছে। অচিরেই তাহার শুভ ও বুদ্ধিসম্পন্ন অংশটি সক্রিয় না হইলে, হস্তিপ্রমাণ ভুল হইয়া যাইবে।