দুইটি সংবাদ। বিষয়বস্তু প্রায় কাছাকাছি। অসহায় প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ। কিন্তু সংবাদ দুইটির পরিণতি ভিন্ন। প্রথমটির স্থান দেগঙ্গা। সেখানে ধরা পড়িয়া যাওয়া কেউটে সাপকে ‘খুন’ না করিয়া বন দফতরের হাতে তুলিয়া দিয়াছেন স্থানীয় মানুষ। প্রাণীটি প্রাণে বাঁচিয়াছে। ধরা পড়িবার পর অনেকেই সাপটিকে মারিবার নিদান দিয়াছিলেন। বিষধর হউক, বা না হউক, সাপের সন্ধান মিলিলেই তাহাকে হত্যা করিবার প্রবণতাটি মনুষ্যকুলে অতি পরিচিত। সৌভাগ্য, এই ক্ষেত্রে কিছু মানুষ অন্য রকম ভাবিয়াছিলেন। তাঁহারা সাত ফুট লম্বা সাপটিকে পরিবেশের স্বার্থে বাঁচাইয়া রাখিবার কথা বলেন, এবং তাহার বন্দোবস্ত করেন। কসবার বিড়ালটির অবশ্য সেই সৌভাগ্য হয় নাই। দুই প্রতিবেশীর বচসার শিকার হইয়া সে মরিতে বসিয়াছিল। রাগ ও বিরক্তিবশত তাহাকে লাথি মারিয়া ফেলিয়া 
দিবার অভিযোগ উঠিয়াছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। বিড়ালটির আঘাত গুরুতর।
একই মানুষ, দুইটি মুখ। একটি মানবিক, অন্যটি অ-মানবিক। বিস্ময়ের কিছু নাই। এমনই তো অহরহ ঘটিতেছে। দুর্বল, অসহায়কে রক্ষা করাই মানবধর্ম। দুর্ভাগ্য, মানুষ তাহার এই পরম নিজস্ব ধর্মটিকে ভুলিতেছে। মানবিক মুখ ক্রমশ চাপা পড়িয়াছে অ-মানবিকতার ভিড়ে। বন্যপ্রাণীদের উপর ক্রমাগত আক্রমণ ইহারই প্রমাণ। পূর্বে মনে করা হইত, অবোলা প্রাণীর ক্ষতি করিলে গৃহস্থের অকল্যাণ হইবে। অকল্যাণের সেই ভয় সম্ভবত এখন আর নাই। ফলে, কোথাও কুকুরছানাদের পিটাইয়া মারিয়া ফেলা হইতেছে, কোথাও গ্রামে ঢুকিয়া পড়া চিতাবাঘকে প্রচণ্ড আক্রোশে খুন করা হইতেছে, কোথাও পড়শির উপর রাগ মিটাইতে তাহার পুকুরটিতে বিষ মিশাইয়া দেওয়া হইতেছে, যাহাতে মাছগুলি মরিয়া যায়। এই তালিকা শেষ হইবার নহে। মনোবিদরা হয়তো বলিবেন, ইহা এক ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। যে অসহিষ্ণুতা বলে, সহ্য বা সমাধান করিবার প্রয়োজনই নাই, নিধন করো। এই মানসিকতার সহজতম নিশানা মনুষ্যেতররা। তাহাদের অধিকাংশেরই প্রত্যাঘাতের ক্ষমতা নাই। এমনিতেই যে দ্রুততায় তাহাদের সংখ্যা কমিতেছে, ভাবিলে আতঙ্ক জাগে। সচেতনতার অভাবে দুনিয়ার দশ লক্ষ প্রজাতি শীঘ্রই নিশ্চিহ্ন হইবার পথে। হিংস্রতা এবং অসহিষ্ণুতা এই হারে বৃদ্ধি পাইলে বাকিটুকুও নিঃশেষ হইতে বিশেষ সময় লাগিবে না।
কিন্তু সচেতনতা বৃদ্ধির উপায়? সত্য বলিতে, কোনও সহজলভ্য পন্থা নাই। আইন, প্রচার, নজরদারি— সমস্ত সত্ত্বেও সকলের মধ্যে একই সময় একই রকম সচেতনতা জন্মাইতে পারে না। ইহার জন্য এই সমাজে দেগঙ্গার সরিফুল ইসলামের মতো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের বড় প্রয়োজন। তাঁহারা এক দিকে নিজেরা এই অসহায় প্রাণীগুলিকে মারিতে বিরত থাকিবেন। অন্য দিকে, অন্যদেরও সেই নিষ্ঠুরতায় বাধা দিবেন। এবং সঙ্গে পরিবেশের সাধারণ পাঠটি শিখাইবেন। জীবজন্তু সংরক্ষণ করিতে হইলে কঠোর আইনের পাশাপাশি এই মানবিক মুখগুলিকে আরও বেশি করিয়া উঠিয়া আসিতে হইবে। আইনের অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আইন যত মানুষের চেতনার ভিতরে প্রবেশ করিতে পারে, কিছু ভাল কাজের প্রত্যক্ষ উদাহরণ তাহা অপেক্ষা অধিক গভীরে প্রবেশ করে। এই কারণেই সক্রিয় শুভবুদ্ধির বিকল্প নাই।