বেআইনি এবং বিপজ্জনক মদের বিক্রয় রুখিতে একশো সতেরোটি আবগারি থানা চালু করিতেছে রাজ্য সরকার। লক্ষ্য: নাগরিকের স্বাস্থ্যরক্ষা ও সরকারের রাজস্ববৃদ্ধি। প্রায় প্রতি বৎসর বিষমদে প্রাণহানি ঘটিতেছে। গ্রামাঞ্চলের বহু এলাকায় অবৈধ মদের ভাটি সামাজিক পরিবেশ বিষাক্ত করিতেছে। বেআইনি মদ উৎপাদন ও বিক্রয়ের নিয়ন্ত্রণের পরিকাঠামো এত দিন নিতান্ত দুর্বল ছিল। ‘সার্কল’ স্তরে আবগারি দফতরের আধিকারিকরা কাজ করিতেন। অনেকগুলি পুলিশ থানা এলাকা লইয়া একটি আবগারি সার্কল, ফলে যথেষ্ট নজরদারি সম্ভব ছিল না। এখন প্রতিটি পুলিশ থানা এলাকায় আবগারি থানা গঠন করিবার প্রস্তাব পাশ হইয়াছে। তাহাতে কর্মী বাড়িবে, সতর্কতাও বাড়িবে। অবশ্য পুলিশ থানার প্রায় সমান্তরাল আর একটি নজরদারি-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য ব্যয়ও বাড়িবে। প্রথম দফাতেই আবগারি থানাগুলিতে প্রায় আড়াই হাজার কর্মী নিয়োগ করিতে হইবে। তাহাদের বেতন ও ভাতা জুগাইতে রাজকোষের উপর চাপ পড়িবে। কিন্তু সম্ভাব্য আয়ের বিবেচনাও করিতে হইবে। মদের বিক্রয় হইতে রাজ্য সরকার বর্তমানে দশ হাজার কোটি টাকা রোজগার করে। বেআইনি মদ বিক্রয় বন্ধ হইলে রাজস্ব আরও তিন হাজার কোটি টাকা বাড়িবে বলিয়া আন্দাজ। অতএব থানা গঠন ও কর্মীর বেতনকে এই ক্ষেত্রে কেবল ‘ব্যয়’ না ভাবিয়া ‘বিনিয়োগ’ ভাবিতে পারা যায়।

নীতি নির্ধারণে অর্থের বিচার অবশ্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নহে। নৈতিকতার সিদ্ধান্তই সর্বশেষ কথা। বিহার, গুজরাত, নাগাল্যান্ড প্রভৃতি রাজ্য মদ বিক্রয় নিষিদ্ধ করিয়াছে। ওই সকল রাজ্যের নেতাদের যুক্তি, ইহাতে গার্হস্থ্য হিংসা-সহ সামাজিক নানা সমস্যার অবসান হইবে, জনস্বাস্থ্যের উন্নতিও হইবে। তৎসহ মদ না খাইবার নৈতিক অনুজ্ঞাকেও এই সকল রাজ্য সরকারি নির্দেশে পরিণত করিয়াছে। পশ্চিমবঙ্গ এই পথে চলে নাই। ঠিকই করিয়াছে। গণতন্ত্রে সরকারের ভূমিকা অভিভাবকের নহে। কর্তব্য-অকর্তব্য স্থির করিবার অধিকার নাগরিকের, তাহার ফলের দায়িত্বও তাহার। সরকার সুষ্ঠু প্রশাসনের স্বার্থে অবশ্যই মদ ও অন্যান্য মাদকজাতীয় বস্তুর বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করিবে। অতিরিক্ত মদ্যপানে স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা লইয়া প্রচারও করিতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার তাহা নিষিদ্ধ করিতে পারে না। 

মদ্যপানজনিত অপরাধ ও অসামাজিক আচরণ কঠোর হস্তে দমন করিতে হইবে সরকারকে। কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতায় হাত দিবার অধিকার তাহার নাই। হিংসা রুখিবার যুক্তিতেও নহে। নির্বাচনেও অবাধ হিংসা হয়, বিবাহের পরে নির্যাতিত হইতে হয় বহু নারীকে। তাহা বলিয়া কেহ বিবাহ বা নির্বাচন নিষিদ্ধ করিবার যুক্তি দেয় না। সরকারের যাহা কর্তব্য, অর্থাৎ অবৈধ মদ উৎপাদন ও বিক্রয় বন্ধ করা, সেই কাজটি করিলেই যথেষ্ট। অবৈধ মদ যত্রতত্র, ছোট মোড়কে, সামান্য মূল্যে বিক্রয় হয়। এই সহজলভ্যতা হইতে প্রকাশ্যে মত্ততা ও অসামাজিকতার সূত্রপাত। অবৈধ মদের ভাটিকে ঘিরিয়া যে অসামাজিক কার্যকলাপ হয়, তাহাও অসহনীয়। রাজ্য জুড়িয়া আবগারি দফতর স্বচ্ছ, সতর্ক ভাবে মদ নিয়ন্ত্রণ করিবে, ইহাই কাম্য। যে পথে রাজস্ব আদায় বাড়িবে, তাহাতেই বাড়িবে নিরাপত্তা।