Advertisement
৩০ জানুয়ারি ২০২৩

কোন পথে বাংলা তথা ভারতের মঙ্গল

আগ্রাসী হিন্দুত্বের অভিযানে নাকি হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে? লিখছেন জয়ন্ত ঘোষালআগ্রাসী হিন্দুত্বের অভিযানে নাকি হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে? লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ২২:১৯
Share: Save:

বিজয়া দশমী আর মহরম দু’টি উৎসব গায়ে গায়ে। তা নিয়েই সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি। হিন্দু, মুসলমান— দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদবুদ্ধির প্রকাশ পশ্চিমবাংলায় হয়নি এ কথা যেমন সত্য নয়, ঠিক তেমনই এ কথাও সত্য যে, ঐতিহাসিক ভাবে বাঙালি ব্রিটিশ যুগ থেকে বার বার সাম্প্রদায়িক হানাহানিকে অতিক্রম করে সম্প্রীতির আবহ প্রতিষ্ঠা করেছে।

Advertisement

আজ এত বছর পর সেই রেনেসাঁ নগরীতে, রাজা রামমোহন-রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার বীজ নতুন করে বপন করা হচ্ছে। বিজেপি-র খুব সহজ বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু তোষণ করছেন, তাই হিন্দু বাঙালির হিন্দুত্ব ভাবনা জাগরিত হচ্ছে। সেই হিন্দু ভোট সুসংহত হয়ে এ বার বিজেপির ঝোলায় এসে পড়বে।

আসলে কে হিন্দু আর কে মুসলমান?

ধর্মবাচক ‘হিন্দুত্ব’ ধারণাটি ইদানীং কালে আরোপিত। উনিশ শতকের একেবারে শেষের দিকে জাতীয়তাবাদের জাগরণে সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু নামটি প্রথম স্পষ্ট ভাবে উল্লিখিত হল। মদনমোহন মালব্য, বালগঙ্গাধর তিলক, এই নেতারা হিন্দু কথাটির নতুন সংজ্ঞা দিলেন। তখনও কিন্তু আত্মপরিচয় বাচক লক্ষণ প্রাধান্য পায়নি। ভারতের মুসলমানদের বাদ দিলেই সেটা হিন্দু ধর্ম, হিন্দু জাতীয়তা এও খুব সংকীর্ণ ও নেতিবাচক মনোভাব।

Advertisement

কে মুসলমান, কে খ্রিস্টান, কে বৌদ্ধ? এর উত্তর দেওয়া সহজ, কারণ এই ধর্মগুলির প্রত্যেকটিতে এক জন ব্যক্তি আছেন, যিনি সেই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু হিন্দু কোন মতের অনুগামী? পশুবলি-যাগ-যজ্ঞ যেমন হিন্দু ধর্ম, তেমন যজ্ঞ বিরোধী ভাগবত ধর্মও এ দেশে আচরিত। অহিংস জৈন ও বৈদ্ধদের সঙ্গে অহিংস জৈন ও বৌদ্ধদের সঙ্গে অহিংস ভাগবত ধর্মের কোনও বিরোধ ছিল না। মহেজ্ঞোদড়ো-হরপ্পার সভ্যতা যারা রচনা করেছিলেন তারাই কি হিন্দু?

ভাবততীর্থ কবিতার সারমর্মেই ভারত দর্শন। হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়-চিন-শক হুন দল, পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন। দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে— এ কথা তো সত্য। এখান থেকেই সর্ব ধর্ম সমন্বয়েরও যাত্রা শুরু। তাই গজনী মামুদ ক’বার সোমনাথ লুন্ঠন করেছেন, বখতিয়ার খলজি ছলে বলে কৌশলে বাংলা বিজয় করেছিলেন কি না, মুসলিম শাসকেরা লোভ ও ভয় দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করেছিল কি না, এ সব নিয়ে গবেষণা করলে কি আজকের সমস্যার সমাধান হবে? ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহী’ গ্রন্থে রবীন্দ্র গুপ্ত ভারতে হিন্দু-মুসলমান প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলি তুলেছেন। তিনি বলছেন রবীন্দ্রনাথের ভারততীর্থের দর্শন প্রয়োজনীয় সত্য কিন্তু আর্য-অনার্যের মিলন এত ভাব ভালবাসায় এত সহজে হয়েছিল ভাবারও কোনও কারণ নেই। বরং এখন তো জানা যাচ্ছে, বল প্রয়োগের দ্বারই আর্য সভ্যতা ভারতে বিস্তৃত হয়। সংখ্যালঘু বহিরাগত আর্যরা বিশাল এই দেশে অধিকার কায়েম রাখতে দান-প্রতিদানের মাধ্যমে একটি অনুগত শ্রেণিও তৈরি করলেন। তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধের মাধ্যমে আত্মীয়তাও প্রতিষ্ঠিত হল। তাই আর্য-আনার্য ভাবধারার মিলনের পাশাপাশি দমন-পীড়নের বিষয়গুলিও উপেক্ষা করার নয়। বৈদিক ধর্ম আর হিন্দু ধর্ম অভিন্ন হলে অবৈদিক লোকায়ত মতগুলি কি অহিন্দু? তান্ত্রিক শক্তি সাধনা বা সহজিয়াদের ঈশ্বর সাধনা কি অহিন্দু?

বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের কথা আজ আমরা সবাই জানি। সতেরো নাকি সতেরোশো জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে তিনি নবদ্বীপ আক্রমণ করে বৃদ্ধ লক্ষ্মণ সেনকে হারিয়ে দেন। বঙ্কিমচন্দ্র পর্যন্ত একে বাংলার তথা ভারত কলঙ্ক ভেবে দেন। কিন্তু কেন এ কাজে তারা সক্ষম হল, সেটাও জানতে হবে। ব্রাহ্মণ্য শাসনের দুর্বলতাও হয়ে উঠেছিল ভয়াবহ। বৃদ্ধ বৈষ্ণব রাজা পুরোহিতদের হাতেই কার্যত তখন বন্দি। গুপ্তচর যখন খবর দেয় যে বিদেশি আক্রমণ হতে চলেছে, তখন মন্ত্রী মহাপণ্ডিত হলায়ুধ যুদ্ধের প্রস্তুতি না নিয়ে শ্মশানের ছাই বিশেষ গাছের ছাল ও শেকড় বাটার দ্রব্যগুণেই শত্রুসৈন্য ভেঙে পড়বে বলে বিধান দেন। সাদা অপরাজিতার মূল আর ধুতরো পাতার রস বেটে কপালে লাগিয়ে সর্বজ্ঞোদয় মন্ত্র জয় করলে শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত মনে করা হয়।

ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইতে আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন নানা ভাবে ভারতে হিন্দু-মুসলমান সাধনায় গড়ে ওঠা ভারত সংস্কৃতির পরিচয় দিয়েছেন। ক্ষিতিবাবু হজরত মহম্মদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যে ইসলামের নামে অপরের প্রতি অত্যাচার করে সে ইসলামের কেউ নয়, বরং ইসলামের শত্রু।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে আমাদের দেশ ভাগ হয়েছে ঠিক কথা, কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই প্রমাণ হল ধর্ম জাতিসত্তার নিয়ামক নয়।

আজ যখন আবার আমাদের জাতীয়তাবাদের হিন্দুত্বের উপাদানকে যোগ করার বিষয়টি এসেছে। তখন আমাদের যৌথ সাধনার গৌরবময় ঐতিহ্যকে বেশি বেশি করে স্মরণ করতে হবে।

বাংলার মঙ্গল তথা ভারতের মঙ্গল আজ কোন পথে? আগ্রাসী হিন্দুত্বের অভিযানে নাকি হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.